অসচেতন হইলে আগুন কেন রেহাই দিবে?

এই জগতে ভালোভাবে টিকিয়া থাকিতে হইলে সচেতন হইতেই হইবে। প্রায় সকল ধরনের দুর্ঘটনা মূলত ঘটেই অসচেতনতা হইতে। অসচেতন হইলে আগুনও রেহাই দেয় না। শুষ্ক মৌসুম আসিয়াছে। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা সাধারণত শুষ্ক মৌসুমে বৃদ্ধি পাইয়া থাকে। এই সময় বাতাসে আর্দ্রতা অনেক কম থাকে। সেই কারণে কোনো ধরনের স্ফুলিঙ্গের সংস্পর্শ পাইলেই জ্বলিয়া উঠে দাহ্যবস্তু। গতকাল রাজধানীর পুরান ঢাকার সুরিটোলার একটি চারতলা ভবনের তৃতীয় তলায় আগুন লাগে। ইতিপূর্বে গত ১১ ও ৯ ডিসেম্বর যথাক্রমে রাজধানীর বাংলামোটর এবং চট্টগ্রামে ঝুটের গোডাউনে ভয়াবহ আগুন লাগিয়াছিল।

আধুনিক ভবনসমূহে অগ্নিনির্বাপণের সকল প্রকারের ব্যবস্থা থাকিবার নিয়ম রহিয়াছে। উহার নিয়মিত মহড়াও দেওয়ার নিয়ম রহিয়াছে। কিন্তু এই সকল নিয়ম যেন কেবল কিতাবেই লিখা থাকে, বাস্তবতা বহু যোজন দূরে। আমাদের আধুনিক জীবনে বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যতীত একটি মুহূর্তও কল্পনা করা যায় না। বাসাবাড়ি কিংবা বাণিজ্যিক ভবনগুলিতে দিনকে দিন জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাইতেছে ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার। ইলেকট্রিসিটি এমনই এক শক্তি, যাহার ত্রুটি কখনো কাউকে ক্ষমা করে না। সেই কারণে আমরা দেখিতে পাইতেছি, যত প্রকারের অগ্নিকাণ্ড ঘটিতেছে, তাহার ৩৯ শতাংশই বৈদ্যুতিক ত্রুটির কারণে।

একই সঙ্গে শুষ্ক মৌসুম শুরু হওয়ায় অগ্নিকাণ্ডের সংখ্যাও বৃদ্ধি পাইতেছে। দেখা যায় যে, প্রতিটি আবাসনে বা বাণিজ্যিক ভবনে সময়ে সময়ে ইন্টেরিয়র পরিবর্তন কিংবা রং করা হইলেও বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের কোনো পরিবর্তন হয় না। যে কোনো পণ্যের একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ থাকিলেও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ব্যবহার অনুপযোগী না হওয়া পর্যন্ত পরিবর্তন করা হয় না। ভবন নির্মাণের সময় যেই কেবল ব্যবহার করা হইয়াছে, তাহাই সাধারণত যুগের পর যুগ ব্যবহার করা হইয়া থাকে। ইহা ছাড়া এই দেশের বৈদ্যুতিক সঞ্চালন লাইনেও প্রায়শই ত্রুটির বিষয়টি উঠিয়া আসে। ফলে বৈদ্যুতিক কারণে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা বাড়িয়াই যাইতেছে।

আশঙ্কা করিবার যথেষ্ট কারণ আছে যে, এই ব্যাপারে ব্যাপক সতর্কতা জোরদার করা না হইলে আগামী দিনে বৈদ্যুতিক কারণে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা আরও বাড়িবে। এই কথা সকলেই জানেন যে, স্ব স্ব প্রতিষ্ঠানের বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ও অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ঠিক আছে কি না—তাহা নিয়ম করিয়া যাচাই করা আবশ্যক। কিন্তু যখন পরপর অগ্নি দুর্ঘটনা ঘটে, কেবল তখনই সাময়িকভাবে নড়িয়া-চড়িয়া বসে বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান। বলিবার অপেক্ষা রাখে না, বিপুল জনঘনত্বের এই দেশে অধিকাংশ ভবনের ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত মানুষের বসবাস, অতিরিক্ত আসবাব ও ইলেকট্রনিক পণ্যের ব্যবহার আগুনের ঝুঁকি দ্বিগুণ করিয়া দেয়। অন্যদিকে অধিকাংশ ভবনে ব্যবহৃত বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের মেয়াদ শেষ হইয়া যাইবার পরও তাহা হালনাগাদ না করিলে অগ্নিঝুঁকি আরও বাড়াইয়া দেয়। এই সকল কারণে নিরাপত্তার স্বার্থে ভবনের অন্য ঝুঁকির সহিত সমন্বয় করিয়া বৈদ্যুতিক সরঞ্জামও পরিবর্তন কিংবা তদারকি জরুরি।

আমরা দেখিয়াছি যে, কোনো দুর্ঘটনা ঘটিয়া যাইবার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। অনেকেই তদন্ত কমিটির বিষয়টিকে কেবল রুটিন কাজ বলিয়া মনে করেন। যেই উদ্দেশে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়, সেই সমস্যাগুলি কেন আগে দেখা হয় নাই? বৈদ্যুতিক সমস্যা ছাড়াও দাহ্যপদার্থ লইয়া কাজ করা বিভিন্ন কারখানা যাবতীয় নিয়ম মানিয়া চলিতেছে কি না—তাহা কি নিয়মিত মনিটরিং করা হয়? যত বিপজ্জনক বস্তু লইয়াই কাজ করা হউক না কেন, নিয়ম মানিয়া চলিলে কোনো ধরনের বিপদ ঘটিবার সুযোগ নাই। কিন্তু সেই নিয়ম মানিবার বিষয়টি যাহারা দেখাশুনা করিবার জন্য থাকেন, তাহারা দায়িত্ব পালন না করিলে অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটাটাই স্বাভাবিক। সুতরাং সকল ক্ষেত্রে তিনটি শর্ত মানিতেই হইবে। তাহা হইল—সচেতনতা, সচেতনতা এবং সচেতনতা।