আজ গণমানুষের মুখপত্র দৈনিক ইত্তেফাক ৬৯ বছরে পদার্পণ করল। জন্মলগ্ন থেকেই দৈনিক ইত্তেফাক বাংলাদেশকে স্বাধীন দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠায় সোচ্চার ভূমিকা রেখেছে। ইত্তেফাকের যাত্রা আর স্বাধীন বাংলাদেশের অভিযাত্রা ছিল এক অভিন্ন। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরে নতুন বাস্তবতায় স্বাধীন দেশে একটি গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধিশালী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ইত্তেফাক তার ভূমিকা পালনে সব সময় সচেষ্ট থেকেছে। দেশের প্রতিটি ক্রান্তিকালে ইত্তেফাক দিকনির্দেশনামূলক সাংবাদিকতায় নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছে।
মুক্তিযুদ্ধের ৫০ বছর পেরিয়ে এসে এটা স্বীকার করতে হবে যে, দেশ স্বাধীনতা অর্জন করলেও এখনো স্বাধীনতার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। দেশের নানামুখী উন্নয়নের পরও আমরা দেখি, পাকিস্তানে দেশের সাধারণ মানুষ যে শোষণ-বঞ্চনার শিকার হয়েছে আজও তা থেকে মানুষের মুক্তি মেলেনি। এখনো সম্পদের মালিকানা গুটিকয়েক ব্যক্তির হাতে। সমাজে বৈষম্য বাড়ছে। সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি আজও অর্জন করা সম্ভব হয়নি। হয়নি বলেই মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য আজও অর্জিত হয়নি বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপনের সময় অনেকের কণ্ঠে খেদ ঝরতে শোনা যায়, এই বৈষম্যের বাংলাদেশ কি আমরা চেয়েছিলাম! আর সেখানেই সংবাদপত্রের দায়িত্ব রয়ে যায়। যতদিন পর্যন্ত দেশের মানুষ পূর্ণ স্বাধীনতার স্বাদ না পাবে ততদিন পর্যন্ত ইত্তেফাক প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া গণমুখী সাংবাদিকতার দায়ভার বহন করে যাবে।
মুক্তিযুদ্ধের পরে নতুন বাস্তবতায় দৈনিক ইত্তেফাক নতুন আঙ্গিকে প্রকাশিত হতে থাকে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের অবস্হান নিয়ে সাংবাদিকতা অগ্রসর হতে থাকে। সময়ের বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সাংবাদিকতায় বিবর্তন এসেছে। সময়ের দাবি মেটাতে ইত্তেফাকের বিন্যাসে অনেক পরিবর্তন এসেছে কিন্তু সত্য, ন্যায়, গণতন্ত্র এবং বাংলাদেশের মানুষের অধিকারের প্রশ্নে ইত্তেফাকের অবস্হান প্রতিষ্ঠার পর থেকে কখনো বদলায়নি। বদলাবেও না। প্রধানত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মানিক মিয়া ও দৈনিক ইত্তেফাক—এই তিনের মিলিত সংকল্প এক বিন্দুতে মিলিত হয়ে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনের পথ সৃষ্টি করেছিল। তারই পথ ধরে মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভু্যদয় ঘটে। সে কারণেই এটাও অনস্বীকার্য যে, দৈনিক ইত্তেফাক আর এই সংবাদপত্রের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া ছিলেন সমার্থক। বস্ত্তত তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার গণতন্ত্রের প্রতি অনমনীয় অবস্হান, ক্ষুরধার লেখনি দৈনিক ইত্তেফাকের মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়েছে। ইতিহাসবিদরা বলেন, শক্তিশালী বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে গণমুখী সাংবাদিকতার মিলিত শক্তিই দেশকে স্বাধীনতার পথে পরিচালিত করার প্রেরণা জুগিয়েছে।
ইতিহাসের বিশ্লেষণে দেখা যায়, শক্তিশালী বিরোধী দল থাকলে তা সংবাদপত্রসহ রাষ্ট্রের অন্যান্য ভিত্তিকেও শক্তি জোগায়। বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী এ সংবাদপত্রের শুভ মুহূর্তে বাংলাদেশের জনগণের প্রতি জানাই অশেষ কৃতজ্ঞতা, শুভেচ্ছা। আপনাদের সীমাহীন ভালোবাসাই দৈনিক ইত্তেফাককে দীর্ঘ পথচলায় প্রেরণা জুগিয়েছে। সাংবাদিকতার মূল লক্ষ্যই হচ্ছে সময়ের দাবি মেটানো। সেই দিক থেকে দৈনিক ইত্তেফাক তার প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই সময়ের দাবি মিটিয়ে এসেছে। যাদের ত্যাগ, পরামর্শ ও ভালোবাসায় দৈনিক ইত্তেফাক কয়েক প্রজন্ম পেরিয়ে এসেছে তাদের আজ আমরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি। দৈনিক ইত্তেফাক গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছে গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও নির্ভীক সাংবাদিক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে। এদের সীমাহীন প্রেরণা, ভালোবাসা ও ত্যাগের বিনিময়ে দৈনিক ইত্তেফাক আজকের অবস্হানে পৌঁছাতে পেরেছে। একই সঙ্গে স্মরণ করছে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনে নিহত শহিদদের। মহান মুক্তিযুদ্ধে শহিদ বীরদের। মুক্তিযুদ্ধ দৈনিক ইত্তেফাকের নিরন্তর প্রেরণার উত্স। বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলনে দৈনিক ইত্তেফাক এক অসামান্য ভূমিকা পালন করেছিল। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার থেকে আপসহীনভাবে সত্য প্রকাশ করে গেছে। একসময় তদানীন্তন পাকিস্তান সরকারের সামরিক শাসক দৈনিক ইত্তেফাকের প্রকাশনা বন্ধ করে দেয়। সে সময়ে তত্কালীন পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে আপস করলে মানিক মিয়া ইত্তেফাক প্রকাশনা অব্যাহত রাখতে পারতেন। কিন্তু তিনি এবং তার চেতনায় উদ্বুদ্ধ সাংবাদিক শ্রেণি তা করেননি। তিন বছর পত্রিকা প্রকাশ বন্ধ রেখেছিলেন। পত্রিকার সাংবাদিকরাও অবর্ণনীয় কষ্ট সহ্য করেছিলেন কিন্তু কেউই মাথা নোয়াননি। মানিক মিয়া সামরিক জান্তা ও স্বৈরাচারী শাসকের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে নির্ভীক সাংবাদিকতার যে উদাহরণ সৃষ্টি করে গেছেন তা পৃথিবীর ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত। বাঙালির অধিকার রক্ষায় পত্রিকার সম্পাদক-প্রকাশক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে বারবার কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়; এমনকি হুমকি ও লোভ-লালসা দেখিয়েও লক্ষ্যচু্যত করতে পারেনি পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ও তাদের এদেশীয় দোসররা। শুধু তা-ই নয়, মহান মুক্তিযুদ্ধে ২৫ মার্চ রাতে দৈনিক ইত্তেফাক ভবন পুড়িয়ে দেওয়া হয়। পাকিস্তানি সামরিক জান্তা অন্যান্য স্হাপনার সঙ্গে দৈনিক ইত্তেফাককেও নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছিল কিন্তু মানুষের ভালোবাসায় বারবার প্রবল প্রতাপে ফিরে এসেছে দৈনিক ইত্তেফাক। মানিক মিয়ার মানস দর্পণ ছিল যেন ইত্তেফাকের প্রতিটি পৃষ্ঠা। নীতির প্রশ্নে, বাংলার মানুষের অধিকারের বিষয়ে তিনি কখনো আপস করেননি। দৈনিক ইত্তেফাক ছিল তার সেই সংগ্রামী জীবনের প্রধান হাতিয়ার। গণমুখী সাংবাদিকতার পথিকৃত্ এ ব্যক্তিত¾ দেশের সাংবাদিকতাকে এক টানে বদলে দিয়েছিলেন। মানুষের প্রত্যাশা, বেদনাকে জোরালোভাবে তুলে ধরার এক আশ্চর্য ক্ষমতা ছিল তার। দৈনিক ইত্তেফাক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সাংবাদিকতাকে অবলম্বন করে জীবনব্যাপী তিনি এ দেশের মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ‘রাজনৈতিক ধোঁকাবাজি’, ‘রাজনৈতিক মঞ্চ’ আর ‘রঙ্গমঞ্চ’ শিরোনামে কলাম লিখে বাংলাদেশের মানুষকে স্বাধীনতাকামী করে তোলেন মানিক মিয়া। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক বৈষম্যের কথা সহজ ভাষায় তিনি মানুষের সামনে তুলে ধরেন। ‘মোসাফির’ নামে তার ‘রাজনৈতিক মঞ্চ’ কলামে নির্ভীক সত্য ভাষণ, অনন্য রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা এবং গণমানুষের প্রতি ভালোবাসার কারণেই বাংলার মানুষের হূদয়ে তিনি অবিনশ্বর হয়ে রয়েছেন। মানিক মিয়া প্রচলিত অর্থে শুধু একজন সাংবাদিক ছিলেন না। বরং সাংবাদিকতার মাধ্যমে মানুষের মুক্তির পথ রচনার ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তার আপসহীন মনোভাবের কারণে প্রতিক্রিয়াশীল পাকিস্তানি শাসকরা বারবার তার কণ্ঠকে স্তব্ধ করতে চেয়েছে। দৈনিক ইত্তেফাকের ওপর বারবার নেমে এসেছে চরম বিপর্যয়। বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলন তো বটেই, সেই ১৯৫৪ সাল থেকেই দৈনিক ইত্তেফাক বাংলাদেশের মানুষের পক্ষে