টাকা দিয়ে সচ্ছল পরিবার পেল আশ্রয়ণের দুটি ঘর

সিলেটের ওসমানীনগরে আশ্রয়ণ প্রকল্প-২-এর আওতায় প্রকৃত ভূমিহীন পরিবারকে বঞ্চিত করে অর্থের বিনিময়ে সচ্ছল পরিবারকে ঘর দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ইউএনও ও সহকারী কমিশনার (এসি-ল্যান্ড) অফিসের কিছু অসাধু কর্মকর্তা, ইউনিয়নের সহকারী ভূমি কর্মকর্তা, স্থানীয় কিছু জনপ্রতিনিধি ও প্রভাবশালী লোকজনের যোগসাজশে এই অনিয়ম করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

সাদীপুর ইউনিয়নে অর্থের বিনিময়ে একটি সচ্ছল পরিবারকে দুটি ঘর দেওয়া হয়েছে। অথচ একই এলাকার একটি গৃহহীন পরিবার সংশ্লিষ্টদের টাকা দিয়েও আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর পায়নি। ঝুপড়িঘরেই মানবেতর জীবন যাপন করছে পরিবারটি। ঘরের জন্য দেওয়া টাকা বা ঘর কোনোটাই না পেয়ে দিশেহারা ভূমিহীন আছিয়া বেগম অবশেষে এ ঘটনায় চার জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় অভিযুক্তরা হচ্ছেন :আওয়ামী লীগ নেতা আহবাব মিয়া, সাদীপুর ইউনিয়নের সহকারী ভূমি কর্মকর্তা অনিল সিংহ, আশ্রয়ণ প্রকল্পে ঘর বরাদ্দপ্রাপ্ত হাসুরা বেগমের দুই ছেলে নূর মোহাম্মদ ও নূর জামান।

মামলা সূত্রে জানা যায়, আশ্রয়ণ প্রকল্প-২-এর আওতায় উপজেলার সাদীপুর ইউনিয়নে বাংলাবাজার এলাকায় সম্মানপুর মৌজার ৮৩৫ দাগের সরকারি খাসভূমিতে তিনটি ঘর নির্মাণ করা হয়। ঐ জমিতে গত ২২ বছর ধরে পরিবার নিয়ে বাস করছিলেন আছিয়া বেগম। তার স্বামী রিকশাচালক রুবেল মিয়া ভূমিহীন সনদপ্রাপ্ত। গত ২ এপ্রিল ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা অনিল সিংহ, আওয়ামী লীগ নেতা আহবাব মিয়াসহ কয়েকজন আছিয়া বেগমকে জানান, ঐ ভূমিতে আশ্রয়ণ প্রকল্পের তিনটি ঘর নির্মাণ করা হবে। এর মধ্যে একটি ঘর আছিয়া বেগমকে দেওয়া হবে এমন প্রতিশ্রুতিতে তাকে জমি খালি করতে বলেন। এরপর আছিয়া বেগম সরকারি ভূমি ছেড়ে দিয়ে পার্শ্ববর্তী একটি স্থানে ঝুপড়িঘর বানিয়ে স্বামী-সন্তান নিয়ে বাস করা শুরু করেন।

পরে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর নির্মাণের জন্য বিভিন্ন দপ্তরে খরচ বাবদ আছিয়া বেগমের কাছে ৩০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। গত ১১ জুন আছিয়া বেগম ঐ টাকা আওয়ামী লীগ নেতা আহবাব মিয়া, আশ্রয়ণ প্রকল্পে ঘর বরাদ্দপ্রাপ্ত নূর মোহাম্মদ ও নূর জামানের হাতে তুলে দেন। আগস্টের শেষ দিকে ঘর নির্মাণ হলে একটি ঘর আছিয়া বেগমকে মৌখিকভাবে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। ১ অক্টোবর বিকালে আরো ৫০ হাজার টাকা দাবি করেন অভিযুক্তরা। আছিয়া বেগম টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে স্বামী-সন্তানসহ আছিয়া বেগমকে মারধর করে জোরপূর্বক ঘর থেকে বের করে দরজায় তালা লাগিয়ে দেওয়া হয়। 

