সংকট মুহূর্তে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেছে ইত্তেফাক

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও নির্বাহী পরিচালক, ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফিন্যান্স এবং ডেভেলপমেন্ট ড. মোস্তফা কে মুজেরী দৈনিক ইত্তেফাকের ৬৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। সাক্ষাৎকারটি বিশেষ সংখ্যায় প্রকাশ করা হলো। 

দৈনিক ইত্তেফাক: ইত্তেফাকের ৬৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে সার্বিক অর্থনীতি নিয়ে আপনার সঙ্গে আলোচনা করতে চাই।

ড. মোস্তফা কে মুজেরী: দেশের অন্যতম প্রাচীন এবং প্রভাবশালী জাতীয় দৈনিক পত্রিকা ইত্তেফাক-এর ৬৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। দৈনিক ইত্তেফাক দেশের প্রতিটি সংকট মুহূর্তে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেছে। বিশেষ করে এই পত্রিকার দায়িত্বশীল সংবাদ পরিবেশনা প্রশংসাযোগ্য। একটি পত্রিকার যখন অনুরাগ-বিরাগের ঊর্ধ্বে উঠে সঠিক তথ্য পরিবেশন করে তখনই সেই পত্রিকাটি জনপ্রিয়তা অর্জন করে। দৈনিক ইত্তেফাক তেমন ভূমিকা পালন করে চলেছে। দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় অতীতের মতো ভবিষ্যতেও দেশের অর্থনীতি সংক্রান্ত সংবাদ আরো বেশি বেশি করে প্রকাশ করবে, এটাই চাই। আমি এই পত্রিকার উত্তরোত্তর আরো সাফল্য কামনা করছি।

ইত্তেফাক: আমরা তো স্বাধীনতা এবং বিজয়ের ৫০ বছর অতিক্রম করছি। বিগত ৫০ বছরে আমাদের দেশ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যথেষ্ট এগিয়ে গেছে। প্রবৃদ্ধি অর্জনের ধারায় আমরা উল্লেখযোগ্য সাফল্য লাভ করেছি। বিগত ৫০ বছরে যে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে, তা কতটা টেকসই এবং প্রবৃদ্ধির দুর্বলতাগুলো কী কী?

ড. মোস্তফা কে মুজেরী: আমরা সবাই জানি, বাংলাদেশ ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এর পর দীর্ঘ ৯ মাসেরও বেশি সময় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর বাংলাদেশ একই বছর ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে। বাংলাদেশ যখন বিজয় অর্জন করে তখন বাংলাদেশের অর্থনীতি ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত এবং বিপর্যস্ত একটি অর্থনীতি। অর্থনীতির প্রতিটি চালিকাশক্তি যুদ্ধের কারণে ছিল বিপর্যস্ত। সেই সময় দেশের অর্থনীতির পুনর্গঠনই ছিল সবচেয়ে জরুরি। বিশেষ করে আমাদের অবকাঠামো ছিল প্রায় সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত। উত্পাদন উপকরণগুলোও ছিল বিপর্যস্ত। বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও যাতে অর্থনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়াতে না পারে সেই জন্য পাকিস্তানিরা ইচ্ছে করেই বাংলাদেশের উত্পাদনযন্ত্র এবং অবকাঠামো ধ্বংস করে দেয়। সেই অবস্হায় বাংলাদেশ যে ভবিষ্যতে আর কখনোই অর্থনৈতিকভাবে উঠে দাঁড়াতে পারবে না, এটা অনেকেই ধারণা করেছিলেন। স্হানীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশ সম্পর্কে যেসব মতামত সেই সময় পাওয়া যায় তার কোনোটিই তেমন একটা সুখকর ছিল না। বাংলাদেশকে ভিক্ষার ঝুলি, টেস্ট কেস, এমনকি তলাবিহীন ঝুড়ি বলেও আখ্যায়িত করা হয়েছিল। অর্থাত্ মনে করা হয়েছিল, বাংলাদেশ ভবিষ্যতে অর্থনৈতিকভাবে টিকে থাকতে পারবে না। অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশের টিকে থাকা অসম্ভব। বাংলাদেশ যদি অর্থনৈতিকভাবে টিকে থাকে তাহলে যে কোনো দেশের পক্ষেই টিকে থাকা সম্ভব। আজ স্বাধীনতা বা বিজয়ের ৫০ বছর পর আমরা যদি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অর্জনগুলোর দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাই সেই সময় বাংলাদেশ সম্পর্কে যেসব নেতিবাচক মন্তব্য করা হয়েছিল, তা পুরোপুরি মিথ্যে বলে প্রতীয়মাণ হয়েছে। বাংলাদেশ আজ বিশ্বব্যাপী মর্যাদার আসনে আসীন। অর্থনৈতিক-সামাজিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের যে অর্জন, তা এক কথায় বিস্ময়কর। প্রতিটি ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ অভূতপূর্ব অগ্রগতি অর্জন করতে সমর্থ হয়েছে। একটি দেশের ইতিহাসে ৫০ বছর খুব একটা বেশি সময় নয়। কিন্তু এই ৫০ বছরে অর্থনৈতিক এবং সামাজিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের যে অর্জন, তা অনেকটাই বিস্ময়কর। আধুনিক বিশ্বে বাংলাদেশকে উন্নয়নের একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে। স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য বাংলাদেশ উন্নয়নের ‘রোল মডেল’ হিসেবে আখ্যায়িত হচ্ছে। পৃথিবীতে যে ৫-৬টি দেশ সবচেয়ে দ্রুতগতিতে উন্নয়ন সাধন করছে বাংলাদেশ তাদের মধ্যে অন্যতম। বাংলাদেশ এখন অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। আমরা ২০১৫ সালে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে স্বীকৃত হয়েছি। ইতিমধ্যেই বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় উত্তীর্ণ হবার জন্য চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছে। ২০২৬ সালে বাংলাদেশ চূড়ান্তভাবে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় উঠে আসবে। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর এটাই অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন। আমাদের টার্গেট হচ্ছে ২০৩১ সালের মধ্যে আমরা উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবো। এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উচ্চ আয়ের দেশে পরিণত হবো।

