রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের যে অভিপ্রায় ছিল ভাষা সৈনিকদের তার অনেক কিছুই আজ অপূর্ণ রয়ে গেছে। ৬৭ বছর পর আমরা রাষ্ট্রভাষা বাংলার মান ও মর্যাদা নিয়ে কথা বলি, নির্ভুল বানানে বাংলা লেখার জন্য তর্ক-বিতর্কে লিপ্ত হই আর হরহামেশায় ভুলে ভরা বাংলা লেখা নিয়ে খেদোক্তি করি।
গত বছর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে বাংলা ভাষা ব্যবহারে সকলকে বিশেষ করে নতুন প্রজন্মকে বাংলা শব্দের বানান ও উচ্চারণ সম্পর্কে আরো সতর্ক হওয়ার আহবান জানিয়ে ছিলেন। তাঁর মতে, ‘ইদানীং বাংলা বলতে গিয়ে ইংরেজি বলার একটা বিচিত্র প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। জানি না, অনেক ছেলে-মেয়ের মাঝে এখন এটা সংক্রামক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে গেছে। এভাবে কথা না বললে যেন তাদের মর্যাদাই থাকে না- এমন একটা ভাব।’ শেখ হাসিনা আরো বলেছেন, প্রমিত বাংলা শব্দের বানান এবং উচ্চারণ সুনির্দিষ্ট। এখানে কোনো আপোস চলবে না। বাংলা ভাষাকে মিশ্রিত বা বিকৃত করে বলার অভ্যাস ত্যাগ করতে হবে। তবে আঞ্চলিক ভাষাকে কিন্তু অস্বীকার করা যাবে না। কারণ, আঞ্চলিক ভাষাও বাংলা ভাষা, এর নিজস্বতা রয়েছে।
কয়েকদিন আগে একটি জাতীয় দৈনিকে ‘সরকারি প্রতিষ্ঠানের ইংরেজি প্রীতি বেশি’ শীর্ষক প্রতিবেদনে ইংরেজি শব্দের যথেচ্ছ ব্যবহার কীভাবে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির জন্য হুমকিস্বরূপ হয়ে উঠেছে তার পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। যেমন বাংলায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন লেখা থাকলেও তার সংক্ষিপ্ত রূপ ইংরেজিতে ‘ডিএনসিসি’। অর্থাত্ ঢাকা নর্থ সিটি করপোরেশন। ঠিক একই পদ্ধতিতে নাম ব্যবহার করছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনও (ডিএসসিসি)। এভাবে বহু প্রতিষ্ঠানের বাংলা নামের পাশে সংক্ষিপ্ত রূপ হিসেবে ইংরেজি শব্দের বিশদ ব্যবহার আছে যত্রতত্র। যেমন, ইউনিয়ন পরিষদ ‘ইউপি’, অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন করপোরেশন- বিআইডব্লিউটিসি, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন-ইউজিসি, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড- এনসিটিবি, নগর উন্নয়ন অধিদপ্তর- ইউডিডি, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন- বিটিআরসি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড- এনবিআর, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন- বিআরটিসি, ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ- ডিটিসিএ, বাংলাদেশ রোড-ট্রান্সপোর্ট অথরিটি- বিআরটিএ প্রভৃতি। এ ধরনের ব্যবহারের অন্যতম দৃষ্টান্ত হলো ‘ওয়াসা’। ‘ঢাকা ওয়াটার সাপ্লাই অ্যান্ড স্যুয়ারেজ অথরিটি’র সংক্ষিপ্ত রূপ এটি। কথায় কথায় এসব সংক্ষিপ্ত নাম ব্যবহার করছে সর্বস্তরের মানুষ। যা কেবল বাংলা ভাষা প্রয়োগের সীমাবদ্ধতাকে চিহ্নিত করছে না, এর মধ্য দিয়ে ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি অসম্মান করা হচ্ছে বলে মনে করি আমরা।
উল্লেখ্য, মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের ১৬৯৬/২০১৪ নং রিট পিটিশনে প্রদত্ত আদেশ অনুযায়ী সকল প্রতিষ্ঠানের (দূতাবাস, বিদেশি সংস্থা ও তত্সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্র ব্যতীত) নামফলক, সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড, ব্যানার ইত্যাদি বাংলায় লেখা বাধ্যতামূলক। স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে হাইকোর্টের আদেশটি ডিএনসিসি এলাকায় নিশ্চিত করার দায়িত্ব ডিএনসিসি কর্তৃপক্ষকে দেওয়া হয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৮ সালের শুরুতে জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশের সাতদিনের মধ্যে নামফলক, সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড, ব্যানার ইত্যাদি বাংলায় লিখতে বলা হয়। হাইকোর্টের আদেশ এবং ডিএনসিসির গণবিজ্ঞপ্তি বাস্তবায়ন না করার অপরাধে স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন ২০০৯ অনুযায়ী অনেক প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হলেও সরকারি অফিসগুলো ইংরেজি শব্দ নিয়েই বহাল তবিয়তে আছে।
ঢাকার প্রধান সড়কের পাশে ফার্মেসি ও ফটোস্ট্যাটের দোকানের প্রত্যেকটির সাইনবোর্ডে লেখা: ‘ফার্মেসী’, ‘ফটোষ্ট্যাট’ ইত্যাদি। কয়েকটি দোকানে স্টোর-এর জায়গায় ‘ষ্টোর’ লিখে রাখা হয়েছে। রাস্তা সংলগ্ন বেশ কিছু রেস্টুরেন্ট চোখে পড়ে যেগুলোতে লেখা- ‘রেষ্টুরেন্ট’। একটি বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের নামের বানানে ভুল করে মর্ডান না লিখে ‘ণ’ ‘মর্ডাণ’ লেখা রয়েছে। অথচ আমরা জানি, কোনো বিদেশি শব্দে ণ, ষ এবং ঈ কার হবে না। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের অন্যতম পুণ্যস্থান ছিল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ প্রাঙ্গণ। কিন্তু সেখানেও বানান ভুল দেখতে পাওয়া যায়। মেডিক্যালে ঢুকেই নজরে আসে ‘‘বার্ণ এবং সার্জারী’’ (বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিট) বানান ভুল। একটু পিছন ফিরলেই চোখে মিলবে ইমারজেন্সি কমপ্লেক্সের ‘‘ইমারজেন্সী’’ ভুল বানান।
মূলত ভুলে ভরা বাংলা ব্যবহারকে নিরুত্সাহিত করার জন্য প্রথমে দরকার সচেতনতা; প্রমিত বানানরীতি অনুসরণ করা এবং ইংরেজি শব্দের গ্রহণযোগ্য বাংলা পরিভাষা ব্যবহার আবশ্যক; উপরন্তু বিদেশি শব্দের যথার্থ পরিভাষা তৈরি এবং সেগুলোর বানানরীতি স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন। তাছাড়া প্রযুক্তির প্রসারের যুগে বাংলাকে ইন্টারনেটের এক্সপ্রেসওয়েতে আরোহণ করতে হবে। এজন্য সরকারি উদ্যোগ ও জনগণের উদ্যম দুটোই জরুরি।
n লেখক : অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ এবং পরিচালক,
জনসংযোগ, তথ্য ও প্রকাশনা দপ্তর, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়