কৃষির যান্ত্রিকীকরণ ও ভতু‌র্কিতে অনিয়ম 

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বত্সরে যেই সকল খাতে আমূল পরিবর্তন সাধিত হইয়াছে তাহার মধ্যে প্রথমে কৃষির কথাই উল্লেখ করিতে হয়। বিশেষ করিয়া ১৯৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যার পর কৃষিতে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার যেই হারে বাড়িয়াছে, তাহা এক কথায় বিস্ময়কর। কৃষির যান্ত্রিকীকরণ আমাদের কৃষি ও কৃষকের জীবনে ব্যাপক ইতিবাচক পরিবর্তন আনিয়াছে। এখন শুধু পাওয়ার টিলার নহে, কৃষকরা নূতন নূতন প্রযুক্তির সহিত পরিচিত হইতেছেন। মাটি প্রস্ত্ততকরণ, বীজ বপন, সার প্রয়োগ, নিড়ানি, শস্য কাটা, মাড়াই, ঝাড়াইসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহূত হইতেছে আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি। এই জন্য সীমিত পরিসরে হইলেও কৃষিযন্ত্র নির্মাণশিল্পও গড়িয়া উঠিয়াছে আমাদের দেশে। বর্তমানে আমাদের দেশে কৃষিকাজে গরু ও লাঙলের ব্যবহার প্রায় উঠিয়া গিয়াছে বলিলেই চলে। ৯৭ শতাংশ জমি প্রস্ত্তত হইতেছে এখন যন্ত্রের মাধ্যমে। আর ধান রোপণ ও কাটায় ব্যবহূত হইতেছে ৩ শতাংশ যন্ত্র। তবে কৃষির যান্ত্রিকীকরণে সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ যেইভাবে বাড়িতেছে, তাহাতে সামগ্রিকভাবে কৃষি খাতের আরো অগ্রগতি সাধিত হইবে। আমেরিকা, রাশিয়াসহ উন্নত দেশসমূহে সকল পর্যায়ের কৃষিকাজে ৯৫ শতাংশ আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহূত হইতেছে। আমাদের দেশও একদিন এই পর্যায়ে উন্নীত হইবে বলিয়া আশা করা যায়। 

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সূত্র মতে, চলতি ২০২০-২১ অর্থ বত্সরে কৃষি প্রযুক্তি খাতে ৭৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হইয়াছে। ইহাছাড়া ভতু‌র্কি বরাদ্দ ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বাড়াইয়া ৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা করা হইয়াছে। কৃষি যান্ত্রিকীকরণে কৃষকদের উত্সাহিত করিবার জন্য সরকার কৃষিযন্ত্রের ক্রয়মূল্যের উপর সমগ্র দেশে ৫০ শতাংশ ও হাওর-উপকূলীয় এলাকায় ৭০ শতাংশ ভতু‌র্কিতে কৃষি যন্ত্রপাতি সরবরাহ করিতেছে। এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১০ হইতে ২০২০ সাল পর্যন্ত প্রায় ৬৯ হাজার ৮৬৮টি কম্বাইন হারভেস্টার সিডার, পাওয়ার টিলারসহ কৃষি যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হইয়াছে। ফলে গ্রামাঞ্চলে অনেক শিক্ষিত কৃষিজীবী উদ্যোক্তা তৈরি হইয়াছে যাহা আশাব্যঞ্জক। কৃষিকাজে দক্ষতা ও উত্পাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি কৃষি শ্রমিকের যে ঘাটতি ছিল, তাহা বহুলাংশে দূর হইয়াছে। হাওর এলাকায় দ্রুত ফসল কাটিয়া আগাম বন্যা হইতে ফসল রক্ষা করা সম্ভব হইয়াছে। এই সকল সফলতায় সর্বশেষ ৩ হাজার ২০ কোটি টাকার কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্প হাতে লওয়া হইয়াছে; কিন্তু ভতু‌র্কির টাকায় বিতরণকৃত কৃষি যন্ত্রপাতিতে কোথাও কোথাও নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠিতে শুরু করিয়াছে। বিশেষ করিয়া হাওর অঞ্চলে চুক্তি লঙ্ঘন করিয়া এলাকায় না আনিয়াই হার্ভেস্টার বিক্রয় করিয়া দিতেছে একটি অসাধু চক্র। যেমন—কিশোরগঞ্জের সদর উপজেলায় এই বত্সর ১৯টি কম্বাইন হার্ভেস্টার বরাদ্দ দেওয়া হইয়াছে; কিন্তু এই উপজেলার দানাপাটুলি ইউনিয়নেই দেওয়া হইয়াছে ১৮টি। এক পরিবারে চারটি হার্ভেস্টার পাওয়ারও ঘটনা ঘটিয়াছে। এই ক্ষেত্রে কী পরিমাণ অনিয়ম হইতেছে ইহা তাহার একটি ছোট্ট উদাহরণ মাত্র। 

একটি কম্বাইন হার্ভেস্টারের দাম কোম্পানি ভেদে ২৮-২৯ লক্ষ টাকা। ৭০ শতাংশ ভতু‌র্কি দেওয়ায় সরকার এক একটি হার্ভেস্টারে ভতু‌র্কি দিতেছেন ২০ লক্ষ ৩০ হাজার টাকা; কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অনৈতিক সুবিধা লইয়া একটি ইউনিয়ন কিংবা একটি পরিবারেই অনেক হার্ভেস্টার বরাদ্দ প্রদান করিতেছেন। ইহাতে প্রকৃত কৃষকরা সরকারি ভতু‌র্কির সুবিধা হইতে বঞ্চিত হইতেছেন। চুক্তি অনুযায়ী কমপক্ষে তিন বত্সর ব্যবহার করিবার পর ইহা অন্যের নিকট বিক্রয় করা যাইবে। এমনকি কেহ যদি তাহার হার্ভেস্টার অন্যত্র ধান কাটিবার জন্যও পাঠান, তাহা হইলে কৃষি বিভাগের লিখিত অনুমতি লাগিবে। এত কড়া নিয়মকানুন থাকিবার পরও কীভাবে অসাধু ব্যক্তিরা ইহার সুবিধা লাভ করিতেছে? এই অনিয়ম বন্ধে কৃষি মন্ত্রণালয়কে কার্যকর পদক্ষেপ লইতে হইবে। কৃষি যান্ত্রিকীকরণের উদ্যোগকে আরো আগাইয়া লইতে এখন আবাদ-পরবর্তী ও ফসল সংরক্ষণ কাজে আধুনিক যন্ত্রের ব্যবহারের প্রতি গুরুত্বারোপ করিতে হইবে। কৃষি বিজ্ঞানীরা বলিতেছেন, উন্নত কৃষি যান্ত্রিকীকরণে ফসল কর্তনোত্তর ৭-১০ শতাংশ ক্ষতি বা অপচয় হ্রাস করিয়া দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব। এই জন্য কৃষিযন্ত্রকে জামানত হিসাবে ধরিয়া ব্যাংক ঋণেরও ব্যবস্হা করা যাইতে পারে।