বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নেই শহীদ মিনার

জানতে পারছে না ভাষা আন্দোলনের সঠিক ইতিহাস

ইত্তেফাক ডেস্ক

ভাষা আন্দোলনের ৬৭ বছরেও দেশের উপজেলাগুলোর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গড়ে উঠেনি শহীদ মিনার। এতে করে নতুন প্রজন্ম জানতে পারছে না ভাষা আন্দোলনের সঠিক ইতিহাস। তাদের মধ্যে জাগছে না ভাষা আন্দোলনের চেতনা। আমাদের প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর:

সৈয়দপুর (নীলফামারী): সৈয়দপুরের বেশিরভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গড়ে ওঠেনি শহীদ মিনার। এমনকি শহর এলাকাতেও নেই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। উপজেলার প্রাথমিক, মাধ্যমিক স্কুল, কলেজ-মাদ্রাসা কিন্ডার গার্টেন মিলে ২৩৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র ১৮টিতে শহীদ মিনার রয়েছে। তবে কোনো মাদ্রাসায় শহীদ মিনার নেই। এখানে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার না থাকায় শহরের বাইরে সৈয়দপুর কলেজের শহীদ মিনারে সর্বস্তরের মানুষ ফুল দিয়ে শহীদদের শুভেচ্ছা জানিয়ে আসছেন।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার শাহজাহান মন্ডল জানান, প্রত্যেকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার থাকা প্রয়োজন। এ কাজে ম্যানেজিং কমিটি অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

চিতলমারী (বাগেরহাট): চিতলমারী উপজেলার অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নেই শহীদ মিনার। এলাকায়  প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং কলেজসহ মোট দেড় শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই শহীদ মিনার নেই।

উপজেলার ৫৮ নং দড়িউমাজুড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক অপূর্ব কুমার মৃধাসহ অন্য শিক্ষকরা জানান, প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ বছর আগেকার স্থাপিত তাদের বিদ্যালয়ে এখনো পর্যন্ত কোনো শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়নি। ফলে ২১ ফেব্রুয়ারিতে ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা জানানোর জন্য তাদের চরম বিপাকে পড়তে হয়।

হিজলা আলিম মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মো. শওকত আলী জানান, মাদ্রাসাটি ১৯৪৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও অদ্যাবধি কোনো শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়নি।

এছাড়া উপজেলার শৈলাদাহ বাকপুর কারামতিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মো. মিজানুর রহমান জানান, তার প্রতিষ্ঠানে কলাগাছ দিয়ে অস্থায়ী শহীদ মিনার তৈরি করে প্রতিবছর মাতৃভাষা দিবস পালন করা হয়।

এ প্রসঙ্গে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবু সাঈদ জানান, এলাকার অধিকাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মাদ্রাসায় শহীদ মিনার নেই। ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করার জন্য প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার থাকা প্রয়োজন। যে সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার নেই সেসব প্রতিষ্ঠানে পর্যায়ক্রমে শহীদ মিনার নির্মাণ করা হবে।

তালা (সাতক্ষীরা): তালা উপজেলায় ৭০টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ৩৫টি মাদ্রাসা, ১৩টি মহাবিদ্যালয় ও ২১১টি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে নন এমপিও ১২টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, ২৮টি মাদ্রাসা ও ১৮১টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কোনো শহীদ মিনার নেই।

স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তিত্ব প্রদীপ মজুমদার জানান, আমাদের দুর্ভাগ্য যে ভাষা আন্দোলনের ৬৭ বছর আর দেশ স্বাধীনের ৪৮ বছর পার হতে গেছে কিন্তু তালা উপজেলাসহ দেশের শতভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখনো শহীদ মিনার হয়নি। বর্তমান সরকার মুক্তিযোদ্ধার পক্ষের সরকার, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যদি প্রত্যেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার করার উদ্যোগ নেন তাহলে হয়ত মৃত্যুর আগে শহীদ মিনারগুলো দেখে যেতে পারব।

