শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীরা সিদ্ধান্তহীনতায় দিন পার করছে। নতুন করে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মতো প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরাও একই অবস্থায় রয়েছে। আগামী মাসে অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচনে পরিস্থিতি কী হয় সে দিকে তাকিয়ে আছেন সবাই।
ডিসেম্বরে ব্যাংক ক্লোজিংয়ে বোনাস শেয়ার বেশি দেওয়ার ফলে এর আগে ব্যাংক খাতে কিছুটা দরপতন হয়। গত জুন ক্লোজিংয়ে কোম্পানিগুলো বোনাস বেশি দেওয়ায় শেয়ারবাজারে বোনাস শেয়ারের সংখ্যা বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে। নতুন শেয়ার কেনার মতো বিনিয়োগকারী বাজারে নেই। ফলে দরপতন হচ্ছে শেয়ারবাজারে। প্রতিনিয়ত কমছে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) বাজার মূলধন।
বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে নির্বাচন পূর্ববর্তী সময়ে শেয়ারবাজার চাঙ্গা রাখতে রাষ্ট্রায়ত্ত ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) মাধ্যমে দুই হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। কিন্তু সেই অর্থের বিনিয়োগ এখনো পুরোদমে শুরু হয়নি। এছাড়া চীনা কনসোর্টিয়ামের দেওয়া প্রায় এক হাজার কোটি টাকার মধ্যে অনেকেই বিনিয়োগ করে কাঙ্ক্ষিত হারে মুনাফার পরিবর্তে লোকসান গুনতে শুরু করেছে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা।
বাজারে গতি ফেরানোর একাধিক উদ্যোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নেওয়া হলেও তা কার্যকর হচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আইসিবির একার পক্ষে ইতিবাচক প্রভাব সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে বড় বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের এগিয়ে আসতে হবে। অবশ্য বিনিয়োগকারীরা বলছেন, আস্থা ও সুশাসনের অভাবেই বর্তমান বাজারে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সতর্ক অবস্থায় রয়েছে সবাই। মুনাফার চেয়ে বিনিয়োগ সুরক্ষাই মূল ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
সম্প্রতি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) কৌশলগত বিনিয়োগকারী দুই চীনা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পাওয়া টাকা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের শর্তে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্স দশ শতাংশ ছাড় দিয়েছে। আগামী ছয় মাস পর্যন্ত এই সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এই অর্থ বাজারে প্রবেশ করলে কিছুটা গতি পেতে পারে শেয়ারবাজার। তবে সবকিছু নির্ভর করছে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার উপরে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত এক দশকের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ডিসেম্বর মাসে ব্যাংক ক্লোজিং হওয়ার কারণে এর আগে ব্যাংক খাতের শেয়ারের দর কিছুটা পড়ে যায়। কারণ, রিপোর্টিংয়ের সুবিধার্থে নগদায়ন করতে ব্যাংক ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডের কাছে থাকা অনেক শেয়ার ছেড়ে দেয়। ফলে এ সময় এ খাতে শেয়ারের দামে কিছুটা নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যায়। তারা বলছেন, এই মুহূর্তে বাজারের যে আচরণ তা কোনোভাবেই স্বাভাবিক না। বাজার ভালো হওয়ার মতো অনেক বিষয় থাকার পরও যতটুকু ভালো হওয়া দরকার ততটুকু ভালো হচ্ছে না। এ সময় মৌলভিত্তির অনেক কোম্পানির শেয়ার দাম কমে যাচ্ছে।
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ এর প্রেসিডেন্ট মোশতাক আহমেদ সাদেক বলেন, উঠানামা বাজারের ধর্ম। তবে গত কয়েকদিন কোনো কারণ ছাড়াই বাজার পড়ে গেছে। রাজনৈতিকভাবে ভালো খবর এবং আইসিবির বন্ড বিক্রির খবর বিনিয়োগকারীদের আশাবাদী করায় বাজার ভালো হয়েছে। আমরা চেষ্টা করছি বিনিয়োগকারীরা যাতে ফাইন্যান্সিয়াল লিটারেসি (আর্থিক জ্ঞান) ভালোভাবে পায়। সেজন্য নানান উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। বিনিয়োগকারীরা শেয়ারবাজার সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান রাখলে তখন তারা আর গুজবের পেছনে না দৌড়ে বুঝে বিনিয়োগ করবেন।
উভয় শেয়ারবাজারে সূচক ও লেনদেন বেড়েছে
গতকাল সব খাত মিলে বেশিসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের শেয়ার দাম বাড়ায় ডিএসইর প্রধান মূল্য সূচক কিছুটা বেড়েছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে লেনদেনের পরিমাণ। ডিএসইতে লেনদেনে অংশ নেওয়া ১৪৪টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম আগের দিনের তুলনায় বেড়েছে। বিপরীতে দাম কমেছে ১২৮টির। আর ৪৩টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। অপর শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের সার্বিক মূল্য সূচক সিএসসিএক্স ৪৪ পয়েন্ট বেড়ে ৯ হাজার ৭৭৪ পয়েন্টে অবস্থান করছে। বাজারে লেনদেন হয়েছে ২৪ কোটি ৮২ লাখ টাকা। লেনদেন হওয়া ২২০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১১৩টির দাম বেড়েছে। বিপরীতে কমেছে ৮৬টির। আর দাম অপরিবর্তিত রয়েছে ২১টির।
৩৩ কোম্পানির শেয়ার লেনদেন বন্ধ থাকবে আজ
আজ সোমবার পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ৩৩টি কোম্পানির শেয়ার লেনদেন হবে না। রেকর্ড ডেটের কারণে এদিন কোম্পানিগুলোর শেয়ার লেনদেন বন্ধ থাকবে। গতকাল ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) থেকে এ তথ্য জানানো হয়েছে। লেনদেন বন্ধ থাকা কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে- বারাকা পাওয়ার, বিডিকম, গোল্ডেন হার্ভেস্ট, জিকিউ বলপেন, খান ব্রাদারস পিপি, সিলভা কেমিক্যাল, আরডি ফুড, অগ্নি সিস্টেম, আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজ, আলিফ মেনুফ্যাকচারিং, আরামিট সিমেন্ট, আজিজ পাইপ, বিবিএস কেবলস, দেশ গার্মেন্টস, দুলামিয়া কটন, ফাইন ফুড, জিপিএইচ ইস্পাত, ইনটেক লিমিটেড, ইন্ট্রাকো রিফুয়েলিং স্টেশন, ইনফরমেশন সার্ভিস, মেঘনা পেট, মেঘনা কনডেন্সড মিল্ক, ন্যাশনাল ফিড, প্রিমিয়ার সিমেন্ট, রেনউইক যজ্ঞেশ্বর, সাফকো স্পিনিং, শ্যামপুর সুগার মিল, সিমটেক্স, তিতাস গ্যাস, তসরিফা ইন্ডাস্ট্রিজ, ইয়াকিন পলিমার এবং জিল বাংলা সুগার মিল।