বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস জরুরি বর্তমান বিশ্ব নানা সংকট-সংঘাত এবং চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। এইখানে রহিয়াছে ক্ষুধা-দারিদ্র্য, যুদ্ধবিগ্রহ, বৈষম্য, শোষণ, নিপীড়নসহ অগণিত সমস্যা। শত শত প্রতিকূলতা আর সমস্যা-সংকট সত্ত্বেও সমগ্র বিশ্বের মানুষ প্রত্যাশা করিয়া থাকে শান্তিতে বসবাস করিবার।
আর সকল জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে মানুষের মধ্যে শান্তি ও ভ্রাতৃত্ববোধ স্হাপনের মাধ্যমে বিশ্বকে একটি সুন্দর এবং বাসযোগ্য স্হানে পরিণত করাই হইল বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য। বর্তমান সমস্যাসংকুল পৃথিবীতে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ শান্তি না থাকিলে কেনে কিছুই সুষ্ঠু, সুন্দর-রূপে পরিচালনা করা সম্ভব হয় না। জাতীয় নিরাপত্তা হইতে শুরু করিয়া আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা, দ্বন্দ্ব-সংঘাত নিরসন এবং বৈশ্বিক ঐক্য প্রতিষ্ঠায় শান্তি স্হাপনের কোনো বিকল্প নাই।
এই প্রসঙ্গে ঢাকায় অনুষ্ঠিত বিশ্ব শান্তি সম্মেলনে বাংলাদেশের মাননীয় রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলিয়াছেন, বিশ্বব্যাপী শান্তি প্রতিষ্ঠা জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য সর্বোত্তম পম্হা। আমরা তাহার এই বক্তব্যকে সাধুবাদ জানাই। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ও জাতির মধ্যে শান্তি, একতা, সমঝোতা ও মিত্রতা প্রতিষ্ঠা করিবার লক্ষ্যে বিশ্বশান্তি ধারণাটি বিস্তৃতি লাভ করে। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ববাসী অনুধাবন করিতে পারে দ্বন্দ্ব-সংঘাত, হানাহানি, যুদ্ধ প্রভৃতি শান্তি ও সমৃদ্ধির অন্তরায়।
ইহা সত্য, বিশ্বব্যাপী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্হা, মানবাধিকার সংস্হা গঠিত হইলেও সমগ্র বিশ্বে প্রত্যাশিত শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয় নাই। আমরা দেখিতে পাই, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, যুদ্ধবিগ্রহ, অসহিষ্ণুতা বিরাজ করিতেছে, দারিদ্র্য এবং ক্ষুধার কারণে অসংখ্য মানুষ ধুঁকিয়া ধুঁকিয়া মারা যাইতেছে। পারস্পরিক সহিষ্ণুতার অভাবে এক দেশ অন্য দেশের উপর আক্রমণ করিতেছে, ইহাতে বিঘ্নিত হইতেছে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা।
অথচ সমগ্র বিশ্বের মানুষ শান্তিতে বসবাস করিতে চাহেন; যেইখানে থাকিবে না কোনো বৈষম্য, হানাহানি, মারামারি ও যুদ্ধবিগ্রহ। অশান্তি ও সংঘাত উন্নয়নের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, তাই টিকসই উন্নয়নের জন্য শান্তি প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য। বিশ্বের সকল ধর্মেই শান্তি প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে গুরুত্ব আরোপ করা হইয়াছে। ইসলামের নবি হজরত মুহাম্মদ (সা.) মদিনায় হিজরত করিবার পর সেইখানে বসবাসরত মুসলমান, ইহুদি, খিস্টান, পৌত্তলিক প্রভৃতি সম্প্রদায়ের মধ্যে বিরাজমান কলহ-বিবাদ, হিংসা-বিদ্বেষপূর্ণ অস্হিতিশীল পরিস্হিতি নিরসনে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসিয়া তাহাদের বিশ্বমানবতার ঐক্য ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির আবশ্যকতা বুঝাইয়া রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, নাগরিকদের মধ্যে শান্তি-সম্প্রীতি বজায় রাখাসহ নানা দিক বিবেচনা করিয়া ‘মদিনা সনদ’ প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করেন।
বৌদ্ধদের দার্শনিক মতবাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হইল, দুঃখ হইতে পরিত্রাণ লাভ করিয়া শান্তি লাভ করা। হিন্দুশাস্ত্রেও আধ্যাত্মিক, শারীরিক ও মানসিক শান্তির উপর গুরুত্বারোপ করা হইয়াছ। সুতরাং ধর্মীয়, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় এবং আন্তর্জাতিক সকল দৃষ্টিকোণ হইতেই বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার তাত্পর্য সর্বাধিক। বিশ্বকে যদি আমরা একটি দেশের সহিত তুলনা করি তাহা হইলে সমগ্র বিশ্বের মানুষ সেই দেশের নাগরিক। প্রতিটি মানুষই শান্তি প্রত্যাশা করিয়া থাকেন, যাহা তাহাকে নিরাপত্তা প্রদান করে এবং জীবনকে অর্থবহ করিয়া তোলে।
সুতরাং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার স্বার্থে, সুখী এবং সমৃদ্ধিশালী দেশ ও বিশ্ব গড়িয়া তুলিতে বিশ্বনেতৃবৃন্দকে সচেষ্ট হইতে হইবে। সকলের মধ্যে সহযোগিতা, সহমর্মিতা, সহিষ্ণুতা এবং আলোচনার মাধ্যমে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগই হইতে হইবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিকট একটি বাসযোগ্য পৃথিবী রাখিয়া যাইতে শান্তি প্রতিষ্ঠা একান্ত অপরিহার্য।