স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে এবং গণতন্ত্রের পক্ষে জনগণকে সচেতন করতে সচেষ্ট থেকেছে। এরপর ৬ দফা আন্দোলন, উনসত্তরের গণ-অভু্যত্থান এবং বাঙালির স্বাধীনতা আন্দোলন সবকিছুতেই দৈনিক ইত্তেফাক সাংবাদিকতাকে অবলম্বন করে রাজনীতির পথনির্দেশ করেছে। বাংলার মানুষ দৈনিক ইত্তেফাক পড়ে দেশের রাজনীতির গতি-প্রকৃতি সম্পর্কে অবগত হতেন। ১৯৪৯ সালে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগের বিরোধী সংগঠন হিসেবে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হয়। সে বছরই নবগঠিত সংগঠনের মুখপত্ররূপে ‘সাপ্তাহিক ইত্তেফাক’ পত্রিকা প্রকাশিত হয়। মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ছিলেন পত্রিকার আনুষ্ঠানিক সম্পাদক। কলকাতা প্রত্যাগত তফাজ্জল হোসেন সাপ্তাহিক ইত্তেফাক পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত হন এবং ১৯৫১ সালের ১৪ আগস্ট থেকে এই পত্রিকার পূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করেন। মুসলিম লীগের ক্ষমতায় থাকাকালে দেশের বিরাজমান পরিস্হিতির পরিপ্রেক্ষিতে এবং স্বাধীনতা-উত্তর প্রথম সাধারণ নির্বাচনের আগে তফাজ্জল হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর উত্সাহ, অনুপ্রেরণা ও সহযোগিতায় ও মওলানা ভাসানীর পৃষ্ঠপোষকতায় ১৯৫৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর ইত্তেফাককে দৈনিক পত্রিকা হিসেবে প্রকাশ করেন। তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া এই পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে তত্কালীন ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ সরকারের যে ভরাডুবি হয় এর পেছনে ছিল দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার শক্তিশালী রিপোর্ট ও মানিক মিয়ার ক্ষুরধার লেখনি। ১৯৬৬ সালের ৬ নভেম্বর আওয়ামী লীগ ৬ দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দাবি করে। দৈনিক মর্নিং নিউজ, দৈনিক পাকিস্তান ও দৈনিক আজাদ ৬ দফার বিরোধিতা করে। দৈনিক ইত্তেফাক ৬ দফার পক্ষে অবস্হান শুধু নয়, অন্যতম প্রচারকের ভূমিকা পালন করে। ১৬ জুন ১৯৬৬ ইত্তেফাক সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন গ্রেফতার হন ও পরদিন পত্রিকাটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এমনকি নিউ নেশন প্রেসও বন্ধ করে দেয়। প্রায় ১০ মাস পর ১৯৬৭ সালের ২৯ মার্চ মানিক মিয়া মুক্তি পান। এ সময় দৈনিক ইত্তেফাক প্রকাশ করার জন্য সম্পাদকের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হয়। কিন্তু মানিক মিয়া সাফ জানিয়ে দেন—‘ইত্তেফাক যদি তার ঐতিহ্য অনুসরণ করে প্রকাশিত হতে না পারে তবে তিনি সে ইত্তেফাক প্রকাশে আগ্রহী নন।’ অবশেষে প্রেস মুক্ত হয়। ১০ ফেব্র‚য়ারি ইত্তেফাক পুনর্জন্ম লাভ করে।
১৯৬৯ সালে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া আকস্মিকভাবে ইন্েতকাল করেন। তার মৃতু্যর পর ইত্তেফাক প্রকাশনা অব্যাহত থাকে এবং বাঙালির অধিকার আদায়ের সংগ্রামে ও স্বাধীনতার আন্দোলনে সরাসরি সমর্থন দেয়, গড়ে ওঠে জনমত। বিশেষ করে ১৯৭০ সালের নির্বাচন, আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয়, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে পাকিস্তানিদের অনীহা ও ষড়যন্ত্র এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ ও সর্বাত্মক অসহযোগের আহ্বান থেকে ২৫শে মার্চ রাতে আক্রান্ত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত দৈনিক ইত্তেফাক অনন্য সাধারণ ও গৌরবময় ভূমিকা পালন করে। অথচ ১৯৭১ সালের পয়লা মার্চের সামরিক আইনের বিধান অগ্রাহ্য করেই ইত্তেফাক পত্রিকা সে সময়কার অসহযোগ আন্দোলনের খবর নিয়মিতভাবে ও গুরুত্ব সহকারে প্রকাশ করে। সরকার আপত্তিকর সংবাদ পরিবেশনের দায়ে ১০ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখে, কিন্তু দৈনিক ইত্তেফাক তার কোনো তোয়াক্কা করেনি, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি নিরবচ্ছিন্নভাবে সমর্থন জুগিয়ে যায়।