এগিয়েছে অনেক দূর, সামনে বহু চ্যালেঞ্জ

ডিজিটালাইজেশনে অনেকদূর এগিয়েছে বাংলাদেশ। সরকারি-বেসরকারি সব সেবা এখন অনলাইনে। তবে সামনের দিনের চ্যালেঞ্জটাও কম নয়। আর্থিক খাতকে সুরক্ষিত রাখতে মনোযোগ দিতে হবে সাইবার নিরাপত্তায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জে পড়তে হতে পারে আমাদের। আজ ফাইভজির যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। রাষ্ট্রীয় অপারেটরের হাত ধরে পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হতে যাওয়া ফাইজির প্রকল্পের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রীর আইটি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়। 

২০০৮ সালের ১২ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচনী ইশতেহারে ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপরেখা ঘোষণা করেন। ২০০৯ সাল থেকেই প্রতি বছর ১২ ডিসেম্বর ডিজিটাল বাংলাদেশ দিবস পালন করে আসছে আওয়ামী লীগ সরকার। নির্বাচনে জয়ের পর ২০০৯ সালের প্রধানমন্ত্রীর আইসিটি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের তত্বাবধানে ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত রোডম্যাপ চূড়ান্ত করা হয়। তখন থেকেই ডিজিটাল বাংলাদেশে দিনবদলের যাত্রা শুরু। সেই যাত্রা শেষ হচ্ছে আজ। এখন ভিষন ২০৪১ ঘোষণা করেছে সরকার। সামনের দিনে এই অর্জন ধরে রেখে আরও কিছু নতুন পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।  

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমরা মানুষকে যে ভিশন দেখিয়েছিলাম, সেটা আজ বাস্তব। সামনের দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আমরা আমরা সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছি। আইসিটি বিভাগের ডিজিটাল নিরাপত্তা এজেন্সিকে ঢেলে সাজানো হচ্ছে। সাবাইবার হামলা ঠেকাতে তাদের প্রস্তুত করা হচ্ছে।’ 

দেশ যত ডিজিটাল হচ্ছে, সাইবার হামলার শঙ্কাও বাড়ছে। গত অক্টোবরে বাংলাদেশ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা ও জাতীয় প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্য করে একাধিকবার সাইবার গুপ্তচরবৃত্তির চেষ্টা চালানো হয়েছে বলে সরকারি একটি সংস্থার পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ মোস্তাফা জব্বার ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমরা তো এখন সবকিছুই ডিজিটালাইজেশন করে ফেলেছি। ফলে আমাদের আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ঝুঁকি যে আছে, সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই। যে কেউ এখন এটা হ্যাক করতে পারলে আর্থিক প্রতিষ্ঠানে উলটপালট করে ফেলতে পারে। এমনকি টাকাও চুরি করে নিয়ে যেতে পারে। আসলে সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক মাধ্যম নিয়ে আমরা অনেক বেশি ব্যস্ত সময় পারছি, আসলে সাইবার নিরাপত্তার বিষয়েও অনেক বেশি মনযোগ দেওয়া দরকার। সরকার এখন সেদিকে নজর দিচ্ছে।’ 

টেলিটকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সাহাব উদ্দীন ইত্তেফাককে বলেন, “সন্ধ্যা ৭টায় হোটেল রেডিসন থেকে ভার্চুয়্যালি ফাইভজির উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রীর আইটি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়। পরীক্ষামূলকভাবে ৬টি টাওয়ার দিয়ে এই যাত্রা শুরু তবে। প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়, সচিবালয়, সংসদ ভবন, টুঙ্গিপাড়া, ধানমন্ডি ৩২ নম্বর ও সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধের পাশে বসানো হয়েছে এই টাওয়ারগুলো। এক বছর পরীক্ষামূলক চলার পর ২০২২ বানিজ্যিকভাবে ফাইভজি চালু হবে।’  

বাংলাদেশ ব্যাংকের টাকা চুরি যাওয়ার ঘটনার পর বাংলাদেশে সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে নাড়াচড়া শুরু হয়। অনেক প্রতিষ্ঠানই নিজেদের নিরাপত্তা জোরদার করে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সাইবার নিরাপত্তা এখন পর্যন্ত কতটা জোরদার করা গেছে? জানতে চাইলে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির ইত্তেফাককে বলেন, ‘সিকিউরিটি সচেতনতা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে এতে কোন সন্দেহ নেই। অনেক প্রতিষ্ঠান আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রস্তুতি নেওয়ার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে আমাদের আর্থিক প্রতিষ্ঠান, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে যে পরিমান প্রস্তুতি নেওয়ার প্রয়োজন ছিল সেখানে একটা বড় ধরনের ঘাটতি আছে।’  