তালা উপজেলা শিক্ষা অফিসার মো. আতিয়ার রহমান জানান, জায়গা সংকটের কারণে কিছু কিছু স্কুলে শহীদ মিনার নির্মাণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে আমরাও চাই সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দ্রুত শহীদ মিনার নির্মাণ করা হোক।

তিনি বলেন, যে সকল প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার নেই সে সকল প্রতিষ্ঠানের তালিকা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। তবে শহীদ মিনার না থাকলেও সকল প্রতিষ্ঠানে যথাযোগ্য মর্যাদায় ভাষা দিবস পালিত হয়ে থাকে বলে জানান তিনি।

শিবগঞ্জ (চাঁপাইনবাবগঞ্জ): শিবগঞ্জ উপজেলায় প্রায় ৪শ’ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সহ বিভিন্ন ধরনের সহস্রাধিক প্রতিষ্ঠান থাকলেও শহীদ মিনার রয়েছে মাত্র গুটি কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা চৌধুরী রওশন ইসলাম বলেন, উপজেলা পরিষদ চত্বরে শহীদ মিনার নির্মাণের নকশা আমার হাতে এসেছে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। আগামী দুই মাসের মধ্যে সরকারিভাবে একটি শহীদ মিনার নির্মাণ হবে। তিনি জানান, উপজেলার যে সমস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার নেই সেগুলোতে শহীদ দিবসের জন্য অস্থায়ী ভিত্তিতে শহীদ মিনার নির্মাণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং আগামী ৬ মাসের মধ্যে স্ব-স্ব প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার নির্মাণের তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

বগুড়া: বগুড়ায় বেশিরভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নেই শহীদ মিনার। জেলায় মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মাদ্রাসা ও উচ্চ মাধ্যমিক কলেজ মিলে মোট ৮৪৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র ২২৫টিতে শহীদ মিনার রয়েছে। এদিকে জেলার মোট ১ হাজার ৫৯৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে শহীদ মিনার রয়েছে মাত্র ৭৯টিতে।

বগুড়া শহরের মালতীনগর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুলতানা রাজিয়া জানান, দেশ স্বাধীনের আগে প্রতিষ্ঠিত এ বিদ্যালয়ে এখনো শহীদ মিনার নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। তবে আগামীতে বিদ্যালয় চত্বরে একটি শহীদ মিনার নির্মাণের জন্য জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা বরাবর একটি আবেদন করা হয়েছে।

বগুড়া সদরের পীরগাছা এ এফ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল হান্নান বলেন, আর্থিক সঙ্কটের কারণে বিদ্যালয় চত্বরে শহীদ মিনার নির্মাণ করা যায়নি।

জেলা প্রশাসক ফয়েজ আহাম্মদ বলেন, ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানাতে প্রত্যেকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার নির্মাণ করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। স্থানীয়ভাবে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার নির্মাণ করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাগাদা দেয়া হয়েছে।

মঠবাড়িয়া (পিরোজপুর): মঠবাড়িয়ায় ২০৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আজও গড়ে ওঠেনি ভাষার শহীদ মিনার। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় ২০৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। ২০টির মতো প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিজস্ব উদ্যোগে শহীদ মিনার স্থাপন করা হয়েছে যা খর্বকায় ও জীর্ণদশা। বাকিসব বিদ্যালয়ে কলাগাছ ও মাটি দিয়ে বিকল্প শহীদ মিনার বানিয়ে তাতেই ফুল দেয় শিশু শিক্ষার্থীরা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ৫৬ নম্বর মঠবাড়িয়া মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েই কোনো শহীদ মিনার নেই। এছাড়া মঠবাড়িয়া পৌরসভার ৯২ নম্বর উদয়ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও নেই শহীদ মিনার। কয়েকজন শিশু শিক্ষার্থী মিলে কলাগাছ, কাদা-মাটি আর রঙিন কাগজ দিয়ে শহীদ মিনার বানিয়ে একুশ পালনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা রমা রানী বল বলেন, বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার না থাকায় আমরা বিব্রত। মাতৃভাষা দিবসে শিক্ষার্থীরা বিকল্প শহীদ মিনার নির্মাণ করে সেখানে শ্রদ্ধা জানায়।