আজ ফেব্রুয়ারির একুশ। হালকা শীতের আমেজে ভোরবেলার স্নিগ্ধ বাতাসে খালি পায়ে রঙ-বেরঙের ফুলের মালা হাতে রাজনৈতিক ব্যক্তি থেকে শুরু করে সর্বসাধারণের সমাগমে মুখরিত হচ্ছে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। অবশ্য শ্রদ্ধা নিবেদনে কে কতটা বেশি পারদর্শী সে চর্চাটাই চলে বেশি! ঠেলাঠেলি করে কে কত সামনে গিয়ে ফুলের তোড়াটা দিতে পারবে রীতিমত তার একটা যুদ্ধ চলে। অথচ এই শত শত লোকের ভিড়ে থেকে যদি কাউকে প্রশ্ন করা হয়, ‘একুশের পটভূমি অথবা এই দিনটা কেন তাত্পর্যপূর্ণ’ অনেকেই তার সদুত্তর দিতে পাবরেন না। টেলিভিশনে বা ইন্টারনেটের কল্যাণে এসব দেখলে বিচলিত হয়ে যাই। মনে হয় বায়ান্নর সেই দিনগুলোর তাজা রক্তের দাম কি তবে এসবই! মনে পড়ে ছোটবেলায় স্কুলে নিজেরাই হাতে হাতে শহীদ মিনার তৈরি করতাম। আহা! হূদয়ে সে কি উত্তেজনা। পাতাবাহারের ডালে দুটো-চারটে লাউয়ের সাদা ফুল, কয়েকটা জবা, কারো বাড়ি থেকে চেয়ে আনা গোলাপ অথবা নিজের গাছের দু-চারটে ফুল দিয়ে সুতোয় মোড়ানো তোড়াটা পরম শ্রদ্ধায় নিবেদন করতাম। আর জোর গলায় বেসুরো সুরে গাইতাম ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি?’
আসলেই ভুলিতে কি পারি? এরপর মফস্বলের উচ্চ মাধ্যমিকে পড়ার সময় কখনো রাস্তায় বিভিন্ন স্কুল-কলেজ মিলিত হয়ে ছোট্ট শহরতলিটা ঘুরে আসতাম। আর লেফট রাইট এর তালে তালে চলতাম আর গাইতাম, ‘ছেলেহারা শত মায়ের অশ্রু গড়া এ ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি?’
অথচ এই তারুণ্যের ছোঁয়া লাগতে না লাগতেই নতুন স্বরূপ দেখলাম। আমাদের এ ভাষা আন্দোলনের মাসে বিভিন্ন স্থানে সরকারি-বেসরকারিভাবে বক্তৃতা বা সেমিনারের আয়োজন করা হয়। এটা নিঃসন্দেহে ভালো উদ্যোগ। তরুণ প্রজন্মের কাছে ইতিহাস পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ। কিন্তু বড্ড কষ্ট হয় যখন দেখি বা শুনি সেসব বক্তারাই কি বলছেন নিজেরাই জানেন না। হয়তো ভাষা আন্দোলনের কথা বলতে গিয়ে নিজের ভোটই চেয়ে বসেন! অথবা সেসব সভা-সেমিনার শেষে হিন্দি কোনো গান উচ্চশব্দে বাজতে থাকে। আর হই-হুল্লোড়ে মেতে ওঠে জনতা। সেসময় একটা প্রশ্নই জাগে মনে তবে কি শত মায়ের অশ্রু এজন্যই ঝরেছিল? তাজা প্রাণ এজন্যই ঝরেছিল ফাগুনের সেই বিকেলে?
স্বাধীনতা স্বাধীনতা করে, একুশ ফেব্রুয়ারি বলে সারা হই অথচ ভাষার স্বকীয়তা নিজেরাই ধরে রাখতে পারি না। আমাদের দ্বারাই আমাদের এ প্রিয় ভাষা তার মাধুর্যতা ও স্বকীয়তা হারাচ্ছে। কারণ আমরা অতি উচ্চশিক্ষিত ভদ্র বাঙালিরা প্রতিটা বাক্যের সঙ্গে দু-চারটি ইংরেজি শব্দ বলতে না পারলে নিজেকে ঠিক জাহির করতে পারি না। তাই সবকিছুর সংমিশ্রণে এক জগাখিচুড়ি বানিয়ে ফেলি। এবং এতে নিজেদের বেশ তৃপ্তিই লাগে। তবে কয়েকদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া মার্কিন নাগরিক দেব্রা এমফ্রামসন এর ভাষ্যটা খুব নাড়া দিয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, ‘তারা বলে বাংলা ভালোবাসে, একুশ ভালোবাসে অথচ তারা এটা করে না।’
অর্থাত্ বাংলা ইংলিশ মিশিয়ে আমরা যে জগাখিচুড়ি ভাষায় কথা বলি সেটাকে তার কাছে বেমানান লাগে।তার ভাষ্যমতে, পৃথিবীর অনেক দেশে ঘুরেছেন তিনি অথচ এমনটি কোথাও দেখেননি। সকলে মাতৃভাষায় কথা বলে নয়তো একটা বাক্য অন্তত যে ভাষায় শুরু করে সে ভাষাতেই শেষ করে। একই বাক্যে একাধিক ভাষার ব্যবহার অন্য কোনো দেশে নেই।
এবার আসি ভবানীপ্রসাদ মজুমদার এর কবিতাটা, ‘বাংলাটা ঠিক আসে না’। আমাদের বর্তমান লোক দেখানো বাঙালির স্বভাব ফুটে উঠেছে এ কবিতায়। এমন কবিতাখানি কতটা কষ্ট থেকে লেখা যায় তা এর শব্দগুচ্ছ ও ভাবই বলে দেয়!
একুশের এটাই প্রতিজ্ঞা হোক আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস শুধু কাগজে-কলমে নয়, আমাদের কথায়, অভ্যাসে সর্বত্র এর চর্চা হোক। নইলে কি প্রয়োজন ছিল এত রক্ত ঝরিয়ে মাতৃভাষা অর্জনের? অন্য দেশে এ উত্সব পালনের পূর্বে নিজেরা এর মর্মার্থ অনুধাবন করি। শত শত ফুলকে পায়ে দলিত না করে, নিজেদের পিষ্ট হওয়া থেকে বাঁচিয়ে ঘরে বসে সেই জানা-অজানা শহীদদের জন্য প্রার্থনা করি অন্তর থেকে। কয়েকটা কনসার্ট আর সেমিনার নয়। বরং মাতৃভাষাকে লালন করি প্রতিদিনের চর্চায়। ভালোবাসি এ বাংলাকে।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়