১৯৬৪ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। সে সময়ে দৈনিক ইত্তেফাকের সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে। অর্থাৎ পড়ার অভ্যাস করি। ম্যাট্রিক পাশের আগে পর্যন্ত পত্রিকার হেডলাইন পড়েছি। ছবি দেখেছি। এটুকুই।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছি। আইয়ুব খানের সামরিক শাসন মাথায় ঢুকেছে। বঙ্গবন্ধুর ৬-দফা বুঝতে শুরু করেছি। সেই সময়ে ইত্তেফাক দৈনিকের সম্পাদক মুসাফির ছদ্মনামে ‘রাজনৈতিক মঞ্চ’ শিরোনামে কলাম লিখতেন। সেই কলামে প্রতিদিন পড়ার অভ্যাস করি। দেশের পরিস্থিতি জানতে পারতাম। সে কারণে ঐ কলাম পড়ার আগ্রহ প্রবল হয়ে উঠেছিল।
তবে প্রথম দিকে পত্রিকার সাধু ভাষার কারণে ধাক্কা খেয়েছিলাম। আমরা তখন সাধু ভাষার গদ্য পড়তে অভ্যস্ত ছিলাম না। পাঠ্যবই কিংবা গল্প উপন্যাস সবই ছিল কথ্য ভাষায় রচিত। তবে পড়তে পড়তে সাধু ভাষায় অভ্যস্ত হয়ে উঠি। পড়তেও ভালো লাগে। নিজের ভেতরে যুক্তি তৈরি হয় এই ভেবে যে, ভাষার দুটো প্রচলিত রীতি আছে। সাধু ও চলিত রীতি। সাধু রীতির ব্যবহার প্রায় উঠে গেছে। একটি দৈনিক পত্রিকা যদি রীতিটি ধরে রাখতে চায় তো মন্দ কি। থাকুক না। এভাবে ইত্তেফাক পত্রিকার সাধু রীতি বিষয়ে দ্বিধা কেটে যায়।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ পড়ে ইত্তেফাক প্রকাশনার বিষয়ে অনেক কিছু জানতে পারি। সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া কত পরিশ্রমে এবং যত্নে পত্রিকাটি প্রকাশ করেছিলেন সে কথা লিখেছেন : ‘মানিক ভাই পরের মামলার তারিখে বললেন যে, কাগজ তিনি চালাবেন। কাগজ বের করলেন। অনেক জায়গা থেকে টাকা জোগাড় করতে হয়েছিল। নিজেরও যা কিছু ছিল এই কাগজের জন্যই ব্যয় করতে লাগলেন। কিছু দিনের মধ্যে কাগজটা খুব জনপ্রিয় হতে লাগল।’
এর পরে বঙ্গবন্ধু আবার লিখেছেন : ‘মানিক ভাই ইংরেজি লিখতে ভালোবাসতেন, বাংলা লিখতে চাইতেন না। সেই মানিক ভাই বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কলামিস্টে পরিণত হলেন। চমৎকার লিখতে শুরু করলেন। নিজেই ইত্তেফাকের সম্পাদক ছিলেন।’ নিজের লেখা আত্মজীবনীতে একজন সম্পাদককে এভাবে সম্মান জানিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। নিঃসন্দেহে সম্পাদনার ক্ষেত্রে তিনি একজন দৃষ্টান্ত স্হাপনকারী ব্যক্তি। বঙ্গবন্ধু তার বইয়ের আরেক জায়গায় লিখেছেন, একবার তাদের চীনে যাওয়ার প্রোগ্রাম হয়েছিল। তফাজ্জল সাহেব বলেছিলেন আমি যেতে পারব না। আমি গেলে পত্রিকা দেখবে কে? লিখবে কে? এই অঙ্গীকার নিয়ে একজন সম্পাদক পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন। সেই সময়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক আর্থসামাজিক পরিস্থিতির বৈষম্যের খবর নিয়মিত প্রকাশিত হতো। অন্যতম মুদ্রণ গণমাধ্যম হিসেবে দেশের ক্রান্তিকালে নির্ভীক ছিল ইত্তেফাকের কণ্ঠ। বাঙালির অধিকার আদায়ের অঙ্গীকারের কারণে পাকিস্তান সরকার তিন বার পত্রিকাটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। তার পরও অবদমিত হয়নি কণ্ঠস্বর।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ দাউ দাউ পুড়েছে ইত্তেফাক। প্রথমে কুণ্ডুলী পাকানো কালো ধোঁয়া দেখেছি আকাশে। থাকতাম এলিফ্যান্ট রোডে। বিভিন্ন জনের কাছে ফোন করে জানতে পেরেছি যে, ইত্তেফাক জ্বলছে।
