২০২০ সালের মতো ২০২১ সালেও ছিল ওটিটি প্ল্যাটফর্মের রমরমা। এ বছরও ওটিটিতে মুক্তি পেয়েছে একাধিক ওয়েব সিরিজ়। সেই তালিকায় রয়েছে এমন কিছু সিরিজ, যা নিয়ে অনেক বিতর্কেরও সৃষ্টি হয়।
‘তাণ্ডব’
২০২১ এর শুরুতে অর্থাৎ জানুয়ারি মাসে ওটিটি প্ল্যাটফর্ম অ্যামাজন প্রাইমে মুক্তি পায় সাইফ আলি খান ও ডিম্পল কাপাডিয়া অভিনীত ওয়েব সিরিজ তাণ্ডব। এই ওয়েব সিরিজ পরিচালনা করেন ‘গুন্ডে’, ‘টাইগার জিন্দা হ্যায়’, ‘ভারত’-এর মতো সিনেমার পরিচালক আলি আব্বাস জাফর। তবে পরিচালক নিজেও কল্পনা করেননি যে তার এই ও্যেব সিরিজ দেশব্যাপী তান্ডব শুরু করবে। সিরিজটি প্রকাশিত হওয়ার পর অভিযোগ ওঠে এতে নানা ভাবে হিন্দু দেবদেবীদের অপমান করা হয়েছে। তা ছাড়া এটাও বলা হয়েছে যে এটি জাতিভেদ প্রথাকে উস্কে দিয়েছে এবং দেশের শান্তি বিঘ্নিত করেছে। এমন কি এ নিয়ে একটি এফআইআর দায়ের করা হয়েছে লখনউতে।
গৌরব সোলাঙ্কির সঙ্গে যৌথভাবে নয়টি এপিসোডের চিত্রনাট্য লিখেছিলেন আলি। তাতে ভারতের কৃষকদের জমি দখল, রাজনীতির পরিবারতন্ত্র, পুলিশের দুর্নীতি, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়া, মুসলিম যুবকদের কাহিনি তুলে ধরার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু গল্প সাজাতে গিয়েই বিপত্তি। কোন কাহিনিকে প্রাধান্য দেবেন তা হয়তো ভেবে উঠতে পারেননি পরিচালক-প্রযোজক। মণিরত্নম পরিচালিত ‘যুবা’ সিনেমা দেখে বেশ অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু এতদিন বাদে তার ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের দৃশ্যগুলিতে ব্যবহার না করলেই ভাল হত।
‘ফ্যামিলি ম্যান-২’
প্রতীক্ষা ছিল। প্রত্যাশা ছিল। সঙ্গে ছিল বিতর্ক আর আশঙ্কা। মনোজ বাজপায়ীর ‘ফ্যামিলি ম্যান’ ওয়েব সিরিজের দ্বিতীয় সিজন ঘিরে কৌতূহলের পারদ ক্রমশ শীর্ষ ছুঁয়েছিল। সাধারণত দেখা যায়, প্রথম সিরিজে মাত করে দেওয়া ওয়েব সিরিজ দ্বিতীয় সিজনে তেমন দাগ কাটতে পারে না। অতৃপ্তি জেগে থাকে দর্শকমনে। ‘ফ্যামিলি ম্যান-২’ কি সেই পরিণতির দিকে এগোবে? এমন আশঙ্কা করছিলেন অনেকে। এর মধ্যেই আবার বর্তমান সিরিজের বিষয় নিয়ে ঘনিয়ে উঠেছিল বিতর্ক। তাতে মুক্তি নিয়েও কিছু মেঘ জমেছিল। সব মিলিয়ে ‘ফ্যামিলি ম্যান ২’ বেশ কিছুদিন ধরেই ছিল চর্চার বিষয়। নির্ধারিত সময়ের খানিকটা আগে ২০২১ এর ৩ জুন রাতে মুক্তি পায় নতুন সিজন।
দুই দেশের পারস্পরিক চুক্তি, দেশের নিরাপত্তা, রাজনৈতিক নেতাদের জেদ, চরমপন্থীদের নৃশংশতা আর এই সবকিছুর সঙ্গে সমান্তরাল ভাবে চলা দেশের নিরাপত্তার জন্য কয়েকজন নিরাপত্তাকর্মীর নিরলস শ্রম ও আত্মত্যাগ – এই সূত্র ধরে একটি ওয়েব সিরিজের গল্প যেমন টানটান চমকপ্রদ হওয়া উচিত, এ গল্প ঠিক তেমনই। পরতে পরতে রাখা আছে থ্রিল। টানটান গল্পের গতি। জোরালো অভিনয়। সেই সঙ্গে চিত্রনাট্য জুড়ে হিউমারের দারুণ ব্যবহার। সব মিলিয়ে এই ধরনের ওয়েব সিরিজ থেকে দর্শকের প্রত্যাশা যেমন থাকে, পরিচালক রাজ-ডিকে জুটি ঠিক তেমন ভাবেই সাজিয়ে উপহার দিয়েছেন নয়া সিজন।
তবে তামিলদের ভাবাবেগে আঘাতের দাবিতে বিতর্ক জন্ম দেয় ‘ফ্যামিলি ম্যান-২’ । স্বয়ং রাজ্যসভার সাংসদ ভায়কো তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রককে চিঠি দিয়ে এই সিরিজ ব্যান করার আবেদন করেন। এমনকি ‘ফ্যামিলি ম্যান-২’-এর মুক্তি স্থগিতের আবেদন রাজ্য সরকার। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী প্রকাশ জাভড়েকরকে চিঠি লিখে তামিলনাড়ু সহ গোটা দেশে অ্যামাজন প্রাইমের এই ওয়েব সিরিজের মুক্তি স্থগিতের দাবি জানায় সে রাজ্যের সরকার।
‘ধুপ কি দিওয়ার’
২০২১ এর ২৫ জুন ভিডিও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম জিফাইভে মুক্তি পায় পাকিস্তানি প্রডাকশন এবং জিন্দেগি অরিজিনাল ‘ধুপ কি দিওয়ার’। এই ওয়েব সিরিজে অভিনয় করেছেন জনপ্রিয় পাকিস্তানী জুটি সজল আলি এবং আহাদ রাজা মীর। আন্ত-সীমান্ত প্রেম, পরিবার এবং হারানোর কাহিনী ‘ধূপ কি দিওয়ার’। ভারতের বিশালের চরিত্রে আহাদ রাজা মীর এবং পাকিস্তানের সারা চরিত্রে সজল আলী যুদ্ধে তাদের বাবাকে হারায়। সেই বেদনার প্রেক্ষাপটেই তারা খুঁজে পায় তাদের জীবনের সাদৃশ্য। উভয়ের একই শোক গড়ে তোলে বন্ধুত্বের নিগূঢ় বন্ধন।
সিরিজটিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় যারা অভিনয় করেছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন শামিয়া মমতাজ, জায়েব রেহমান, সাবেরা নাদিম, সামিনা আহমেদ, মানজার সেহবাই, রাজা তালিশ, আলী খান এবং আদনান জাফর। দুটি পরিবারের ওপর যুদ্ধ এবং মৃত্যুর প্রভাব তুলে ধরা হয়েছে ওয়েব সিরিজটিতে। তারা বুঝতে পারে- একমাত্র শান্তিই এর সমাধান। ওয়েব সিরিজটি প্রযোজনা করেছে মোশন কনটেন্ট গ্রুপ এবং হামদান ফিল্মস।
গ্রুপ এম পাকিস্তানের চিফ ইনভেস্টমেন্ট অফিসার আতিক রেহমান বলেন, “সমস্ত প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে গিয়ে এবং আগে কখনো হয়নি এমন কিছু করা সহজ কাজ নয়। ‘ধুপ কি দিওয়ার’ মোশন অ্যান্ড গ্রুপ এম পাকিস্তানের এমনই একটি উদ্যোগ। যখন যুদ্ধ আর ঘৃণা আমাদের জীবনকে আঁকড়ে ধরেছে, তখন ‘ধুপ কি দিওয়ার’ বলে- সীমান্তের কোনো পাড়েই কোনো সৈনিকের মৃত্যু কাম্য নয়। রাজনৈতিক সীমানায় যেন ভূলুণ্ঠিত না হয় মানবতা। দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ পরবর্তী পরিস্থিতি এবং যেসব পরিবার তাদের প্রিয়জনকে হারিয়েছেন, ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক সীমানা পেরিয়ে শোক তাদের কি করে একই বন্ধনে আবদ্ধ করে সে চিত্রই তুলে ধরা হয়েছে সিরিজটিতে।
