গণতন্ত্রের স্বার্থেই সদাচরণ প্রয়োজন 

খুব বেশি দিন আগের কথা নহে। বাংলাদেশের একজন পৌর মেয়র বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে শিক্ষা কর্মকর্তাকে লাঞ্ছিত করেন। সরকারি কর্মকর্তাদের প্রতি হুমকিধমকি প্রদানের পাশাপাশি কখনো কখনো তাহাদের গায়ে হাত তোলার দৃষ্টান্ত এই দেশে নূতন নহে। একজন ইউএনওর বাসায় হামলার ঘটনাও ঘটিয়াছে সম্প্রতিকালে। 

ইহার পরিপ্রেক্ষিতে সারা দেশে ইউএনওদের নিরাপত্তায় আনসার নিয়োগ দেওয়া হয়। পরিস্হিতি কোথায় গিয়া দাঁড়াইয়াছে তাহা ইহা হইতে সম্যক উপলব্ধি করা যায়। ঠিকাদারদের দ্বারা বিভিন্ন পর্যায়ের ইঞ্জিনিয়ারদের নাজেহাল হওয়ারও ভূরি ভূরি নজির রহিয়াছে। সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে এইরূপ খারাপ আচরণের ঘটনা কমবেশি সকল সরকারের আমলেই ঘটিয়াছে। তবে বর্তমানে ইহার প্রবণতা বাড়িয়া গিয়াছে বলিয়া অনেকে উদ্বেগ প্রকাশ করিতেছেন। 

এই সকল ঘটনা আসলে ক্ষমতাসীন দলের একশ্রেণির নেতাকর্মীদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদদেই সংঘটিত হইয়া থাকে। তাহাদের ছত্রছায়ায় বা অনেক সময় তাহাদের নাম ভাঙাইয়াও অনেকে সরকারি কর্মকর্তাদের সহিত ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করেন, যাহা মোটেও কাম্য হইতে পারে না। প্রকৃতপক্ষে প্রশাসনকে সম্মুখে রাখিয়া ও তাহাদের ব্যবহার করিয়া এই সকল প্রভাবশালী ব্যক্তি ও মহল নিজেদের আখের গুছাইয়া নেওয়ার চেষ্টা করেন। সরকারি কর্মকর্তারাও ঘুষ নিয়া নিজেদের সততা বিক্রয় করিয়া থাকেন। 

নিয়মনীতির ব্যত্যয় ঘটান। এই ক্ষেত্রে কোনো কারণে বনিবনা না হইলে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্হিতির সৃষ্টি হয়। অনেক সময় কাজ না করিয়াই বিল উঠাইয়া নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। সেই ক্ষেত্রে সরকারি কর্মকর্তারা বাধা দিলে সেই মহলটি ক্ষিপ্ত হইয়া উঠে। অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজসহ প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়। 

সরকারি ইঞ্জিনিয়ারের অফিসে পিস্তল নিয়া মহড়া দেওয়ার কথাও আমরা জানি। এই সকল নেতাকর্মীর এইরূপ অপকর্মের কারণে শেষ পর্যন্ত সরকারেরই সমালোচনা হয়। সরকারের উপর তৈরি হয় নানামাত্রিক চাপ। এখন সরকার ইহা কীভাবে সামলাইবে তাহা ভাবিয়া দেখা দরকার। গণতান্ত্রিক ব্যবস্হায় একটি সরকারের ক্ষমতার মূল ভিত্তি হইল জনসমর্থন এবং নিজ দলের নেতাকর্মীদের অকুণ্ঠ সমর্থন ও সহযোগিতা। তাহাদের পাওয়ার বেইজ বা ক্ষমতার ভিত্তি যেহেতু ক্যান্টনমেন্ট নয়, তাই তাহাদের এই জনসমর্থন ও নেতাকর্মীদের সার্বিক সহযোগিতা একান্ত প্রয়োজন। তবে কোনো কিছুতেই সীমা লঙ্ঘন করা অনুচিত। 

কেননা সীমা লঙ্ঘনকারীকে আল্লাহ তায়ালা পছন্দ করেন না। উল্লেখ্য, উন্নয়নশীল বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশেই এই সমস্যা দেখা যায়। তাহা ছাড়া বাংলাদেশে এখন বলিতে গেলে সকল কাজই হইতেছে সরকারিভাবে। বড় বড় প্রজেক্ট বাস্তবায়িত হইতেছে সরকারি টাকায়। প্রাইভেট খাতও এখন কোনো না কোনোভাবে সরকারি কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত হইয়া আয়-উন্নতি করিতেছে। সরকারের সঙ্গে সংশ্রব ছাড়া বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ভালোভাবে টিকিয়া থাকা এখন কঠিন হইয়া পড়িয়াছে। ইহার কারণেও সরকারি কর্মকর্তাদের সহিত এইরূপ দ্বন্দ্ব-সংঘাতের ঘটনা এখন বেশি ঘটিতেছে বলিয়া প্রতীয়মান হয়। 

তবে সরকার যদি নিজ দলকে শৃঙ্খলা ও সীমানায় না রাখিতে পারে, তাহা হইলে প্রতিদ্বন্দ্বী দল ইহার সুযোগ নিবে, ইহাই স্বাভাবিক। যাহারা গণতন্ত্রে বিশ্বাসী নহে, তাহারাও ইহাতে উত্সাহ বোধ করিতে পারেন। আর সরকারি কর্মকর্তাদের উচিত চিন্তাভাবনা করিয়া কাজ করা। আইন ও নিয়মনীতির মধ্যে থাকিয়া কাজ করা, যাহাতে তাহাদের দুর্ব্যবহারের শিকার হইতে না হয়। 

ইহার পরও যদি তাহাদের সহিত দুর্ব্যবহার করা হয়, তাহা হইলে তাহার পরিণাম শুভ হইবে না। সরকারের জন্য ইহা বুমেরাং হইবে। ইহা উপলব্ধি করিয়া গণতন্ত্র রক্ষার স্বার্থেই সকলের দায়িত্বশীল আচরণ করা উচিত। বিরত থাকা উচিত আইনের পরিপম্হি যে কোনো কাজ হইতে।