দেশের পর্যটনের বিকাশে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে যখন নানা পরিকল্পনা বিস্তৃত হচ্ছে, তখনই দেশের অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র কক্সবাজারে বিশ্বের দীর্ঘ সমুদ্রসৈকতে ঘটে গেল বর্বরোচিত ঘটনা। দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে এই ঘটনা যে বার্তা দিয়েছে, তা পর্যটনের বিকাশে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে।
আমরা জানি, কক্সবাজারসহ দেশে অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর অনেক পর্যটনকেন্দ্র রয়েছে যেগুলোর দিকে পর্যটকদের রয়েছে বিশেষ আকর্ষণ। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, দেশের প্রতিটি পর্যটনকেন্দ্রেই অনেক সমস্যার পাশাপাশি নিরাপত্তাজনিত সমস্যা কী ভয়াবহভাবে জিইয়ে আছে ফের এরই নজির মিলল সম্প্রতি কক্সবাজার সৈকতে। এর আগে আমরা সংবাদমাধ্যমে দেখেছি দেশের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে পর্যটকদের নানা রকম বিড়ম্বনায় পড়ার খবর। সার্কভুক্ত দেশ ভারত, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপের মতো দেশও পর্যটনের বিকাশে কার্যকর ব্যবস্হা নিশ্চিত করে এই খাতটিকে শিল্প হিসেবে গড়ে তুলছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পর্যটনকেন্দ্রিক আয় জাতীয় অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, এ ক্ষেত্রে আমাদের অপার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আমরা তা কাজে লাগাতে পারছি না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অবকাঠামোগত কিংবা যোগাযোগসহ কিছু সমস্যা জিইয়ে থাকলেও নিরাপত্তাজনিত সমস্যা প্রায় সর্বত্রই বিরাজমান। এই পরিস্হিতিতে আমরা বিকশিত পর্যটন খাতের স্বপ্ন দেখি কী করে?
সম্প্রতি কক্সবাজারে সৈকতের লাবণী পয়েন্টে বেড়াতে যাওয়া সন্তানসহ দম্পতির ওপর দুর্বৃত্তের হামলে পড়ার যে ঘটনা ঘটেছে, তা সভ্যতা-মানবতার কলঙ্ক তো বটেই, কীভাবে এই সমাজ ক্রমাগত দুবৃর্ত্তদের চারণভূমি হয়ে উঠছে, এরও অনাকাঙ্ক্ষিত নজির মিলল।
নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার নারী বা পুরুষ যে-ই হোন না কেন, তার সামাজিক অবস্হান, পেশাগত পরিচয় ইত্যাদি কোনো কিছুই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিংবা সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কোনো মহলের কাছেই বিবেচ্য বিষয় না হয়ে ভিকটিম যথাযথ প্রতিকার পাবেন—এটাই খুব স্বাভাবিক প্রত্যাশা। কিন্তু অনভিপ্রেত হলেও সত্য, অনেক ক্ষেত্রেই আমরা এমনটি দেখি না। কক্সবাজারে ঐ ধর্ষিতার ক্ষেত্রেও দায়িত্বশীল কোনো কোনো মহলের পক্ষ থেকে যে দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ ঘটেছে, তা শুধু নিন্দনীয় নয়, বিস্ময়কর এবং প্রশ্নবোধকও! পুলিশ ও র্যাবের বক্তব্য পরস্পরবিরোধী। তাছাড়া এই মামলার বাদী নির্যাতিতার স্বামী ঢাকায় ফিরে সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, চাপে পড়ে তাকে বলতে হয়েছে শেখানো কথা!