মামলায় উল্লেখ করা হয়, অভিযুক্ত নূর মোহাম্মদ ও তার মা হাসুরা বেগম ভূমিহীন না হয়েও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তার সহায়তায় আশ্রয়ণ প্রকল্পে ঘর বরাদ্দ পেয়েছেন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আশ্রয়ণ প্রকল্পে নির্মিত তিনটি ঘরে দিনমজুর নজরুল মিয়া, টমটমচালক নূর মোহাম্মদ ও হাসুরা বেগম (নুর মোহাম্মদের মা) বরাদ্দ পেয়েছেন। আশ্রয়ণ প্রকল্পের অদূরেই হাসুরা বেগমের নামে ৫ শতক জমি ও এর ওপর নির্মিত একটি টিনশেডের পাকা ভবন রয়েছে।

আছিয়া বেগম বলেন, ‘আমরা ২২ বছর ধরে এই ভূমিতে ঘর বানিয়ে বাস করছি। বসতবাড়ির ইউপি ট্যাক্স প্রদান করছি। আমার স্বামীর নামে ভূমিহীন সনদ রয়েছে। নিজস্ব বৈদ্যুতিক মিটারও রয়েছে। আমাদের উক্ত ভূমি থেকে উচ্ছেদ করে তিনটি ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। নিজেদের বাড়ি রয়েছে এমন পরিবারের দুই জনের জন্য দুটি ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আহবাব মিয়া ও ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তার চাহিদা মাফিক টাকা দিতে না পারায় আমি কোনো ঘর পাইনি।’ 

অভিযুক্ত আওয়ামী লীগ নেতা আহবাব মিয়া বলেন, ‘আমি জনপ্রতিনিধি নই। ঘর বরাদ্দের ব্যাপারে কোথাও আমার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। আছিয়া বেগম উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আমার নামে অভিযোগ দিয়েছেন।’ নিজের নামে কোনো জমি নেই দাবি করে হাসুরা বেগম আশ্রয়ণ প্রকল্পে ঘর বরাদ্দের দলিল দেখিয়ে এই প্রতিবেদকে জানান, তার ছেলে নূর মোহাম্মদ পরিবার থেকে আলাদা। তাই নূর মোহাম্মদের নামে আলাদা ঘর দেওয়া হয়েছে। তার (হাসুরা বেগমের) মালিকানায় জমির দলিল রয়েছে জানালে তিনি বলেন, এসব মিথ্যা। 

হাসুরা বেগমকে ভূমিহীন সনদ প্রদান প্রসঙ্গে স্থানীয় সংরক্ষিত ওয়ার্ডের মহিলা ইউপি সদস্য আলেয়া বেগম বলেন, ‘আমি মহিলা হয়ে সব জায়গায় যাওয়া বা সবকিছু ভালো করে যাচাই করা সম্ভব নয়। স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতার শনাক্তের ভিত্তিতে আমি হাসুরা বেগমকে ভূমিহীন সনদ দিয়েছি। পরে জেনেছি হাসুরার নিজস্ব বাড়ি রয়েছে।’ 

ইউনিয়ন সহকারী ভূমি কর্মকর্তা অনিল সিংহ বলেন, ভূমিহীন সনদ পেয়েই হাসুরা বেগমের নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ঘর তিনটি, দাবিদার চার জন। যারা আগে যোগাযোগ করেছে তারা ঘর বরাদ্দ পেয়েছে। আছিয়া বেগমের জন্য অন্যত্র ঘরের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। 

সাদীপুর ইউপি চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা কবির উদ্দিন আহমদ বলেন, আছিয়া বেগমের ঘর না পাওয়ার বিষয়টি অমানবিক। এতে প্রধানমন্ত্রীর মহত উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে ইউএনওর সঙ্গে একাধিকবার কথা হয়েছে। হাসুরা বেগমের বিষয়ে তিনি বলেন, ঐ নারী ভুয়া হলফনামা দিয়ে ঘর বরাদ্দ পেয়েছেন। 

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নীলিমা রায়হানা বলেন, ‘আমি এ উপজেলায় যোগদানের আগে এসব ঘটনা ঘটেছে। তাই সবকিছু স্পষ্ট বলতে পারব না। তবে আমি আছিয়া বেগমের বিষয়টি জেনে তার জন্য ঘর বানিয়ে দিতে নির্দেশ দিয়েছি। আর হাসুরা বেগমের যদি নিজস্ব বাড়ি থাকে, তবে তিনি কীভাবে ঘর পেলেন, এখানে কোনো প্রকার দুর্নীতি রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’