মনে পড়ছে ১৯৬৪ সালের কথা, বাঙালি-বিহারি দাঙ্গায় আক্রান্ত ঢাকা শহর। আমি আমার ‘গায়ত্রী সন্ধ্যা’ উপন্যাস লিখেছি ’৪৭ থেকে ’৭৫ পর্যন্ত পটভূমিতে। উপন্যাসের এক পর্যায়ে দাঙ্গা আমার কাহিনীতে আসে। ১৫ জানুয়ারি দৈনিক ইত্তেফাকের সম্পাদকীয়তে উল্লেখ করা হয়েছে যে : ‘আমাদের স্বদেশভূমিকে সাম্প্রদায়িকভাবে বিষবাষ্প ও আত্মঘাতী রক্তপাত হইতে মুক্ত রাখিবার জন্য এ দেশের কৃষক, মজুর, মধ্যবিত্ত ছাত্র বুদ্ধিজীবী সকলের প্রতি আমরা পুনর্বার আকুল আবেদন জানাইতেছি।’ এই সম্পাদকীয় লেখার কারণে ইত্তেফাক অফিসে হামলা করেছিল সাম্প্রদায়িক শক্তি। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছিল ইত্তেফাক।
১৯৬৩ সালের দিকে পাকিস্তানের সংবাদপত্রের ওপর কয়েকটি বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল সরকার। এই পরিপ্রেক্ষিতে প্রেসক্লাবের সাংবাদিক সম্মেলনে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া বক্তৃতায় বলেছিলেন, বর্তমানে যে সংগ্রাম শুরু হয়েছে, তা শুধু সাংবাদিক ও সাংবাদিকতার জীবন-মরণের সংগ্রামই নয়, সে সংগ্রামের সঙ্গে একটি স্বাধীন জাতির অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইও বিজড়িত। আমার ‘গায়ত্রী সন্ধ্যা’ উপন্যাসটি লেখার জন্য এভাবে ইত্তেফাক নাড়াচাড়া করেছি। বিভিন্ন তথ্য নিয়েছি গল্পের চরিত্রের সঙ্গে উঠে এসেছে উপন্যাসের পৃষ্ঠা।
স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন লেখা লিখেছি ইত্তেফাকের সাহিত্য পাতায়। বেশ কয়েকটি গল্পও ছাপা হয়েছে। একটি প্রসঙ্গ উল্লেখ করতে চাই—সালটা সঠিক মনে নেই, ’৭৮ বা ৭৯ হতে পারে। সাহিত্য পাতায় কবি সিকদার আমিনুল হক একটা লেখায় বললেন, সঠিক বাক্যটি আমার মনে নেয়নি, ভাবার্থ এমন ছিল যে নারী লেখিকার দায়িত্ব পুরুষ লেখকদের সঙ্গী হওয়া—তাদের মনোরঞ্জন করা। আমার মাথায় আগুন জ্বলে ওঠে। আমি প্রতিবাদ জানাই। আমার প্রতিবাদ ছাপা হয়। আরো দু-একটি লেখা ছাপা হওয়ার পরে বিভাগীয় সম্পাদক এই বিতর্ক বন্ধ করে দেন। সেই বিতর্কের পরে নারী লেখকরা বলতে শুরু করেন, যিনি লিখবেন তিনি লেখক। তাদের স্ত্রীলিঙ্গ-পুংলিঙ্গ নামে প্রকাশ পাবে, লেখালেখিতে নয়। এভাবে ইত্তেফাকের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হয় নানাভাবে।
তবে সবই স্মৃতি মাত্র নয়। ইত্তেফাক আমার উপন্যাসের পৃষ্ঠায় এসেছে, জেন্ডার-সমতার কথায় এসেছে—ঈদসংখ্যায় উপন্যাস প্রকাশ করে সাহিত্যের জায়গায় আছে—সাহিত্য পাতায় গল্প বা নিবন্ধ ছেপে পাঠকের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। বন্ধু ও বন্ধুত্বের সবটুকু ছুঁয়ে আছে।