আসুন, সবাই মিলে এই সংকট মোকাবিলা করি

করোনার নূতন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রনকে প্রথম দিকে গুরুত্ব না দেওয়া হইলেও ক্রমেই ইহা দুশ্চিন্তার কারণ হইয়া উঠিতেছে। ইতিমধ্যে ওমিক্রনে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটিয়াছে। এই বৎসর নভেম্বরে দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রথম শনাক্ত হয় এই ভ্যারিয়েন্ট। এখন ইহা ৯০টিরও অধিক দেশে ছড়াইয়া পড়িয়াছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ড. অ্যান্থনি ফাউচি সবাইকে সতর্ক করিয়া দিয়াছেন। দেশটিতে নূতন করিয়া করোনা আক্রান্তদের ৭৩ দশমিক ২ শতাংশই ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্টে সংক্রমিত।

ইহাতে বড়দিনের উৎসব থাকিলেও অনেক দেশ করোনা-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিধিনিষেধ জারি করিয়াছে। যেমন—ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা দিয়াছে। থাইল্যান্ডে কোয়ারেন্টাইন বাধ্যতামূলক করা হইয়াছে। স্কটল্যান্ড বড়দিনের উৎসব বাতিলের চিন্তাভাবনা করিতেছে। নেদারল্যান্ডস এই সময়ও কঠোর লকডাউনের ঘোষণা দিয়াছে। সবচাইতে বড় কথা হইল, খোদ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মহাপরিচালক ট্রেডোস আধানম ঘেব্রেয়েসুস বলিয়াছেন, ওমিক্রন ডেলটার চাইতেও দ্রুত সংক্রামক। তাই জীবন বাতিল হইয়া যাওয়ার তুলনায় অনুষ্ঠান বাতিল করাই শ্রেয়।

কিন্তু এই পরিস্থিতিতে অর্থনীতির কী হইবে? জীবিকা না থাকিলে জীবন রক্ষা পাইবে কীভাবে? তাই ওমিক্রনের সংক্রমণে বিশ্ব অর্থনীতিতেও তৈরি হইয়াছে নূতন শঙ্কা। বাংলাদেশসহ পৃথিবী যখন করোনা মহামারির দেড় বৎসরের ধকল কাটাইয়া উঠিতে শুরু করিয়াছিল, তখন এই আশঙ্কা উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা তৈরি করিতেছে। ওমিক্রনের পরিণতিতে শেষ পর্যন্ত কী পরিস্থিতি দাঁড়াইবে তাহা আমাদের জানা নাই। তবে বিশেষজ্ঞরা বলিতেছেন, আগামী বৎসরের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে প্রত্যেক দেশের অন্তত ৭০ শতাংশ মানুষ টিকা নিলে ২০২২ সালে করোনা মহামারির অবসান হইতে পারে।

কিন্তু সকল দেশেই কি এই সময়ের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত হারে টিকা প্রদান করা সম্ভব হইবে? করোনা চলিয়া গেলেও ইহার অভিঘাত অর্থনীতিতে আর কতদিন ধরিয়া বজায় থাকিবে তাহাও এখানে বিবেচ্য বিষয়। প্রকৃত বাস্তবতা হইল, আজ শিল্প-কলকারখানা চালানো কঠিন হইয়া পড়িয়াছে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য পর্যাপ্ত কাঁচামাল উৎপাদন করা যাইতেছে না। কনটেইনার সংকট, জ্বালানির অপ্রতুলতা ইত্যাদি কারণেও উদ্যোক্তারা হতোদ্যম। ফলে পৃথিবীব্যাপী কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে এক বিরাট শূন্যতার সৃষ্টি হইয়াছে। ইহাতে পৃথিবীব্যাপী একটি নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হইতে পারে বলিয়া আশঙ্কা করিতেছেন বিশেষজ্ঞরা।

শুধু উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলিই নহে, শক্তিধর ও উন্নত দেশগুলিও করোনা মহামারি মোকাবিলায় আজ হিমশিম খাইতেছে। সেই দেশগুলিরও অর্থনৈতিক অবস্থা টলটলায়মান। এখন নূতন করিয়া ওমিক্রন যে চোখ রাঙাইতেছে, ইহাতে তাহারাও উদ্বিগ্ন। এই পরিস্থিতিতে পৃথিবীবাসী আগামী দিনগুলিতে এক বিরাট চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হইবে নিঃসন্দেহে। তবে হতাশ হইলে চলিবে না। ধৈর্য ধারণ করিয়া সম্মিলিতভাবে এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করিতে হইবে।

এখানে একটি বিষয় উল্লেখ না করিলেই নহে। পৃথিবীব্যাপী যাহারা ছড়ি ঘুরান এবং নানাভাবে প্রভাব বলয় সৃষ্টি করেন, তাহাদের জন্যও করোনা মহামারি শিক্ষণীয়। কিন্তু তাহারা এই চরম মুহূর্তেও ইহা হইতে শিক্ষা গ্রহণ করিতেছেন বলিয়া প্রতীয়মান হয় না। যাহারা এই পরিস্থিতিতেও প্রভাব বিস্তার করিতে চাহিতেছেন, তাহাদের মনে রাখা উচিত অন্য সময়ে প্রভাব বলয় সম্প্রসারণ বিলাসিতা হইলেও এখন তাহার জন্য মূল্য দিতে হইতে পারে। করোনা মহামারি যেইভাবে অর্থনৈতিক বিনিয়োগ ও নূতন সম্পদ সৃষ্টির উপর চাপ সৃষ্টি করিয়াছে, তাহাতে এখন আর সেই প্রভাববলয় বিস্তারের বিলাসিতা মানায় না। কেননা ওমিক্রনের প্রভাব সীমিতসংখ্যক রাষ্ট্রের উপর আর সীমাবদ্ধ নহে। যাহারা পূর্ব অভ্যাসমতো এখনো অন্যের ঘরে আগুন লাগাইবার চেষ্টা করিতেছেন, একসময় ইহার প্রতিক্রিয়ায় তাহাদের ঘরেও যে আগুন লাগিবে না তাহা হলফ করিয়া বলা যায় না। উন্নয়নশীল বিশ্বসর্বহারা বিধায় তাহাদের হারাইবার কিছু নাই। তাহাদের ভয় দেখাইয়াও কোনো লাভ নাই। অতএব, আসুন, আমরা সবাই মিলে করোনার সংকট মোকাবিলা করি।