বাংলাদেশে বড় একটি সমস্যা হইল ওভারলোডিং। বাস, ট্রেন, লঞ্চ স্টেশন যেখানেই যাই না কেন, দেখা যায় শুধু মানুষ আর মানুষ। এই দেশটি বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশ। এইখানে জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ১ হাজার ২০০ জন। কিছু দ্বীপ ও নগররাষ্ট্র বাদে জনসংখ্যার এই ঘনত্ব পৃথিবীতে সর্বোচ্চ।
ফলে বিভিন্ন যানবাহনে মানুষ চলিতেছে গাদাগাদি করিয়া। এই কারণে কোনো দুর্ঘটনা ঘটিলে হতাহতের সংখ্যাও অধিক হয়। সম্প্রতি ঢাকা হইতে বরগুনাগামী এমভি অভিযান-১০ নামে একটি লঞ্চে আগুন লাগে। ইহাতে এই পর্যন্ত ৪১ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হইয়াছে। নিখোঁজ ৫১ জনের তালিকা দিয়াছে রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি। এই লঞ্চটির ধারণক্ষমতা ৪২০ জন। কিন্তু ঐদিন লঞ্চটিতে যাত্রী ছিল আট শতাধিক। এই অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন অনেক সময় লঞ্চডুবির কারণ হইয়া উঠে।
কিন্তু কে শুনে কাহার কথা? হুড়াহুড়ি ও ঠেলাঠেলি করিয়া জীবনের ঝুঁকি লইয়া যাত্রীরা উঠিয়া পড়ে। ইহা নিয়ন্ত্রণ করিতে অনেক সময় র্যাব-পুলিশও ডাকা হয়। ইহা কি যাত্রীসাধারণের অসচেতনতা, নাকি বিদ্যমান পরিচালনা ব্যবস্থার ত্রুটি? আসলে এখানে উভয় কারণই জড়িত। লঞ্চে অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাইয়ের পিছনে কিছু কৃত্রিম কারণও সক্রিয়, যেই ব্যাপারে আমাদের চিন্তাভাবনার অবকাশ রহিয়াছে। যাত্রীদের সচেতন হইতে হইবে, ইহাতে কোনো সন্দেহ নাই।
কিন্তু যেই সকল নিয়মকানুন রহিয়াছে তাহার ব্যত্যয় হইবে কেন? লঞ্চের কেবিন, চেয়ার ও সাধারণ ডেকে যেই সংখ্যক যাত্রী যাইতে পারে, তাহার অতিরিক্ত যাত্রী যাহাতে উঠানো না হয়, তাহা দেখভাল করিবার জন্য বিআইডব্লিউটিএর পরিদর্শকগণ রহিয়াছেন। তাহারা কি তাহাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করিতেছেন? দেখা যায়, মূল ঘাট হইতে লঞ্চ ছাড়িয়া দেওয়ার পর মাঝপথে অন্যান্য ঘাটেও যত্রতত্র যাত্রী উঠানো হয়। পরিদর্শকরা হয়তো বলিবেন, যাত্রীদের এত ভিড় যে তাহা সামাল দেওয়া কঠিন। তাহা হইলে দেখিতে হইবে কেন ভিড় হইতেছে এবং সাপ্লাই ও ডিমান্ডের সূত্র কেন কাজ করিতেছে না।
যদি যাত্রীদের চাহিদা অধিক থাকে, তাহা হইলে নূতন নূতন লঞ্চ সরবরাহ করা হইবে না কেন? নৌপরিবহন অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী আমাদের দেশে যাত্রীবাহী নৌযান (লঞ্চ) ও মালবাহী নৌযান রহিয়াছে যথাক্রমে ৮৩৯ ও ৪ হাজার ৮৮। শুধু সদরঘাট হইতে ৪৪টি নৌ-রুটে চলিতেছে ২২২টি লঞ্চ।
কিন্তু গত এক দশকে চাহিদা অনুযায়ী কি লঞ্চ বাড়িয়াছে? তাহা ছাড়া পৃথক পৃথক নৌ-রুটে যতগুলি লঞ্চ চলিবার অনুমতি দেওয়া হইয়াছে, বাস্তবে চলিতেছে তাহারও কম। যেমন—ঢাকা-বরিশাল রুটে ১৭টি লঞ্চ চলিবার কথা, নিয়মিত চলিতেছে ছয়-সাতটি। অনুরূপভাবে ঢাকা-ভোলায় ছয়টির মধ্যে চারটি এবং ঢাকা-ভাণ্ডারিয়ায় ৯টির স্থলে চারটি যাতায়াত করিতেছে। রোটেশন পদ্ধতির মারপ্যাঁচে পড়িয়া প্রয়োজন ও সক্ষমতার তুলনায় কম লঞ্চ চলিতেছে। ফলে যাত্রীদের ভিড় বাড়িতেছে।
কেবিন ভাড়া নেওয়ার জন্য যথারীতি তদবিরও করিতে হয় এখন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভাড়া নেওয়া হয় অতিরিক্ত ২০০-৩০০ টাকা। লঞ্চ মালিকগণ নূতন নূতন লঞ্চ আনয়নে বাধার সৃষ্টি করিতেছেন—এমন অভিযোগও উঠিয়াছে। অবশ্য লঞ্চ মালিকগণের সংগঠন অভ্যন্তরীণ নৌচলাচল সংস্থার সভাপতি সংবাদমাধ্যমকে জানাইয়াছেন যে, কোন রুটে কয়টি লঞ্চ চলিবে তাহার কোনো মাপকাঠি নাই। এই মাপকাঠি নির্ধারণ করিবার কথা বিআইডব্লিউটিএর।
কিন্তু তাহারা কি সেই কাজটি করিতেছে? লঞ্চে যাত্রীদের চাপ বৃদ্ধি পাইবার আরেকটি কারণ রহিয়াছে। আসলে প্রতিদিন কোন লঞ্চে কত যাত্রী যাইতেছেন তাহার কোনো সঠিক হিসাব নাই। ৩২টি লঞ্চ কাউন্টার যদি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়িয়া থাকে, তাহা হইলে কীভাবে হিসাব পাওয়া যাইবে? লঞ্চের মধ্যে ও চলন্ত অবস্থায় যাত্রীদের টিকিট দেওয়া হয় বলিয়া ইহা শুধু লঞ্চ পরিচালনাকারীরাই জানিতে পারেন। এই সকল অনিয়ম দূর করিয়া বাসের ন্যায় লঞ্চেও শৃঙ্খলা ফিরাইয়া আনা প্রয়োজন।
উন্নয়নশীল দেশে হাজারো সমস্যা থাকিবেই। কিন্তু সেই সমস্যা নিরসনের উদ্যোগ ও প্রচেষ্টাও থাকিতে হইবে। চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে যে ফারাক সৃষ্টি হইয়াছে তাহা দূর করিতে হইবে। দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলি ঋণসুবিধা লইয়া এই ক্ষেত্রে আগাইয়া আসিতে পারে। এই ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট মহল ও কতৃর্পক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা আবশ্যক।