নারী এখন আমাদের দেশে অবরোধবাসিনী নন তা বহুলাংশে সত্য হলেও এখনো নারীর নিরাপত্তাহীনতা যে প্রকটই রয়ে গেছে, এর অনেক নজিরও আমাদের সামনে রয়েছে। সাম্প্রতিককালে ধর্ষণ, সংঘবদ্ধ ধর্ষণ এবং ধর্ষণ-উত্তর হত্যার ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় সরকার ধর্ষকের চূড়ান্ত শাস্তির বিধান রেখে আইন প্রণয়ন করলেও কেন এ ধরনের ঘটনার রাশ টানা যাচ্ছে না—এ প্রশ্নের উত্তরও সচেতন মানুষমাত্রই জানা। এই পরিস্হিতিতে প্রশ্ন দাঁড়ায়— ব্যবস্হার উন্নয়ন না করে অবস্হা পরিবর্তনের আশা কি দুরাশার নামান্তর নয়!
সমাজে কারা দুষ্কর্ম করে বেড়ায় কিংবা জননিরাপত্তার জন্য হুমকি, তাদের পুলিশ বা অন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের না জানার কথা নয়। যে কোনো মামলা সাজানোর ক্ষেত্রে যদি গাফিলতি কিংবা ত্রুটি থাকে তাহলে আদালতে এর কাঙ্ক্ষিত ফল আশা করা যায় না। আদালত তো বিচার করবেন চার্জশিট ও সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে। যে কোনো অপরাধীর বিচার হয় মামলার তদন্েতর ওপর। কিন্তু এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ার নানা ক্ষেত্রে দেখা যায় বড় রকমের অসংগতি এবং এর ফলে অপরাধীদের স্বস্তি পাওয়ার পথ খুলে যায়। আর অন্য দিকে শান্িতপ্রিয় মানুষের নিরাপত্তাহীনতার কারণগুলো আরো বেশি প্রকট হয়ে ওঠে।
এমনটির দায় প্রথমত, পুলিশ একই সঙ্গে অন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও এড়াতে পারে না। আদর্শহীন রাজনৈতিক ও নীতিহীন প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের কারণে সমাজটা ক্রমাগত দুবৃর্ত্তদের অভয়ারণ্য হয়ে উঠছে। পৈশাচিকতা-বর্বরতার ছায়া বিস্তৃত হচ্ছে। সাধারণ মানুষের লালিত আকুতি— ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, রাজনীতির দুবৃর্ত্তায়ন জিইয়ে রেখে এর কোনোটিই কি নিশ্চিত করা সম্ভব। প্রশাসনের স্তরে স্তরে দায়িত্বশীলদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি সরিষার ভেতর লুকিয়ে থাকা ভূত তাড়ানোর ব্যবস্হা করতে হবে সর্বাগ্রে।
এই জরুরি বিষয়গুলো যে পর্যন্ত নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না, ততক্ষণ পর্যন্ত সার্বিক পরিস্হিতি শান্িতপ্রিয় মানুষের অনুকূলে আনা কঠিন হয়েই থাকবে। আমাদের ভাগ্য নিয়ন্ত্রকদের অনেকেই উন্নয়ন-অগ্রগতি কিংবা নানা সূচকে আমাদের অনেক ক্ষেত্রে ঊর্ধ্বগতির চিত্র তুলে ধরে আত্মতৃপ্তির ঢেঁকুর তোলেন। কিন্তু যে সমাজে এখনো মানুষের অধিকার, মানবিক মর্যাদা, নিরাপত্তা কিংবা জীবনের চলার পথে এত প্রতিকূলতা-প্রতিবন্ধকতা জিইয়ে আছে, সেখানে এত আত্মতৃপ্তির অবকাশ কতটা আছে? তাই নতুন বছরের প্রত্যাশা থাকবে, আগামী দিনগুলোতে এ সব অবক্ষয় থেকে মুক্ত হবে দেশ। একদিনে না হলেও শুরুটা খুবই জরুরি। বিগত দিনের অনেক সমস্যা কেটে গেলেও অনেক সমস্যা রয়ে গেছে। সেই সমস্যা খানিকটা হলেও কাটিয়ে উঠতে যেন দেশের কর্তারা সচেষ্ট থাকেন—এটাই প্রত্যাশা।
লেখক : নিবন্ধকার।
ইত্তেফাক/বিএএফ