ওমিক্রন কতখানি বিপজ্জনক—তাহা এখনো স্পষ্ট নহে। তবে ইহা স্পষ্ট যে, ওমিক্রন মানুষের চাইতেও এই মুহূর্তে অধিক কুঠরাঘাত করিতেছে বিশ্ব অর্থনীতির শাখা-প্রশাখায়। আমেরিকা ও ব্রিটেনে প্রতিদিনই বিপুলসংখ্যক মানুষের ওমিক্রনে আক্রান্তের ঘটনা বৃদ্ধি পাইয়াছে এবং একইসঙ্গে বিশ্বব্যাপী শতাধিক দেশে ওমিক্রন ছড়াইয়া পড়িয়াছে।
ইহার পর গত সপ্তাহে শুক্র ও সোমবার বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিপুল পতনের মুখে পড়িয়াছে শেয়ার বাজার। প্রতিবেশী ভারতে ঐ দুই দিনে ১১.৪৫ লক্ষ কোটি রুপির শেয়ার সম্পদ হারাইয়াছে বিএসইর লগ্নিকারীরা। অর্থাৎ মাত্র দুই দিনে বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৩ লক্ষ কোটি টাকা স্রেফ ‘নাই’ হইয়া গিয়াছে। এই অর্থ আমাদের দেশের প্রায় তিন বৎসরের বাজেটের সমান।
এইদিকে ওমিক্রন আটকাইতে নেদারল্যান্ডসে লকডাউন ঘোষণা করা হইয়াছে। কড়াকড়ি করিতেছে জার্মানি। ব্রিটেন ও আমেরিকার অবস্থা প্রতিদিনই খারাপ হইতেছে এবং এই অবস্থায় বাজারে লগ্নিকারীরা আরো পতনের ভয়ে শেয়ার ধরিয়া রাখিতে চাহিতেছেন না। এইদিকে মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে আনিতে আমেরিকায় গত সপ্তাহেই সুদ বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিয়াছে দেশটির শীর্ষ ব্যাংক ফেডারাল রিজার্ভ। এমনকি মার্চের মধ্যে ত্রাণ প্রকল্পের লাগাম টানিবার কথাও বলিতেছে। ইতিমধ্যে সুদ বাড়াইয়াছে ব্যাংক অব ইংল্যান্ড। গত বত্সর মার্চে প্রথম বার করোনার রক্তচক্ষু, তাহার পর এই বত্সর ডেলটা ধরনের অভিঘাত সামলাইয়া সারা বিশ্বের অর্থনীতি যখন স্বাভাবিক হইতেছিল তখনই ওমিক্রন ধরন বিশ্ব অর্থনীতিকে তাহার সকল স্পাইক দিয়া চাপিয়া ধরিয়াছে।
মানুষের জীবন যেমন অমূল্য, তেমনি তাহার বাঁচিয়া থাকিবার জন্য ন্যূনতম কাজের নিশ্চয়তাও কম গুরুত্বপূর্ণ নহে। মহামূল্যবান জীবনকে রক্ষা করিতে জীবিকাই একমাত্র অক্সিজেন। সেই অক্সিজেন ছাড়া বাঁচিবে না জীবন। কিন্তু ওমিক্রন যদি এইভাবে অর্থনীতির উপর আঘাত করিতে থাকে, তবে সারা বিশ্বেই পুনরায় বিপুল সংখ্যক মানুষের জীবিকার উপর কোপ পড়িতে পারে। এই সংকটের গভীরতা ও তীব্রতায় উন্নয়নশীল বিশ্বের ছোট অর্থনীতির দেশগুলিকে সম্ভবত স্বয়ং সৃষ্টিকর্তাকে নিজের হাতে বাঁচাইতে হইবে।
এই অবস্থায় একটি দেশ-সমাজ পরিচালনার জন্য ম্যানেজমেন্ট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মনে রাখিতে হইবে, ম্যানেজমেন্ট দুই ধরনের। ইহার একটি স্বাভাবিক সময়ের, অন্যটি অস্বাভাবিক সময়ের। ২০২০ সালে করোনার জন্য বৈশ্বিক অর্থনীতি ৪.৩ শতাংশ সংকুচিত হইয়াছিল। তুলনা করিয়া বলা যায়, ১৯২৯ এবং ২০০৯ সালের মহামন্দার চাইতেও গত বৎসর করোনায় বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকোচন হইয়াছে অনেক বেশি। গত দুই বৎসর ধরিয়া করোনার একের পর এক নূতন নূতন ধরন মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর যুগপৎ আঘাত হানিয়াছে।
আমরা জানি না, কতখানি খারাপ দিন আসিতে পারে, সার্বিক পরিস্থিতি কত দূর পর্যন্ত খারাপ হইতে পারে। এই অবস্থায় কোনো দেশ যদি স্বাভাবিক সময়ের মতো গতানুগতিক ম্যানেজমেন্ট দ্বারা পরিচালিত হয়, তবে তাহা চলমান সমস্যা ও আসন্ন বিপর্যয়কর পরিস্থিতিকে আরো জটিল করিতে পারে। ইতিমধ্যে দেশের বিপুলসংখ্যক প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতায় টিকিতে না পারিয়া ব্যবসায় সংকুচিত করিয়াছে। শ্রমিক ছাঁটাই করিতে বাধ্য হইতেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধই হইয়া গিয়াছে। এই অবস্থায় আমাদের রাষ্ট্র পরিচালনায় যদি আলাদা ম্যানেজমেন্ট তৈরি না করে, তবে সামনে দীর্ঘ অন্ধকার রাত দেখা দিতেই পারে।
পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি থাকিলে অদূর ভবিষ্যতে টানেলের শেষ প্রান্তেও আলোর দেখা মিলিবে না। তাহা ছাড়া, করোনার নূতন নূতন ধরন আগামী আরো কয়েক বৎসর সারা বিশ্বকেই নাজেহাল করিবে। ইহাতে বেশির ভাগ সাধারণ মানুষ কতখানি মানসিকভাবে সুস্থ থাকিতে পারিবে, তাহা বলা মুশকিল। সুতরাং সময় থাকিতে নূতন পরিস্থিতি সামলাইতে আলাদা ম্যানেজমেন্টের ব্যবস্থা অত্যন্ত জরুরি।