চলতি বছরের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়েছে। পরীক্ষায় এবার গড়ে ৯৩ দশমিক ৫৮ শতাংশ পরীক্ষার্থী পাশ করেছে। যা গতবার ছিল ৮২ দশমিক ৮৭ শতাংশ। সে হিসাবে এবার পাশের হার বেড়েছে ১০ দশমিক ৭১ শতাংশ। এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় এবার পাশের হারে শীর্ষে রয়েছে ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডের শিক্ষার্থীরা। এই বোর্ডে ৯৭ দশমিক ৫২ শতাংশ শিক্ষার্থী পাশ করেছে।
প্রতিবারের মতো এবারও জিপিএ-৫-এ সবার ওপরে রয়েছে ঢাকা বোর্ডের শিক্ষার্থীরা। এ শিক্ষা বোর্ডের ৪৯ হাজার ৫৩০ জন শিক্ষার্থী পূর্ণ জিপিএ পেয়েছে। এবার এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে মোট ১ লাখ ৮৩ হাজার ৩৪০ জন পরীক্ষার্থী। গতবার জিপিএ-৫ পেয়েছিল ১ লাখ ৩৫ হাজার ৮৯৮ জন। এবার অন্যদিকে ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে শুধু এসএসসি পরীক্ষায় গড় পাশের হার ৯৪ দশমিক শূন্য ৮।
পাশের হার ও জিপিএ-৫-এর সংখ্যা বৃদ্ধিতে উচ্ছ্বাস বইছে স্কুলে স্কুলে। উচ্ছ্বসিত শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও তাদের অভিভাবকরা। স্কুলে উপস্হিত শিক্ষার্থীরা নেচে গেয়ে আনন্দ-উচ্ছ্বাস করে। বৃহস্পতিবার সকালে এ ফল প্রকাশ করা হয়। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলনকেন্দ্রে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিনা মূল্যে বই বিতরণের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়। পরে সংবাদ সম্মেলন করে বিস্তারিত তুলে ধরেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি।
এবারের ফলে পাশের হার বৃদ্ধির কারণ হিসাবে সংক্ষিপ্ত সিলেবাস ও তিনটি নৈর্বাচনিক পরীক্ষা থাকার বিষয়টির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, শিক্ষার্থীরা ফেল বেশি করে ইংরেজি ও গণিতে। কিন্তু এবার আবশ্যিক বিষয় ইংরেজি ও গণিতের পরীক্ষা দিতে হয়নি। এটাও পাশের হার বৃদ্ধির কারণ। এত সুবিধার পরও কেন ৬ শতাংশ শিক্ষার্থী ফেল করল এ বিষয়টি নিয়েও অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন। শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, এবার এসএসসিতে আবশ্যিক বিষয় বাংলা, ইংরেজি, সাধারণ গণিত, আইসিটি ও ধর্ম এবং চতুর্থ বিষয়ের পরীক্ষা হয়নি। শুধু তিনটি নৈর্বাচনিক বিষয়ে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। ফলে স্বাচ্ছন্দ্যে সময় নিয়ে চাপমুক্ত পরীক্ষায় অংশ নিতে পেরেছে।
তথ্য অনুযাযী, প্রতি বছর প্রতিটি বিষয়ে ৩ ঘণ্টা করে পরীক্ষা হলেও এবারে পরীক্ষা হয় দেড় ঘণ্টা সময়ে। বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের পদার্থ বিজ্ঞান, রসায়ন, উত্তর গণিত এবং জীববিজ্ঞানের পরীক্ষা হয়। প্রতিটি পরীক্ষায় রচনামূলক আটটি প্রশ্ন ছিল। সেখান থেকে মাত্র দুটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়। আর নৈর্ব্যত্তিকে ২০টি প্রশ্ন ছিল। সেখান থেকে উত্তর দিতে হয় মাত্র ১২টির। আর ব্যবসায় শিক্ষা ও মানবিকের হিসাববিজ্ঞান, ব্যবসায় উদ্যোগ, ফিন্যান্স ও ব্যাংকিং, বাংলাদেশের ইতিহাস ও বিশ্ব সভ্যতা, ভূগোল ও পরিবেশ, পৌরনীতি ও নাগরিকতা এবং অর্থনীতি বিষয়ে পরীক্ষা হয়। এসব বিষয়ে রচনামূলক ১১টি প্রশ্নের মধ্যে উত্তর দিতে হয় মাত্র ৩টির। নৈর্ব্যত্তিক ৩০টির মধ্যে ১৫টির উত্তর দিতে হয়। প্রশ্নের উত্তরের জন্য একাধিক বাছাইয়ের সুযোগও পেয়েছিল শিক্ষার্থীরা। এসব কারণে এবার পাশের হার গতবারের চেয়ে অনেক বেড়েছে।