ইত্তেফাক: বাংলাদেশ বিগত ৫০ বছরে উচ্চ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। এই প্রবৃদ্ধি কতটা টেকসই বলে মনে করেন?

ড. মোস্তফা কে মুজেরী: আমরা যদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনা করি তাহলে দেখতে হবে আমরা যে প্রবৃদ্ধি অর্জন করছি তা কতটা টেকসই। কারণ অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধন করলেই হবে না, সেই উন্নয়ন কতটা টেকসই সেটাও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় বটে। আমাদের দীর্ঘমেয়াদি এবং টেকসই উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। তাহলেই আমরা উন্নত দেশে পরিণত হতে পারব। উন্নয়ন যদি টেকসই না হয়, তাহলে যে কোনো সময় বিপর্যয় ঘটতে পারে। কাজেই শুধু উন্নয়ন অর্জন করলেই হবে না। সেই উন্নয়ন যাতে টেকসই হয় সেদিকেও দৃষ্টি দিতে হবে। গত ৫০ বছরে আমাদের প্রবৃদ্ধির যে ইতিহাস তা যদি আমরা বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখব, স্বাধীনতার পর বিশেষ করে ’৭০-এর দশকে আমাদের প্রবৃদ্ধির হার খুব একটা বেশি ছিল না। সেই সময় যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশের পক্ষে উচ্চপ্রবৃদ্ধি অর্জন করা কঠিনই ছিল। সেই সময় আমাদের অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো প্রকট ছিল। খাদ্যসমস্যা ছিল প্রকট। আরো নানা ধরনের সমস্যায় জর্জরিত ছিল দেশ। সদ্যস্বাধীন একটি দেশের সরকারের পক্ষে সেই সব সমস্যা সমাধান করা বেশ কঠিন ছিল। তার পরও আমরা যদি ১৯৭১-১৯৭২ থেকে ১৯৭৪-১৯৭৫ অর্থবছর পর্যন্ত উন্নয়নের গতিধারাকে বিবেচনায় নিই তাহলে দেখব, সেই সময় প্রবৃদ্ধির হার কিছুটা কম ছিল, কিন্তু তা সত্ত্বেও সেই প্রবৃদ্ধির হার স্বাধীনতাপূর্ব সময়ের চেয়ে বেশি ছিল। এটা একটি লক্ষণীয় বিষয় বটে। স্বাধীনতাপরবর্তী এক দশকের প্রবৃদ্ধি আমাদের জন্য একটি ইতিবাচক দিকও বটে। পরবর্তী দশক অর্থাৎ ’৮০ দশকে আমাদের প্রবৃদ্ধির বেশি ছিল। তবে তা সত্তরের দশকের তুলনায় খুব একটা বেশি ছিল না। ’৮০ দশকে বাংলাদেশ গড়ে চার শতাংশের কাছাকাছি প্রবৃদ্ধি অর্জন করে। এই সময় প্রবৃদ্ধির হার তেমন একটা বাড়ানো যায়নি। অনেকেই এই জন্য ’৮০ দশককে ‘লস্ট ডিকেট’ বলে থাকেন। কিন্তু আমি মনে করি, সেই সময় অর্থাত্ ’৮০ দশকে আমাদের অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন সাধিত হয়। এই সময় এমন কিছু খাতের বিকাশ ঘটে, যা পরবর্তী সময় আমাদের প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হিসেবে আবিভূ‌র্ত হয়েছিল। এই সময় তৈরি পোশাকশিল্পের বিকাশ শুরু হয়। আমি তৈরি পোশাকশিল্পের বিকাশের কথা বলার আগে আর একটি সেক্টরের বিষয়ে উল্লেখ করতে চাই। সেটি হচ্ছে এনজিও কার্যক্রম। এনজিওরা এই সময় তৃণমূল পর্যায়ে অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য কার্যক্রম জোরদার করে। বিশেষ করে নারীর আর্থিক ক্ষমতায়নে এনজিওরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তারা গ্রামীণ অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে নারীদের সম্পৃক্ত করে। যে নারীরা এক সময় চার দেওয়ালের মধ্যে আবদ্ধ ছিল তারা নানা কাজ নিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে। অবশ্য একই সময়ে সরকারের পক্ষ থেকেও গ্রামীণ অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বিশেষ করে নারীর আর্থিক ক্ষমতায়নে বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়। গ্রামীণ নারীদের মধ্যে আর্থিক কার্যক্রম এবং সামাজিক নানা বিষয়ে সচেতনতা গড়ে ওঠে। স্বাস্হ্য, শিক্ষা, নারীর অধিকার ইত্যাদি বিষয়ে তারা সচেতন হয়ে ওঠে। ফলে গ্রামীণ সমাজে এক ধরনের ইতিবাচক রূপান্তর প্রক্রিয়া শুরু হয়। সরকার এবং এনজিওদের মিলিত প্রচেষ্টায় তৃণমূল পর্যায়ে আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা হয়। উল্লেখ্য, ক্ষুদ্রঋণ মূলত নারীদেরই দেওয়া হতো। ৯০-৯৫ শতাংশ ক্ষুদ্রঋণ গ্রহীতাই ছিলেন নারী। নারীর ক্ষমতায়নের যে ধারা আমরা বর্তমানে প্রত্যক্ষ করি তা কিন্তু ’৭০ এবং ’৮০ দশকেই শুরু হয়েছিল। নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়টি আমাদের জাতীয় উন্নয়নের ক্ষেত্রে পরবর্তী সময়ে বিরাট ভূমিকা রেখেছিল। তৈরি পোশাকশিল্প খাতের বিকাশ এই সময়ে শুরু হয়। জনশক্তি রফতানির ক্ষেত্রে এই সময় ইতিবাচক প্রবণতা শুরু হয়। অনেকেই নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য বিদেশে গমন করে। সেই সময় সরকারিভাবেও বেশ কিছু অর্থনৈতিক সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়, যা পরবর্তী সময়ে আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করে। অর্থাত্ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনের যে পরিবেশ তা সেই সময়ই সূচিত হয়। ’৯০ দশক থেকেই আমাদের উচ্চ প্রবৃদ্ধির ধারা শুরু হয়। উচ্চ প্রবৃদ্ধির সেই ধারা এখনো বহাল রয়েছে। এই সময় আমাদের দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার প্রতি দশকে এক শতাংশের মতো করে বেড়েছে। ’৮০ দশকে আমাদের প্রবৃদ্ধির হার ছিল সাড়ে তিন থেকে চার শতাংশ। করোনাপূর্ব সময়ে সেই প্রবৃদ্ধির হার আট শতাংশের ওপরে চলে গেছে। আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির এই যে ধারাবাহিক অগ্রগতি তা অনেকটাই বিরল। বিশ্বে খুব কম দেশই আছে যারা আমাদের মতো এমন ধারাবাহিকভাবে উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পেরেছে। প্রতিবেশে দেশ ভারতে ২০১৬-২০১৭ পর্যন্ত আমাদের চেয়ে দ্রুতগতিতে প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছিল। ২০১৬ সালের পর ভারতের প্রবৃদ্ধি অনেকটাই কমে গেছে। অর্থাত্ ভারত তাদের প্রবৃদ্ধির উচ্চধারা অব্যাহত রাখতে পারেনি। অনেকের নিকট আশ্চর্যজনক মনে হতে পারে, কিন্তু এটা কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না যে, আমরা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারা টেকসই ভাবে ধরে রাখতে পেরেছি। কাজেই আমি বলবো, আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারাটা অনেকটাই টেকসই। বাংলাদেশ সাম্প্রতিক সময়ে শুধু যে উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছি তা নয়। আমাদের সামাজিক সূচকগুলোর প্রবৃদ্ধিও কিন্তু চোখে পড়ার মতো। সামাজিক সূচকে বাংলাদেশ অনেক ক্ষেত্রেই ভারত এবং পাকিস্তানকে অতিক্রম করে গেছে। সামাজিক সূচকে এই দৃঢ় অবস্হান আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে টেকসই করেছে। বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বেশ সাফল্য অর্জন করেছে। স্বাধীনতার পর আমাদের বিনিয়োগের হার ছিল জিডিপির ১০/১২ শতাংশ। এখন তা প্রায় ৩৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। অবশ্য এটাও ঠিক যে আমাদের দেশ যেভাবে এগিয়ে চলেছে তাতে বিনিয়োগের হার আরো বাড়ানো দরকার। আমাদের সঞ্চয় বেড়েছে। অর্থাত্ অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি চালিকা শক্তিতে আমরা সফলতা অর্জন করেছি। অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে আমরা সামাজিক বিভিন্ন সূচকেও পর্যাপ্ত উন্নয়ন সাধন করতে পেরেছি। আমার অর্থনৈতিক এবং সামাজিক সূচকে যেভাবে উন্নতি সাধন করেছি দক্ষিণ এশিয়ার তার কোনো উদাহরণ নেই। শুধু দক্ষিণ এশিয়ার কথাই বা বলি কেনা পৃথিবীর ইতিহাসে এত দ্রুত অর্থনৈতিক এবং সামাজিক ক্ষেত্রে উন্নয়নের নজির নেই বললেই চলে। বিগত ৫০ বছরে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক এবং সামাজিক ক্ষেত্রে যে সফলতা অর্জন করেছে, তা একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বলেই আমার নিকট মনে হয়। তবে আগামীতে আমাদের অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য বেশকিছু কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। যেমন আমরা যদি ২০৩১ সালের মধ্যে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে চাই তাহলে আমাদের প্রবৃদ্ধি আরো দ্রুততর করতে হবে। আমরা ২০১৫ সালে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছি। এর ১৬ বছর পর আমরা উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবার জন্য লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছি। আপনি যদি পৃথিবীর অর্থনৈতিক উন্নয়নের ইতিহাস পর্যালোচনা করেন তাহলে দেখবেন, কোনো দেশই এত অল্প সময়ে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে পারেনি। একমাত্র চীন এক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করেছে। তারা ১৭ বছরে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ থেকে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। পৃথিবীর আর কোনো দেশ এত অল্প সময়ের মধ্যে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ থেকে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হতে পারেনি। কাজেই বাংলাদেশ যদি ২০৩১ সালের মধ্যে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে পারে, তাহলে সেটা হবে একটি অনন্য রেকর্ড। কারণ বাংলাদেশ চীনের চেয়ে এক বছর কম সময়ে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবার স্বপ্ন দেখছে। চীন যে ১৭ বছরে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ থেকে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছিল সেই সময় চীনের জনগণের মাথাপিছু জাতীয় আয় বেড়েছিল সাড়ে সাত শতাংশ হারে। কাজই আমরা যদি নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, ২০৩১ সালের মধ্যে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে চাই তাহলে চীনের চেয়েও দ্রুত গতিতে এগোতে হবে। আগামী এক দশকে আমাদের গড়ে ৯ থেকে ১০ শতাংশ হারে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে এখন কিন্তু ২০২১ সাল চলছে। কাজেই সময় খুব বেশি নেই। আমাদের উন্নয়নের গতি আরো ত্বরান্বিত করতে হবে। অর্থনীতির যেসব সূচকের ওপর নির্ভর করে আমরা এতদিন প্রবৃদ্ধি অর্জন করে এসেছি, যেমন তৈরি পোশাক, জনশক্তি রফতানি ইত্যাদি। শুধু এগুলো দিয়ে ডাবল ডিজিট প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব নয়। এ জন্য আমাদের অর্থনীতির সম্ভাবনাময় নতুন নতুন ক্ষেত্র খুঁজে বের করতে হবে, যার মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা যেতে পারে। আমাদের আরো নতুন এবং শক্তিশালী চালিকাশক্তি খুঁজে বের করতে হবে।