এখন আর শুধু বেসরকারি সেবা নয়, সরকারি সব সেবাও মিলছে অনলাইনে। কেনাকাটা থেকে শুরু করে সবচেয়ে বেশি দূর্ভোগ পোহাতে হতো যে কাজে সেই জমির পর্চাও মিলছে অনলাইনে। জন্ম-মৃত্য নিবন্ধন, ই-নামজারি, পাসপোর্টের আবেদন থেকে শুরু করে সবকিছুই মিলছে সারাদেশে ছড়িয়ে থাকা ডিজিটাল সেন্টারগুলোতে। ঢাকার বাইরে তিন হাজার ৮০০ ইউনিয়নে ফাইবার অপটিক্যাল কেবল দিয়ে ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়া হয়েছে। সেখানে তৈরি করা হয়েছে ডিজিটাল সেন্টার। সেখানে ২৭০টিও বেশি সেবা পাওয়া যাচ্ছে।  
দেশে এখন ১০ কোটি মানুষ মোবাইল ফোনে আর্থিক লেনদেন করছে। দেশের এখন এমএফএসে একাউন্ট প্রায় ১২ কোটি। এর মধ্যে সক্রিয় একাউন্টের সংখ্যা ৫ কোটির বেশি। ২০০৮ সালের ১২ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচনী ইশতেহারে ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপরেখা ঘোষণা করেন। সেখানে তিনি বলেছিলেন, গ্রামের মানুষের কাছে ডিজিটাল বাংলাদেশের সুবিধা পৌঁছে দেওয়া হবে। বিকাশের হাত ধরে এই সেবা শুরু হলেও প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত ডিজিটাল বাংলাদেশের এই সুবিধা গ্রামের মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছে ডাক বিভাগের ফিনান্সিয়াল সার্ভিস নগদ। দেশের প্রায় ৮৮ লাখ মানুষের কাছে সরকারী এই সেবাগুলো তারাই পৌঁছে দিচ্ছে।  
নগদের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর এ মিশুক ইত্তেফাককে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত রূপকল্প-২০২১ বাস্তবায়নের জন্যই আমরা এই ভাতা বিতরণের দায়িত্ব নিয়েছিলাম। আগে বয়স্ক, প্রতিবন্ধীদের অনেক কষ্ট করে উপজেলা বা জেলা সদরে গিয়ে ব্যাংক থেকে এই টাকা তুলতে হতো। আমরা মানুষের এই কষ্ট লাঘব করতেই যার টাকা তার হাতে পৌঁছে দেওয়ার কঠিন দায়িত্বটি নিয়েছিলাম। এখন আমরা বলতে পারি, সেই কঠিন কাজটি সফলভাবে করতে পেরেছি।’ 

শুধু তথ্যের সুরক্ষাই নয়, বছরে সাশ্রয় হচ্ছে ৩৫৩ কোটি টাকা। এটাকেই বলা হচ্ছে, ‘হার্ট অব ডিজিটাল বাংলাদেশ’। গাজীপুরের কালিয়াকৈরে হাইটেক সিটিতে ৭ একর জমির উপর তৈরী করা হয়েছে জাতীয় তথ্যভান্ডার বা জাতীয় ডেটা সেন্টার। এটি ইতিমধ্যে বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তর ডেটা সেন্টারের স্বীকৃতি পেয়েছে। শুধু দেশীয় তথ্যের সুরক্ষা নয়, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোও এখন এই তথ্যভান্ডার ব্যবহারে আগ্রহ দেখাচ্ছে।
১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ বিনিয়োগ বোর্ডের সভায় কালিয়াকৈরে ২৩১ একর জমিতে হাইটেক সিটি স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়। পরে আয়তন বাড়িয়ে ৩৫৫ একর করা হয়। ১৯৯৯ সালে কাজ শুরু করলেও সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে অন্ধকারে ডুবে যায় সম্ভাবনাময় হাই-টেক পার্কটি। দীর্ঘদিন থমকে থাকার পর ফের শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতায় এলে নতুন উদ্যোমে শুরু হয় পথচলা। পার্কে উচ্চগতির ইন্টারনেট, সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ সরবরাহ, যোগাযোগের জন্য শাটল ট্রেনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কম দামে পাওয়া যাচ্ছে নিষ্কণ্টক জমি কিংবা স্পেস। এখানে সরাসরি ১ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। সরকারের সার্বিক সহযোগিতায় প্রকল্পটি পিপিপি (পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ) মডেলে বাস্তবায়িত হচ্ছে। সিটিতে উৎপাদিত পণ্যে ১০ বছর কর অবকাশসহ থাকছে নানাবিধ সুবিধা। উৎপাদিত সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যার পণ্য রফতানিতে উৎপাদকরা পাবেন ১০ শতাংশ প্রণোদনা। এমন এখানে কারখানা স্থাপন করলে ব্যাংক ঋনের সুবিধাও করে দেওয়া হচ্ছে। 

আইসিটি বিভাগের লার্নিং এন্ড আর্নিং ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পের আওতায় প্রশিক্ষণ নিয়ে গ্রামে বসেই নারীরা উপার্জন করছে শত শত ডলার। ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহারে দেশে রোমিটেন্স এখন দিনদিন বাড়ছে। করোনা মহামারির মধ্যেও ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশে প্রবাসী আয়ে রেকর্ড প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এই অর্থবছরে দুই হাজার ৪৭৭ কোটি ৭৭ লাখ মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স আসে দেশে, যা আগের অর্থবছরের থেকে ৩৬ দশমিক ১০ শতাংশ বেশি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের আগস্ট মাসে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ১ দশমিক ৮১ বিলিয়ন ডলার বা ১৫ হাজার ৩৮৫ কোটি টাকা। তার আগের মাস জুলাইয়ে এসেছিল ১ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ১৫ হাজার ৯০৭ কোটি টাকা। প্রবাসীদের সঙ্গে দেশের রেমিটেন্সকে আরও বাড়িয়ে নিতে দেশ থেকেই রেমিট্যান্স যুদ্ধে নেমেছেন লাখ লাখ তরুণ। ফ্রিল্যান্সার হিসেবে কাজ করে অনলাইন ট্রান্সফারের মাধ্যমে তারা দেশে আনছেন তাদের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা। ফলে একদিক থেকে তারা যেমন নিজেদের সাবলম্বী করছেন, তেমনি বৃদ্ধি করছেন দেশের রেমিট্যান্স আয়। এই খাতে এখন ঘটে চলেছে নীরব বিপ্লব।