উন্নয়নশীল বিশ্বে শিল্পকলকারখানার বিকাশ সাধিত হইতেছে না। এই সকল দেশে যেই শিল্প খুব ভালোভাবে চলিতেছে তাহা হইল করাপশন ইন্ডাস্ট্রি বা দুর্নীতিশিল্প। দুর্নীতি এই সকল দেশে বহুমাত্রিকতা লাভ করিয়াছে।
ইহা এমন আর্ট বা শিল্পে পরিণত হইয়াছে, যাহা দেখিয়া উন্নত বিশ্ব তাজ্জব হইয়া যাইতেছে। এই সকল দেশের পরতে পরতে নানা প্রকার দুর্নীতি ও অনিয়ম বাসা বাঁধিয়াছে। মানুষের জীবনে উঠিয়াছে নাভিশ্বাস। টাকা বা ঘুষ প্রদান ছাড়া এইখানে কিছুই করা যায় না। দুর্নীতি এখানে ওপেন সিক্রেট। প্রশাসন ও সমাজব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে ইহার অনুপ্রবেশ ঘটিয়াছে।
লুটেরার দল এই সকল দেশকে মগের মুল্লুক বানাইয়া ফেলিয়াছে। ক্ষমতাসীনরা যাচ্ছেতাইভাবে করিতেছে ক্ষমতার অপব্যবহার। প্রশাসনের আগাগোড়া হইয়া পড়িয়াছে দুর্নীতিগ্রস্ত। সাধারণ মানুষ কোথায় যাইবে ইহাই এখন এই সকল দেশে বড় প্রশ্ন হইয়া দেখা দিয়াছে। সামরিক শাসনের সময় সচিব মনঃপূতভাবে কাজ না করিলে তথা অবৈধ কাজে সহযোগিতা না করিলে তাহাকে বাদ দিতে সময় লাগিত না। সেই ধারা আজও কোথাও কোথাও চালু রহিয়াছে।
অনেক দেশে গণতান্ত্রিক ছদ্মাবরণে চলিতেছে অগণতান্ত্রিক কায়কারবার। দেশকে যেন অন্যের কাছে বন্ধক দেওয়া হইয়াছে। সে এক কঠিন পরিস্থিতি! এই সংকট উন্নয়নশীল বিশ্ব হইতে কখন দূর হইবে তাহা কাহারও জানা নাই। বিশ্লেষকরা বলিতেছেন, এই সকল দেশে সকল কিছু সংকোচনশীল, কেবল দুর্নীতি সম্প্রসারণশীল। নাগরিকদের মধ্যে বাড়িয়া গিয়াছে আয়বৈষম্য। বাড়িতেছে কালো টাকা ও অর্থ পাচার। সরকারের বিভিন্ন পদ পরিণত হইয়াছে লাভজনক ব্যবসায়। যেই সকল উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হইতেছে তাহা যথাসময়ে সম্পন্ন হইতেছে না। প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হইতেছে বারংবার।
অথচ প্রকল্পের শুরুতে যেই ব্যয়ের প্রাক্কালন করা হয়, সেইখানেই থাকে বড় ধরনের দুর্নীতি। ইচ্ছাকৃতভাবে অধিক দেখানো হয় ব্যয়। ডিপিপিগুলি প্রণয়নে প্রথমেই অনিয়মের আশ্রয় নেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে ১০ টাকার জিনিসকে ১০০ টাকা হিসাবে দেখানো হয়। এই অনিয়ম লইয়া তেমন উচ্চবাচ্চ নাই। আমরা পরবর্তী সময়ে কেবল প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধিকেই বড় করিয়া দেখি। উন্নয়নশীল বিশ্বের ইহা একটি বড় রোগ। এই পুকুরচুরি বন্ধ না হইলে তাহারা কখনোই মাথা উঁচু করিয়া দাঁড়াইতে পারিবে না। একসময় আফ্রিকা মহাদেশের অবস্থা এশিয়ার দেশগুলির চাইতে শোচনীয় থাকিলেও এখন তাহারা ঘুরিয়া দাঁড়াইতেছে।
রাজপথে নামিয়া বিভিন্ন অন্যায়-অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাইতেছে। তাহারা রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও উন্নতি সাধন করিতেছে। এমন ব্যবস্থা তৈরি করিয়াছে, যাহাতে বিদেশি হস্তক্ষেপকেও তাহারা অগ্রাহ্য করিতে পারে। একটি শক্তিমান দেশের প্রেসিডেন্টের প্রকাশ্য সমর্থন থাকা সত্ত্বেও আফ্রিকার একটি দেশ তাহাতে কর্ণপাত করে নাই। আবার ইউরোপের বিভিন্ন দেশে দুর্নীতির সামান্য বাতাস উঠিলে তত্ক্ষণাত্ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। অনেকে অভিযোগ উঠিতেই নিজ হইতে পদত্যাগ করিতে কালক্ষেপণ করেন না। গণতন্ত্র হইল স্টেট অব মাইন্ড। এই শিক্ষা হইতেই তাহারা সহসা এমন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।
দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশে ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির দায়ে সাবেক প্রেসিডেন্ট পার্ক জিউন হাইকে ২০ বত্সরের কারাদণ্ড দেন আদালত। নির্বাচনি আইন ভঙ্গের দায়ে তাহাকে আরো দুই বত্সর সাজা দেওয়া হয়। ২০১৭ সালে পার্লামেন্টে তাহাকে অভিশংসন করা হয়। বর্তমান প্রেসিডেন্ট অসুস্থতার কারণে তাহাকে নূতন বত্সরে বিশেষ ক্ষমতার আওতায় ক্ষমা করিয়া দিয়াছেন; কিন্তু তাহাকে কয়েক বত্সর সাজা ভোগ করিতে হইল।
অথচ উন্নয়নশীল বিশ্বের অনেক দেশে অভিযোগের পর অভিযোগ উঠিলেও অনেকে ইহাকে পরোয়া করেন না। দুর্নীতিই যখন একমাত্র শিল্প হয়, তখন সেই সকল দেশে এমন পরিস্থিতি দাঁড়াইয়া যাওয়াটা অস্বাভাবিক নহে। ইহা হইতে পরিত্রাণ লাভে সর্বাত্মক চেষ্টা করাই বাঞ্ছনীয়।