ইত্তেফাক: বাংলাদেশ বর্তমানে যে প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে তা কি উৎপাদনশীল খাত থেকে আসছে নাকি অনুত্পাদনশীল খাত থেকে আসছে?

ড. মোস্তফা কে মুজেরী: আমরা প্রবৃদ্ধি হিসাব করি উত্পাদন দিয়ে। সাধারণভাবে মনে করা হয় উত্পাদন বাড়লে প্রবৃদ্ধি বাড়বে। যে খাতের কোনো উত্পাাদন নেই, সেই খাত তো প্রবৃদ্ধিতে কোনো অবদান রাখতে পারবে না। কাজেই প্রবৃদ্ধিতে আসতে হলে উত্পাদন হতে হবে। এই উত্পাদন সেবা খাত থেকে আসতে পারে আবার পণ্য খাত থেকেও আসতে পারে। উত্পাদন না বাড়লে প্রবৃদ্ধি বাড়বে না। কাজেই আমাদের উত্পাদন বাড়ানোর প্রতি মনোযোগ দিতে হবে।

ইত্তেফাক: সম্প্রতি জিডিপি প্রবৃদ্ধি হিসাব করার ভিত্তি বছর পরিবর্তন করা হয়েছে। এর কি প্রতিক্রিয়া হতে পারে অর্থনীতিতে?

ড. মোস্তফা কে মুজেরী: আমরা যখন জিডিপি পরিমাপ করি তখন একটি ভিত্তি বছরের প্রয়োজন হয়। কিছুটা সময় পর পর জিডিপি প্রবৃদ্ধি হিসাব করার ভিত্তি বছর পরিবর্তন করা হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অর্থনীতিও পরিবর্তিত হয়। অর্থনীতির উত্পাদন প্রক্রিয়ায় নতুন নতুন পণ্য যুক্ত হয়। কাজেই ভিত্তি বছরকে সময়োপযোগী করার প্রয়োজন হয়। ভিত্তি বছর পরিবর্তন একটি প্রক্রিয়া। এবং এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অর্থনীতির সঠিক চিত্র পাওয়া যায়।

ইত্তেফাক: বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, অনানুষ্ঠানিক খাতে যে উত্পাদন হয় তার পরিমাণ মোট জিডিপির ৮৭ শতাংশের মতো। এই বিপুল উৎপাদন যজ্ঞকে কীভাবে জিডিপিতে অন্তভু‌র্ক্ত করা যেতে পারে বলে মনে করেন?

ড. মোস্তফা কে মুজেরী: বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে অনানুষ্ঠানিক খাতের আকার অনেক বড়। আমাদের দেশের শ্রমশক্তির দিকে যদি তাকাই তাহলে কি দেখি? আমাদের দেশের শ্রমশক্তির ৮০ শতাংশের বেশি অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত। অনানুষ্ঠানিক খাতের একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এগুলো তো সরকারিভাবে নিবন্ধিত নয়। ফলে এগুলোর হিসাব জিডিপিতে অন্তভু‌র্ক্ত করা বেশ কঠিন। এ সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া খুবই কঠিন। কিন্তু এই বিশাল কর্মযজ্ঞতো জিডিপিতে অন্তভু‌র্ক্ত হতে পারত। কিন্তু পরিমাপগত সমস্যার কারণে অনানুষ্ঠানিক খাতের উত্পাদন জিডিপিতে যুক্ত করা যাচ্ছে না। অবশ্য ইতিমধ্যেই কযেকটি খাতকে জিডিপিতে অন্তভু‌র্ক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অনানুষ্ঠানিক খাতের উত্পাদনকে যদি জিডিপিতে অন্তভু‌র্ক্ত করা যেত, তাহলে আমাদের জিডিপির আকার অনেক বৃদ্ধি পেত। অনানুষ্ঠানিক খাতকে জিডিপিতে অন্তভু‌র্ক্তকরণ একটি চলমান প্রক্রিয়া।