সম্প্রতি আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র তার সদ্যবিবাহিত স্ত্রীকে নিয়ে দেখা করতে এসেছিল। পরিচয়ে জানতে পারলাম নববিবাহিত মেয়েটি যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। কথায় কথায় সে বলল, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বসবাসরত মানুষেরা অনেক গরিব। কথাটা শুনেই আমি অপমানিত বোধ করি। কেন যেন মনে হয়, এমন চিন্তাচেতনা থেকেই আমরা দেশের সম্পদ লুট করে বিদেশে পাচার করি। তাকে আমি বললাম, ‘আমরা মোটেও দরিদ্র নই।’ তাকে বললাম, ছোট একটা দেশে বিপুল জনসংখ্যা নিয়ে আমরা মার্জিত এবং সভ্য জীবনযাপন করছি। ভুলে যেয়ো না যে, এত জনসংখ্যা থাকা সত্ত্বেও আমরা দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষা প্রায় বিনামূল্যে গ্রহণ করি। তরুণ বয়সে জ্ঞানের স্বল্পতার কারণে এমন ধারণা আমারও ছিল। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় দেশবিদেশ ঘুরে সমৃদ্ধ জ্ঞানের আলোকে সুসন্তানের চোখে দেখি দেশ-মাতৃকার সক্ষমতা। ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি, সকল দেশের রানি সে যে- আমার জন্মভূমি’ ছেলে বেলায় যখন কবি দীজেন্দ্রলাল রায়ের দেশাত্মবোধক কবিতার চরণগুলো পড়তাম তখন মনে হতো তিনি হয়তো একটু বাড়িয়েই লিখেছেন। কিন্তু জীবনের পথ-পরিক্রমায় দেশ-বিদেশের অভিজ্ঞতা থেকে এখন উপলব্ধি করি যে, তিনি প্রকৃতপক্ষে অতিরঞ্জিত কোনো কথা বলেননি।
আবহমানকাল থেকে এদেশের জলবায়ু, আবহাওয়া, প্রকৃতি সব কিছুই ছিল মানব বসবাসের ক্ষেত্রে অনুকূল—তাইতো এদেশের মানুষ বেড়েছে জ্যামিতিক হারে। এ দেশ আমাদের। দেশ-মাতৃকার পলিবাহিত মাটিতে জন্ম গ্রহণ করে আমরা গৌরব বোধ করি। প্রাকৃতিক ধন-সম্পদের ভান্ডার আমাদের এই ভূখণ্ড। প্রকৃতি আমাদেরকে উজাড় করে দিয়েছে তার অবারিত ধন-ভান্ডার। যেখানে ইউরোপ মহাদেশের আয়তন ১ কোটি ১ লক্ষ ৮০ হাজার বর্গকিলোমিটার সেখানে আমাদের আয়তন ১ লক্ষ ৪৭ হাজার বর্গকিলোমিটার। ইউরোপ মহাদেশের সঙ্গে তুলনা করলে আমাদের আয়তন ইউরোপের ৬৯ ভাগের একভাগ, যার জনসংখ্যা ইউরোপের পাঁচ ভাগের ১ ভাগ। এই তথ্য থেকেই প্রতীয়মান হয় যে, আমাদের প্রকৃতি যেমন সমৃদ্ধ, ঠিক তেমনি আমাদের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে সহিষ্ণুতা এবং সম্প্রীতির বন্ধন অতীব দৃঢ়। এই ছোট জায়গাতেই বিপুল জনগোষ্ঠীর জীবন ধারণের প্রয়োজনীয় উপাদান তথা খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্হান ইত্যাদির ব্যবস্হা হচ্ছে। করোনাকালীন লকডাউনের কারণে সিঙ্গাপুরের মতো উন্নত দেশে খাদ্যের সংকট হয়েছে, যেখানে লোকসংখ্যা মাত্র ৫৬ লাখ ৮৫ হাজার ৮০০। কিন্তু আমাদের দেশে এত বিপুল জনসংখ্যা নিয়েও দেশ খাদ্যসংকট ছাড়াই চলমান। এর কারণ সিঙ্গাপুর নিজেদের খাদ্যের মাত্র ৮ শতাংশ উত্পাদন করে। বাকিটুকু বাইরের দেশ থেকে আমদানি করতে হয়।
প্রাকৃতিক বৈচিত্রে্যর বিপুল সম্ভাবনায় আমরা পেয়েছি ষড়ঋতুর সমাহার। এই ষড়ঋতুর কারণে আমাদের দেশে পর্যায়ক্রমে আসে গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরত্, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত। ছয় ঋতুতে আমাদের প্রকৃতি ছয়টি নতুন সাজে সজ্জিত হয়। এই অপরূপ প্রকৃতি আমাদের দিয়েছে অপার সৌন্দর্যমণ্ডিত মন ও হূদয়। কিন্তু পৃথিবীতে এমন অনেক দেশ আছে যেখানে দিনের বেলায় খোলা জায়গায় ডিম রাখলে ডিম গরমে সিদ্ধ হয়ে যায়। আবার অনেক দেশ আছে, যেখানে শীতে বরফ পড়ে। খুব বেশী সময় বাহিরে থাকা যায় না। ঘরের ভেতরেও হিটিং সিস্টেমের কারণে অক্সিজেনের স্বল্পতা থাকে। ঠান্ডায় সূর্য ওঠে না, ফলে মানুষ এক ধরনের বিষণ্নতায় ভোগে। সেদিক থেকে বলা যায়, ঋতু বৈচিত্র্য আমাদের জীবনকে যেমন সহজ করেছে, ঠিক তেমনি সমৃদ্ধও করেছে। পারিবারিক বন্ধন আমাদের আবহমান কালের চিরন্তন ঐতিহ্য। মা-বাবা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবের মধ্যে এমন মায়া-মমতা, ভালোবাসা বিশ্বের অনেক দেশেই বিরল। এই নিবিড় বন্ধন শুধু মানুষের