দুই হাজার একুশ সাল শেষে আজ বাইশের প্রথম দিন| নতুন বছরে নতুন আশা—এমন গতানুগতিকতার পাট চুকে এখন নতুন হতাশা আর শঙ্কা সন্মুখ প্রান্তে| কারণ, অতিমারি করোনা ও করোনার নতুন ধরন ওমিক্রন, সঙ্গে নতুন বিপদ মূল্যস্ফীতি| শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্ব জুড়েই মূল্যস্ফীতি আর অতিমারি থমকে দিয়েছে অর্থনীতির বাড়ন্ত গতি| বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল কয়েক দিন আগেই বলেছেন, বাংলাদেশের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গিয়েছে।
বিশ্বব্যাংক বলেছে, ধনীদেশ ও উদীয়মান দেশগুলোতে মূল্যস্ফীতির প্রভাব বাড়বে| সেক্ষেত্রে নতুন বছরে প্রত্যাশার উচ্ছ্বাস নিবুনিবু| কোনো কোনো জরিপ বলেছে, বিশ্বপ্রবৃদ্ধির শ্লথগতি ২০২২-এ অব্যাহত থাকবে| কাটবে না সরবরাহ ব্যবস্থার সংকট| বরং ’২২-এর শেষে ধনীদেশে মন্দা বিপদ ডেকে আনতে পারে| যে কারণে, মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভকেও সুদের হার বাড়াতে আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে|
বিশ্ব অর্থনীতির এই প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিলে সহজেই অনুমেয় যে, গভীর হতাশায় শেষ হলো গেলো বছরটি| তবে ধনী দেশগুলো অর্থনীতি টিকিয়ে রাখার জন্য যে হারে প্রণোদনা দিয়েছে, কিংবা ভবিষ্যতেও দিয়ে যাবে—সেই রকম সক্ষমতা বাংলাদেশের নেই| এখানে ঋণসহায়তা দিয়ে কিছুটা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে| রপ্তানিতে কিছুটা বৃদ্ধির রেখাপাত দেখা গেলেও কাঁচামাল সংকট আগামী দিনগুলোতে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে| সরবরাহ ব্যবস্থায় বিপর্যয়, পণ্যমূল্য ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি সক্ষমতা বিনষ্ট করেছে| ফলে, ৩১ ডিসেম্বর শেষেও কিস্তি পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়েছে অধিকাংশ শিল্পউদ্যোক্তা-ব্যবসায়ী| অন্তত ছয়মাস সময় না বাড়ালে নতুন যে শঙ্কায় বছরটি শুরু হচ্ছে, তাতে উদ্যোক্তারা আরো বেশি নিরুপায় হয়ে পড়বেন| সেই সঙ্গে আটকা পড়বে ব্যাংক, ধাক্কা খাবে কর্মসংস্থান| ঘুরবে না কলের চাকা| অভ্যন্তরীণভাবে এই বাস্তবতার মধ্যে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এমন প্রশ্ন স্বাভাবিক যে, অর্থনীতি কি আগামী বছর ঘুরে দাঁড়াতে পারবে?
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এখন পর্যন্ত যত জরিপ বেরিয়েছে তাতে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির কথাই বলা হয়েছে। সঙ্গতকারণেই বাংলাদেশেও মূল্যস্ফীতি বাড়বে। তদুপরি, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সরকারের ব্যয়িত অর্থ মূল্যস্ফীতিকে উস্কে দেয়, এমনটি সবার জানা। জরিপগুলোতে বলা হয়েছে, ধনী দেশগুলো তাদের করোনার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে মরিয়া হবে। সরবরাহ ব্যবস্থায় বিপর্যয়ের কারণে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোকে কাঁচামাল আমদানিতে বেশি ব্যয় করতে হবে। যার প্রভাব পড়বে পণ্যমূল্যে। স্বাভাবিক ভাবেই মূল্যস্ফীতি বাড়বে ধনী-গরীব সব দেশেই।
কোন কোন জরিপে বলা হয়েছে, নতুন বছরে প্রবৃদ্ধিও কিছুটা বাড়বে। তবে ২০২২ এর তুলনায় ’২৩এ বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কিছুটা কমবে। তবে ৪ শতাংশের বেশি হারে অর্থনীতি বাড়বে না। এমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে সঠিক নীতিকৌশল আগেভাগেই নির্ধারণ করতে হবে। শুধু করোনার গাড়ে দোষ চাপিয়ে দিলে চলবে না। বরং বিশেষজ্ঞদের পরামর্শক্রমে নীতিকৌশল, জনবান্ধব ব্যয় বৃদ্ধি, ব্যবসায়-উদ্যোগ চালু রাখতে প্রয়োজনীয় আর্থিক সুবিধা, কর্মহীনদের জন্য ব্যয় পরিকল্পনা ও সহায়ক করকাঠামো আগেভাগেই নিশ্চিত করতে হবে। যেন দুর্দশা দীর্ঘস্থায়ী না হয়। মধ্যআয়ের পথে যাতে ব্যাঘাত না ঘটে।