বছর জুড়েই আলোচনার শীর্ষে ছিল বিচারাঙ্গন। নানা রায় ও আদেশের মধ্য দিয়ে এই আলোচনায় ছিল রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ এ অঙ্গটি। সেই আলোচনার শীর্ষে ছিল দুর্নীতির মামলায় সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার দণ্ডিত হওয়া। দুদকের একটি মামলায় তাকে ১১ বছরের কারাণ্ড দেয় ঢাকার বিশেষ জজ আদালত। প্রধান বিচারপতির পদটি বিচার বিভাগের শীর্ষ পদ। সেই পদের একজন যাকে দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত হয়ে দণ্ডিত হতে হয়েছে।
এই রায় দেশ জুড়ে নানা আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। বনানী রেইনট্রি হোটেল ধর্ষণ মামলায় ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবু্যনাল-৭-এর বিচারক মোছাম্মাৎ কামরুন্নাহারের এক পর্যবেক্ষণ জন্ম দেয় ব্যাপক সমালোচনার। ঐ মামলার পাঁচ আসামিকে বেকসুর খালাস দেওয়ার রায়ের পর্যবেক্ষণে ঐ জজ বলেন, ‘৭২ ঘণ্টা পর যেন ধর্ষণের ঘটনায় মামলা নেওয়া না হয়।’ এই পর্যবেক্ষণ গণমাধ্যমে প্রকাশ পেলে প্রতিবাদে সরব হয় বিভিন্ন মহল। পরে প্রধান বিচারপতি তাৎক্ষণিকভাবে তাকে বিচার কাজ থেকে সরিয়ে দেন। তাকে আইন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়। বিভিন্ন মহলের তীব্র সমালোচনা ও প্রতিবাদের মুখে সেই পর্যবেক্ষণ লিখিত রায়ে স্থান দেননি কামরুন্নাহার। পরে তাকে ফৌজদারি মামলার বিচার কাজ থেকে সরিয়ে দিয়ে আদেশ প্রদান করে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ।
শীর্ষ আলোচিত এই দুটি ঘটনা ছাড়াও বছর জুড়েই বিভিন্ন খুনের মামলায় বিপুলসংখ্যক আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার রায় এসেছে অধস্তন আদালত থেকে। বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করেছিল বুয়েটেরই শিক্ষার্থীরা। তারা ছাত্রলীগের বুয়েট শাখার নেতাকর্মী ছিলেন। সেই মামলায় ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইবু্যনাল-১-এর বিচারক আবু জাফর মো. কামরুজ্জামান আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং পাঁচ জনকে যাবজ্জীবন সাজা প্রদান করেন। দৃষ্টান্তমূলক ঐ শাস্তি প্রদানের রায়কে সাধুবাদ জানিয়েছে সরকার। খোদ আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, অপরাধ করে যে পার পাওয়া যাবে না—এই রায় তার জ্বলন্ত উদাহরণ। অপরাধী যে দলেরই হোক তাদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না বলেও হুঁশিয়ারি দেন মন্ত্রী। শুধু আবরার হত্যা মামলাই নয়, সাভারের আমিনবাজারের বরদেশী গ্রামে ঢাকার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছয় শিক্ষার্থীকে পিটিয়ে হত্যার মামলায় ১৩ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয় ঢাকার আদালত।
যাবজ্জীবন দেওয়া হয়েছে ১৯ জনকে। মাদক মামলায় চিত্রনায়িকা পরীমনিকে তিন দফায় রিমান্ডে পাঠানোর ঘটনায় ঢাকার দুই ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে ব্যাখ্যা তলব করে হাইকোর্ট। সেই তলব আদেশ অনুযায়ী দুই ম্যাজিস্ট্রেট যে ব্যাখ্যা দেন তাতে সন্তুষ্ট হতে পারেনি হাইকোর্ট। ম্যাজিস্ট্রেটদের দেওয়া ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে হাইকোর্টের মন্তব্য ছিল, ‘রিমান্ড মঞ্জুরের ক্ষেত্রে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের বেঁধে দেওয়া নীতিমালা রয়েছে। সেই নীতিমালাকে উপেক্ষা করে পরীমনিকে অযৌক্তিকভাবে তিন দফায় রিমান্ডে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এই ঘটনায় ভুল স্বীকার না করে ম্যাজিস্ট্রেটরা যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন তাতে মনে হচ্ছে উনারা হাইকোর্টকে শেখাতে চান। এরপরই দ্বিতীয় দফায় তাদের পুনরায় ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়। সেই ব্যাখ্যায় ঢাকা মহানগর দুই হাকিম নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করে তাদের জবাব দাখিল করেন। আগামী বছর জানুয়ারি মাসে এ মামলার রায় দেওয়ার জন্য দিন ধার্য করে রেখেছে হাইকোর্ট।