মধ্যে আত্মিক প্রশান্তিই আনে না, এর সঙ্গে জীবনের স্বাদ ও কর্মস্পৃহাকে অর্থবহ করে তোলে। বর্তমান সরকারের গতিশীল ও পরিকল্পিত চিন্তাধারার মাধ্যমে দেশ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। নিজের দেশের পণ্যের বিজ্ঞাপন যখন ভিনদেশি টেলিভিশনের পর্দায় দেখা যায় তখন মানুষ হিসেবে মনটা খুশিতে ভরে ওঠে। যখন শুনি আমাদের তৈরি ওষুধ পৃথিবীর ৮৮টিরও বেশি দেশে রপ্তানি হচ্ছে, তখন গর্ববোধ করি। যখন জানি পদ্মা নদীর ওপর নিজস্ব অর্থায়নে ব্রিজ হচ্ছে তখন ভালো লাগার মাত্রাতে যোগ হয় এক অনির্বচনীয় গর্ব ও প্রত্যাশা। আগামীর সম্ভাবনাময় চোখে যখন দেখি আমাদের আইটি সেক্টর গার্মেন্টস সেক্টরকেও পেছনে ফেলবে তখন বিস্ময়ে অভিভূত হই। আমরাই পারি আমাদের কৃষি দ্রব্যের বিপুল সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে কীটনাশক মুক্ত কৃষিপণ্যের বিশাল বিদেশি বাজার সৃষ্টি করতে। কখনো কখনো খাদ্যে ভেজাল, নারী ও শিশু নির্যাতন, কর্মক্ষেত্রে দুনীর্তি, চাকরির নিয়োগে অসচ্ছতাসহ বহু নেতিবাচক কার্যকলাপ আমাদের সোনার বাংলার এই ইতিবাচক ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ² করছে। এক্ষেত্রে আমরা উন্নয়নের অভীষ্ট লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়ার যাত্রা শুরু করলেও কোনো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমাদের অগোচরেই থেকে যাচ্ছে। আর তা হচ্ছে জীবন ও কর্মক্ষেত্রে আমাদের নৈতিকতার অভাব। কাজেই এই রাহু গ্রাস থেকে বেরিয়ে আসতে হলে আমাদের জীবনের প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে নৈতিকতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। আমাদের বুঝতে হবে, বিশ্বাস ও সততাই ব্যবসায়ী এবং ভোক্তাদের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে। এই সেতু বন্ধন যত মজবুত হবে উন্নতিও ততটাই টেকসই হবে। পরিবার, সমাজ, জাতি যখন সততা ও নৈতিকতার চর্চা করবে এবং তার প্রতি বিশ্বাস রাখবে তখন দেশের প্রত্যেকটি কর্মকাণ্ডে থাকবে প্রাণ ও প্রাচুর্যের ছোঁয়া।
সু-স্বাস্হে্যর জন্য যেমন সুষম খাদ্যের প্রয়োজন, তেমনি সুন্দর ও সুখী জীবনের জন্য প্রয়োজন আত্মা এবং মনকে পরিতুষ্ট করা। আত্মা এবং মন উভয়েরই খাদ্যের প্রয়োজন। আমার মতে আত্মা ও মন উভয়ই ভিন্ন ভিন্ন সত্তা এবং উভয়ের মধ্যে রয়েছে সূক্ষ্ম পার্থক্য। মন নৈতিক-অনৈতিক উভয় কাজেই আনন্দ পেতে পারে। উদাহারণস্বরূপ হিংসাবশত অন্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে মন তাত্ক্ষণিকভাবে আনন্দিত হয়। কিন্তু আত্মার তুষ্টির উপাদান শুধুই ভালো চিন্তা ও সত্কর্ম। ভোগবাদী সমাজ ব্যবস্হায় ধারণা করা হয়, মন ও দেহকে তুষ্ট করতে পারলেই মানুষ সুখী। কিন্তু এই ধারণা যে কতটা ভুল তা সুখের মাপকাঠিতে পৃথিবীর সর্ববৃহত্ পরাশক্তির আনুক্রমিক অবস্হানের দিকে তাকালেই বুঝতে পারা যায়। আমরা সাধারণ মানুষ আত্মার তুষ্টি খুঁজতে পারি নিজের গণ্ডির মধ্যে থেকে ভালো কাজের মাধ্যমে, আমাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে, বাবা-মা, শিক্ষক ও গুরুজনদের শ্রদ্ধা করে, প্রতিবেশি ও আত্মীয়-স্বজনদের সাহাঘ্য করে, নিজের ভাষা ও সংস্কৃতিকে বুকে লালন করে, দেশকে ভালোবেসে এবং দেশের উন্নতিতে অবদান রেখে। আমরা বলি—‘আমরা বাঁচার জন্য খাই’। কিন্তু বাঁচার জন্য যে আরো গুরুত্বপূর্ণ উপাদান অক্সিজেন, সেকথা উহ্য রাখি। শিশুর বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশের সময় কোনো কারণে মস্তিষ্কে অক্সিজেনের সরবরাহ কম হলে শিশু দৈহিকভাবে বেড়ে ওঠে ঠিকই, কিন্তু তার বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশ ঘটে না। এই অক্সিজেনকেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার অসাধারণ লেখনীতে নৈতিকতার সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাই সমাজের প্রতিক্ষেত্রে নৈতিকতার চর্চা আমাদের করবে সুখী, সমৃদ্ধ ও উন্নত।
লেখক: উপাচার্য, চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়