এটি বিজয়ের গল্প। যে গল্পের কথাগুলো অনেক হার না মানা নারীর কোনো একজনকে সাহসী হয়ে বাঁচার অধিকার ফিরিয়ে দেয়, ফিরিয়ে দেয় সম্মান। আমাদের দেশে অনেক নারীই উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করছে। নিজের পায়ে নিজে দাঁড়াচ্ছে। কিন্তু তাদের এ পথচলাটা খুব একটা সুখকর হয় না।
বিশ্বব্যাপী কোভিডের ভয়াল থাবায় চাকরি হারিয়েছিলেন অনেক মানুষ। বন্ধ হয়ে যায় অনেক অফিস, ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান। বহু পেশার লোক স্বপ্নভঙ্গের বেদনা নিয়ে ঢাকা ছেড়ে গ্রামে ফিরে যায়। সেই তালিকায় ছিলেন ময়মনসিংহের ইমো সিলভিয়া ড্যানী। এক দিকে স্বামীর অফিস বন্ধ হয়ে যাওয়া অন্যদিকে গর্ভের আগত সন্তানকে নিয়ে সে সময় বেশ দুশ্চিন্তায় পরে যান ড্যানী। পরিবারে নেমে আসে আর্থিক টানাপোড়ন। অসচ্ছল সংসার হলেও হাল ছাড়েননি ড্যানী। পরিশ্রম, নিষ্ঠা, সততা আর মেধাকে পুঁজি করে পা বাড়িয়েছেন তিনি। এই এগিয়ে চলাই আজ তাকে ক্ষুদ্র শিল্পোদ্যোক্তা অদম্য একজন নারী হিসেবে দাঁড় করিয়েছে এই সমাজে। নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে প্রতিকূলতাকে জয় করে আজ স্বাবলম্বী নারী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছেন ড্যানী।
ড্যানী জানান, সন্তান পেটে আসার পর থেকেই মায়ের আনন্দের সীমা থাকে না। এই আনন্দ এখন নানাভাবে উদযাপনও করছেন তারা। বেবি বাম্প ফটোশুট, সন্তান আসার প্রস্তুতি, ওর জন্য আগাম কেনাকাটা থেকে শুরু করে হয় নানা আয়োজন। কিন্তু আমার ছোট মেয়ে জেইডেন যখন আমার গর্ভে আসে তাকে নিয়ে আমরা কনফিউশনে ছিলাম। কারণ কোভিড দুঃসময় তার আগমন হয়েছিল। সে সময় স্বামী হিলটনের ট্রাভেল এজেন্সি অফিস প্রায় অফ ছিল। এতে ঢাকা থেকে সব গুটিয়ে ময়মনসিংহের কুড়ে ঘরে চলে আসতে হয় আমাদের। কিন্তু এখানেও আয়ের তেমন কোনো উৎস খুঁজে পাচ্ছিলাম না। শেষে সংসারের হাল ধরি আমি। জেইডেন কে পেটে নিয়ে সংগ্রাম শুরু হয় আমার।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে মায়াবন বিহারীনি নামে একটা পেজ খুলি। প্রথম দিকে তেমন সাড়া না পেলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিচিতি বাড়ে আমার কাজের। জেইডেনের সঙ্গে সঙ্গে বারাতে থাকে আমার ব্যাবসা। চলতে থাকে আমাদের বেঁচে থাকার যুদ্ধ। সে সময় এমনও দিন গেছে কাস্টমারদের বাসায় গিয়ে ওর বাবা, আমি কিংবা কখনো বড় মেয়ে জেনেসিস ডেলিভারি দিয়ে এসেছি। সবকিছু ভালো চলছিল। গত সেপ্টেম্বর জানতে পারি মেয়ে বাবু হবে। আসলে মেয়েরা গড গিফটেড। যখন আসে তখন অনেক শুভ সংবাদ নিয়ে আসে। স্বামীর অফিস আবার আগেরমত শুরু হল। আমার পেজের সেল বাড়লো।
চলছিল, ৩৪ সপ্তাহে শেষ দিকে রাতে আমার ৩ বার লেবার পেইন হয়। রাতে সিনিয়র ডাক্তার না থাকায় জেইডেনের সেফটির জন্য ইনজেকশন নিতে হয় আমাকে। সেই সময় মা, বাবা, খালা, আকিব, হিলটন পাশে ছিল। কোনোরকম রাত পার করে হাসপাতালে এডমিট হই। কন্ডিশন খারাপ হওয়ায় তারা দেরি করেনি। সিজার রুমে ইন করলাম। মা ময়মনসিংহ মেডিকেল এর এক্স প্রিন্সিপ্যাল থাকায় অনেকেই পাশে ছিলেন। কিন্তু মেয়ের কান্না শুনে শান্তি পাই নি। কারণ তখন ডাক্তার বলছিলেন দ্রুত অক্সিজেন শুরু করেন, নীল হয়ে গিয়েছিল। দেরী না করেই প্রসেস করায় ৬ ঘণ্টা অক্সিজেন নেওয়ার পর আমার কাছে আনা হল জেইডেনকে। তখন থেকে যুদ্ধ শুরু হল ২ কেজি বেবিকে বড় করার। আজকে ১৬ ডিসেম্বর ২ মাস ১৫ দিন তার। আজকে বিজয়ের ৫০ বছরে মনে হল, আমিও যুদ্ধ জয় করেছি, মা হওয়ার যুদ্ধ। জেনেসিস, জেইডেন আমার দুই বিজয় নিশান। তাদের জন্য দোয়া করবেন।