দৃষ্টি রাখিতে হইবে সম্মুখে

বাংলাদেশের সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার বিকাশে অনন্য ভূমিকা পালনকারী ঐতিহ্যবাহী দৈনিক ইত্তেফাক আজ হইতে ৬৮ বৎসর পূর্বে এক অভাবিত যাত্রা শুরু করিয়াছিল তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার হাত ধরিয়া। আজ ৬৯ বৎসরে পা রাখিল ইত্তেফাক। ১৯৪৯ সালে সাপ্তাহিক ইত্তেফাকের যাত্রা শুরু হইলেও ১৯৫৩ সালের এই দিনে নব-উদ্দীপনায় তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার সম্পাদনায় দুঃশাসন এবং অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে গণজাগরণের প্রত্যয় লইয়া প্রকাশিত হয় দৈনিক ইত্তেফাক।

সাতচল্লিশে দেশভাগের মাধ্যমে নূতন দেশ গঠিত হইলেও মাত্র কয়েক বৎসরেই পূর্ববঙ্গের আশাভঙ্গের মর্মন্তুদ বেদনাকাল শুরু হয়। মাতৃভাষায় কথা বলিবার অধিকার ছিনাইয়া লইবার ষড়যন্ত্রের পাশাপাশি প্রত্যাশিত গণতন্ত্র ও মৌলিক অধিকার পশ্চিম পাকিস্তানের শোষকদের নিকট এক প্রকার  জিম্মি হইয়া যায়। তৎকালীন পূর্ব বাংলা তথা বাংলাদেশের আশাহত ভাগ্যবিড়ম্বিত মানুষের হতাশা, বেদনা ও বিক্ষোভকে প্রতিধ্বনিত করিয়া দৈনিক ইত্তেফাক লাভ করে মানুষের অকুণ্ঠ ভালোবাসা। বাস্তবিক অর্থেই উৎপীড়িত জনতার ইস্পাতদৃঢ় সংহতির শাব্দিক পতাকা উড়াইয়া দুর্গম গিরি পাড়ি দিয়া পত্রিকাটি আজও সগৌরবে টিকিয়া রহিয়াছে। জাতীয় মুক্তি, গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও মৌলিক মানবিক অধিকারের সংগ্রামে  দৈনিক ইত্তেফাক আজও আপসহীন ও অকুতোভয়।

যেই মুহূর্তে আমরা ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করিতেছি, সেই মুহূর্তে সমগ্র বিশ্বই এক নিদারুণ সংকটকাল অতিবাহিত করিতেছে। মহামারি করোনা ভাইরাসের তাণ্ডবলীলায় গত দেড় বৎসরেরও অধিক সময় ধরিয়া বিশ্ব জুড়িয়া অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজব্যবস্থা সকল কিছুতেই টালমাটাল অবস্থা বিরাজ করিয়াছে। করোনার এই ধাক্কা সামলাইয়া বৈশ্বিক অর্থনীতি যখন ঘুরিয়া দাঁড়াইতে আরম্ভ করিয়াছিল সেই সময়ই নূতন করিয়া করোনার ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্টের চোখরাঙানিতে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে পুনরায় স্থবিরতা নামিয়া আসার আশঙ্কা দেখা দিয়াছে। এই মহাবিপর্যয়ে আগামী দিনে হয়তো অনেক কিছুই বিলীন হইয়া যাইবে, আবার ঘুরিয়াও দাঁড়াইবে—ইহাই প্রকৃতির নিয়ম। বিশ্ব ইতিপূর্বে নানা সংকটকাল অতিবাহিত করিয়াছে, আমাদের এই প্রিয় ভূখণ্ডটিও নানা দুর্যোগ, সংকটকাল পার করিয়া আজ মাথা তুলিয়া দাঁড়াইয়াছে। জাতির প্রতিটি সংকটকালে, দুর্যোগ-দুর্বিপাকে ইত্তেফাক শুনাইয়াছে অভয়ের বাণী। মোসাফিরের ক্ষুরধার লেখনী, শানিত শিরোনাম ও তীব্র-তীক্ষ-তির্যক সম্পাদকীয় মন্তব্য আলোড়িত করিয়াছে এই দেশের মানুষকে।

সাধারণ মানুষের মুখের ভাষাকে খবরের ভাষায় রূপান্তরিত করিয়া ইত্তেফাক যে শব্দশৈলীর জন্ম দিয়াছে, তাহা আজও বিদ্যমান। কিন্তু ইত্তেফাকের এই পথযাত্রা কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না, বিস্তর বাধা আসিয়াছে। শাসকের রোষানলে পড়িয়া একাধিকবার পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ হইয়াছে, ভস্মীভূত হইয়াছে মেশিন ও আসবাবপত্রসহ ইত্তেফাকের কার্যালয়, কারাবরণ করিতে হইয়াছে পত্রিকাটির প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে। কিন্তু ইত্তেফাক কখনোই তাহার অভীষ্ট লক্ষ্য হইতে বিচ্যুত হয় নাই, পিছপা হয় নাই স্বাধীনতা পরবর্তীকালের নূতন প্রেক্ষাপটে নূতনত্বর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায়। শত বাধাবিপত্তি সত্ত্বেও, দুর্যোগ-দুর্বিপাকে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে পৌঁছাইয়া গেলেও ইত্তেফাক পৌরাণিক ফিনিক্স পাখির ন্যায় সগৌরবে মাথা তুলিয়া দাঁড়াইয়াছে প্রতিবার। ইত্তেফাক আপস করে নাই বলিয়াই বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির সকল মহৎ ও বৃহৎ অর্জনের সহিত ইত্তেফাক অবিচ্ছেদ্য। আর যুগের চাহিদা ও বর্তমান বাস্তবতার আলোকে আধুনিকতা এবং পরিবর্তন-পরিবর্ধন ও পরিশীলনের মাধ্যমে ইত্তেফাক তাহার ভবিষ্যতের পথ রচনা করিয়া চলিয়াছে। 

পরাধীন দেশে যে লক্ষ্যকে উপজীব্য করিয়া, যেই চ্যালেঞ্জকে সম্মুখে রাখিয়া দৈনিক ইত্তেফাকের যাত্রা শুরু হইয়াছিল, তাহা অর্জিত হইয়াছে। আমরা বরাবরই বলিয়া আসিয়াছি, পরাধীন আমলের রাজনীতি আর স্বাধীনতা উত্তরকালের রাজনীতি কখনোই এক হইতে পারে না। এখন স্বাধীনতার স্বপ্নকে সফল করিবার সময়, জনগণের জীবনমানের উন্নয়ন ও সকল নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সময়। চলার পথে সংকট আসিবেই, আর সেই সংকটকে মোকাবিলা করিতে হইবে মেধা, মনন আর প্রত্যয়ের সাহায্যে। অতীত হইতে শিক্ষা লইয়া আমাদের দৃষ্টি রাখিতে হইবে সম্মুখে।