পর্যটনসমৃদ্ধ বারেক টিলায় পানির জন্য হাহাকার 

হাওরবেষ্টিত সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী যাদুকাটা নদীর তীরঘেঁষা বারেক টিলায় বসবাসকারী দুই শতাধিক মানুষ সারা বছর খাবার ও গৃহস্হলি কাজের জন্য পানির তীব্র সংকটে ভোগে। পাহাড়ি বিপজ্জনক পথ বেয়ে ঝরনা থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয় তাদের। অবিশ্বস্য হলেও সত্য, এখানে এক কলস পানির দাম ২০ টাকা। এক ড্রাম অর্থাৎ, ৩৫ লিটার পানি ১০০ টাকা। পানির জন্য প্রায় ৫০০-৬০০ ফুট উঁচু টিলায় পাথরের এবড়ো-খেবড়ো পথে বিশেষ করে নারীদের ওঠানামার কষ্টকর দৃশ্য চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না।

এলাকার সংরক্ষিত নারী ইউপি সদস্য সুষমা জাম্বিল বলেন, ৫০০ ফুট উঁচু টিলায় ওঠানামা করে পানি সংগ্রহ অনেক কষ্টকর। তিনি বলেন, মানবিক ও স্বাস্হ্যগত দিক বিবেচনায় এখানে মোটরের সাহাঘ্যে পানি সরবরাহ জরুরি। অবশ্য তাহিরপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান করুণা সিন্ধু চৌধুরী বাবুল বলেছেন, এই টিলায় নলকূপ বসালে পানি ওঠে না। বাসিন্দাদের পানির সংকট নিরসনে জনস্বাস্হ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করে শিগ্গিরই ব্যবস্হা নেবেন।

সূত্রমতে, টিলায় বসবাসকারী ৪৩টি পরিবারের দুই শতাধিক বসিন্দার পানির সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নেই এমন অভিযোগ করে স্হানীয়রা বলেন, ২০০৮ সালে ঐ টিলায় একটি নলকূপ স্হাপন করা হলেও সেটি শুরু থেকেই কোনো কাজে আসেনি। দেশভাগের আগে ১৯৪২ সালে এই টিলায় ১৩টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী পরিবারের বসবাস ছিল। বর্তমানে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ৩৩টি ও ১০টি বাঙালি পরিবার বাসবাস করছে। গ্রামবাসী বলেন, একসময় এই টিলার নাম ছিল বড়ঘোপ টিলা। কিন্তু কবে কীভাবে এর নাম বারেক টিলায় পরিণত হয়েছে তা তারা জানেন না। সীমান্তসংলগ্ন ঝরনায় গোসল শেষে কোমলমতি শিশু-কিশোর ও নারীরা বড় পাত্রে পানি ভরে মাথায় করে নিয়ে যায় ৫০০ ফুট উঁচু টিলার ঘরে। দিনমজুর স্বামী ও মমতা বেগমের পরিবারের সাত সদস্যের জন্য খাবার ও গৃহস্হালির পানি সংগ্রহেই আধা বেলা সময় চলে যায়। তবু সময় বাঁচানোর জন্য তারা ঝুঁকিপূর্ণভাবে পানিভর্তি দুটি কলস নিয়ে টিলা বেয়ে ওপরে ওঠানামা করেন। অথচ বারেক টিলাসংলগ্ন ভারত সীমান্েতর মেঘালয় পাহাড়ে বসবাসকারীরা বৈদু্যতিক মোটরের সাহাঘ্যে পানি ব্যবহার করে থাকে। কিন্তু পর্যটনসমৃদ্ধ নয়নকাড়া লাগুয়া বারেক টিলার বাসিন্দারা আজো পানির সুবিধা পায়নি। অথচ বারেক টিলার কাছ দিয়ে বৈদু্যতিক লাইন গেছে টেকেরঘাট এলাকায়। ভরা শীতেও বিশাল এই টিলায় শাক-সবজি ফলাতে

পারেন না বলে জানান স্হানীয়রা। তাই গরিব মানুষ বাধ্য হয়ে শাক-সবজি কিনে খায়। বারেক টিলার বাসিন্দা সত্তরোর্ধ্ব মহিমা আজিম জনান, এখানে পানি দুষ্প্রাপ্য। এই টিলায় নির্মাণকাজ করতে গেলেও পানি সংগ্রহ করতে হয় টাকা দিয়ে। তিনি বলেন, ২০০৮ সালে রোমান ক্যাথলিক চার্চে একটি নলকূপ স্হাপন করলেও পানি না আসায় প্রথম থেকেই অকেজো। টিলার বাসিন্দা তৃপ্ত বনোয়ারী বলেন, পাহাড়ি ঝরনার পানিও এখন ভালো নেই। ঝরনার পাশে লোকজন গরু চরায়। কেউ কেউ মলমূত্রও ত্যাগ করে। আবার হেমন্তে ঝরনার পানি অনেক কমে যায়। টিলার অধিকাংশ মানুষই দরিদ্র। দু-তিনটে পরিবার টাকা দিয়ে পানি ওঠায়। দক্ষিণ বড়দল ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য সম্রাট মিয়া বলেন, টিলার দুই শতাধিক বাসিন্দার জন্য পানির ব্যবস্হা করা একান্ত দরকার। উপজেলা জনস্বাস্হ্য প্রকৌশলী আল আমিন বলেন, জায়গাটি সার্ভে করে টিলার বাসিন্দাদের পানির সংকট নিরসনে দ্রুতই প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।