‘ডিকাপলড’
কিছু শব্দ ব্যক্তিসাপেক্ষ, পরিস্থিতিভিত্তিক। যেমন, ‘রুচি’। কয়েক প্রজন্মের কাছে প্রিয় এক অভিনেতার একটি চরিত্র দেখে যদি মনে হয়, ‘সে কেন এমন করছে?’, তবে বুঝতে হবে সমস্যা অন্যত্র। হার্দিক মেহতা নির্দেশিত নেটফ্লিক্স সিরিজ় ‘ডিকাপলড’-এ আর মাধবন অভিনীত আর্য আইয়ারের মতো চরিত্র সমাজের উঁচুতলায় থাকতে পারে। কিন্তু যখন এমন চরিত্রকে নিয়ে সিরিজ় লিখে ফেলা হয়, তখন লেখকের ‘রুচি’ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
বিখ্যাত সাংবাদিক-লেখক মনু জোসেফের বই অবলম্বনে তৈরি নেটফ্লিক্স ছবি ‘সিরিয়াস মেন’ সব মহলে প্রশংসিত। ‘ডিকাপলড’ সিরিজ়ের ক্রিয়েটর এবং লেখক মনু। এই সিরিজ়ে দর্শককে হাসাতে চেয়েছেন তিনি। চরিত্র লেখার সময়ে নিজেও হয়তো হেসেছেন। কিন্তু হাসির বিষয়গুলি এতই ‘সিরিয়াস’ যে, অতিমারিপীড়িত মোবাইলকেন্দ্রিক দর্শকের তাতে হাসি না পাওয়ারই কথা। আর কেউ যদি এতে আমোদ পান, তবে ঘুরেফিরে প্রশ্ন সেই ‘রুচি’তে গিয়ে ঠেকে।
আর্য (মাধবন) এবং শ্রুতি শর্মা আইয়ার (সুরভিন চাওলা) বিবাহবিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাদের বারো বছরের মেয়ে রোহিণীর (অরিস্তা মেহতা) কাছে কী ভাবে তা বলা হবে, তা নিয়ে টানাপড়েন। তবে আট পর্বের সিরিজ়ের একেবারে শেষ পর্বে এই বিষয়টি প্রাধান্য পায়। প্রথম সাতটি পর্বে মিঞা-বিবির কাজিয়া, পরকীয়া, প্রাক্তন সম্পর্কের আনাগোনা আর ‘পলিটিক্যালি ইনকারেক্ট’ ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ!
‘বম্বে বেগম’
সিনেমার যে থিম তা আঁকড়ে ধরার নাম করে ভালো সুযোগগুলিকে হারিয়ে দেওয়ার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ পরিচালক অলংকৃতা শ্রীবাস্তবের 'বম্বে বেগম’। যখন দর্শক এই শোয়ের সঙ্গে নিজেদের অনুভূতিগুলিকে এক করার চেষ্টা করবেন তখনই সিনেমাটি তার ট্র্যাক বদল করে নেবে। ছ’টি পর্বের এই শো শুরু হওয়ার দু’টি পর্বেই নিজেদের ব্যর্থতা প্রকাশ করে দেয় এবং বাকি পর্বগুলি শুধুমাত্র দীর্ঘশ্বাস ফেলেই দেখতে হবে।
গত মার্চের ১১ তারিখ ভারতের শীর্ষস্থানীয় শিশু অধিকার সংস্থা এনসিপিসিআর নেটফ্লিক্সকে অবলম্বে 'বম্বে বেগম’–এর স্ট্রিমিং বন্ধ করতে বলেছে। তাদের অভিযোগ কারণ এই সিরিজে শিশুদের আপত্তিকর ভাবমূর্তি তুলে ধরা হয়েছে। কমিশন জানিয়েছে যে সিরিজে শিশুদের ভাবমূর্তিকে যেভাবে তুলে ধরা হয়েছে তাতে তাদের আপত্তি রয়েছে। এ ধরনের কনটেন্ট শুধু শিশুমনকে দূষিত করছে না কিন্তু শিশুদের শোষণ ও হেনস্থাকে তুলে ধরছে।