জিপিএ-৫ এবং পাশের হার বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, এবার বিশেষ পরিস্হিতির কারণে সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে তিনটি বিষয়ে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। বাকি বিষয়গুলোর মূল্যায়ন অষ্টম শ্রেণির জেএসসি পরীক্ষার ওপর করা হয়েছে। সে কারণে হয়তো দুই সূচকে পাশের হার বেড়েছে। সংক্ষিপ্ত সিলেবাস ও এত সুবিধা থাকার পরও কেন ৬ শতাংশ শিক্ষার্থী ফেল করেছে এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। এ বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, যদি সকলকে কৃতকার্য করার মতো অবস্হায় নিয়ে যেতে পারি, সেটি আদর্শ হবে, তাই না? কিন্তু অনেকেরই অনেক রকমের প্রতিবন্ধকতা থাকে, অনেক সমস্যা থাকে। কেউ পরীক্ষার সময় অসুস্হ হয়ে যায়, ভয় পেয়ে যায়, আমরা নিজেরাও জীবনের অনেক দূর পার করে এসেছি, আমরা জানি পরীক্ষা সব সময় এক রকম হয় না। এমনকি ভালো পড়াশোনা করেছে, ভালো প্রস্ত্ততি ছিল। এরপরও অনেক সময় পরীক্ষা ভালো হয় না। এবার পরীক্ষার্থীর ব্যবহারিক খাতা (নোট বুক) এর নম্বর ছিল ২৫। বিজ্ঞান বিভাগের রচনামূলক ২০ নম্বরকে ৫০ এবং নৈর্ব্যত্তিকের ১২ নম্বরকে ২৫ নম্বরে এবং মানবিক ও ব্যবসা শিক্ষা বিভাগের পরীক্ষার্থীরে রচনামূলক ৩০ নম্বরকে ৭০ এবং নৈর্ব্যত্তিক ১৫ নম্বরকে ৩০ নম্বরে রূপান্তর করে প্রাপ্ত নম্বর নির্ধারণ করা হবে।
করোনা ভাইরাস মহামারির কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় নির্দিষ্ট সময়ের প্রায় ৯ মাস পর ১৪ নভেম্বর এসএসসি পরীক্ষা শুরু হয়। এর মাধ্যমে দেড় বছর পর প্রথম কোনো পাবলিক পরীক্ষায় বসে শিক্ষার্থীরা। সব বোর্ড মিলিয়ে এবার এসএসসি ও সমমানে মোট পরীক্ষার্থী ছিল ২২ লাখ ২৭ হাজার ১১৩ জন। এর মধ্য উত্তীর্ণ হয়েছে ২০ লাখ ৯৬ হাজার ৫৪৬ জন। কোন বোর্ডে কত পাশ ও জিপিএ-৫ ঢাকা বোর্ডে এবার পাশের হার ৯০ দশমিক ১৫ শতাংশ। এর মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৪৯ হাজার ৫০০ জন পরীক্ষার্থী। দিনাজপুর বোর্ডে পাশ করেছে ৯৪ দশমিক ৮০ শতাংশ পরীক্ষার্থী। তাদের মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৭ হাজার ৫৭৮ জন। ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডে পাশের হার ৯৭ দশমিক ৫২ শতাংশ, জিপিএ-৫ পেয়েছে ১০ হাজার ৯২ জন। যশোর বোর্ডে পাশের হার ৯৩ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ, জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৬ হাজার ৪৬১ জন পরীক্ষার্থী। এছাড়া বরিশাল বোর্ডে পাশের হার ৯০ দশমিক ১৯ শতাংশ, জিপিএ-৫ পেয়েছে ১০ হাজার ২১৯ জন পরীক্ষার্থী। রাজশাহীতে ৯৪ দশমিক ৭১ শতাংশ, কুমিল্লায় ৯৬ দশমিক ২৭ শতাংশ, চট্টগ্রামে ৯১ দশমিক ১২ শতাংশ ও সিলেট বোর্ডে ৯৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ শিক্ষার্থী পাশ করেছে। অন্যদিকে মাদ্রাসা বোর্ডে পাশের হার ৯৩ দশমিক ২২ শতাংশ, জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৪ হাজার ১১৩ জন। এছাড়া কারিগরিতে পাশের হার ৮৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ এবং সেখানে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৫ হাজার ১৮৭ জন পরীক্ষার্থী।