করোনায় উত্থান-পতনের শেয়ারবাজার

বিদায়ী বছরে করোনা ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে লকডাউনের মধ্যেও ব্যাংকিং কার্যক্রমের সঙ্গে সংগতি রেখে দেশের পুঁজিবাজার চালু থাকে। করোনা অতিমারীর মধ্যেও দীর্ঘ এক দশক পর প্রতিদিনই নিত্য নতুন রেকর্ড গড়ে শেয়ারবাজার। প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তি পর্যায়ের সব ধরনের বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ায় প্রধান শেয়ারবাজারের লেনদেন বিগত ১০ বছরে সর্বোচ্চ স্থানে পৌঁছে। একইভাবে লেনদেনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সার্বিক সূচক। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) গত বছর বছর প্রযুক্তিগত সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে ছয়টি কোম্পানি নিয়ে স্মল ক্যাপিটাল প্ল্যাটফরমে লেনদেনের সূচনা হয়েছে।

পুঁজিবাজারে আলোচিত ওভার দি কাউন্টার মার্কেট বিলুপ্তির মাধ্যমে ওটিসি মার্কেটের ১৮টি কোম্পানি, ১৪টি বন্ড এবং বেশ কিছু ওপেন অ্যান্ড মিউচুয়াল ফান্ড তালিকাভুক্তির মাধ্যমে অলটারনেটিভ ট্রেডিং বোর্ড (এটিবি) চালু করার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে জানায়। একটি উন্নত ও কার্যকর বন্ড মার্কেট প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ইতিমধ্যেই বহুল প্রতীক্ষিত গভর্নমেন্ট ট্রেজারি বন্ডের পরীক্ষামূলক লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে। বিদায়ী বছরের অর্জন সম্পর্কে ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারিক আমিন ভূইয়া বলেন, দীর্ঘ এক দশক পর নতুন এক রেকর্ড সৃষ্টি করেছে দেশের শেয়ারবাজার। ডিএসইর ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ লেনদেন। লেনদেনের পাশাপাশি অনেকগুলো কার্যক্রম বাস্তবায়িত হয়েছে। আর বেশ কিছু কার্যক্রম বিশেষ করে নতুন প্রোডাক্ট ইটিএফ চালু নতুন বছরের শুরুর দিকেই বাস্তবায়িত হবে বলে আমি আশাবাদী। আমরা ভালো মৌলভিত্তি সম্পন্ন কোম্পানিগুলোকে তালিকাভুক্তির জন্য দেশের শীর্ষস্থানীয় গ্রুপ অব কোম্পানিজের চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক শুরু করেছি। বিশেষ করে আইটি স্টাটআপ কোম্পানিগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে এসএমই মার্কেটকে আরো গতিশীল করা হবে। এছাড়াও প্রযুক্তিগত ও আইনগত সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে নতুন বছরের প্রথমার্ধেই আমরা বিদেশি বিনিয়োগ আনার চেষ্টা করব।

২০২১ সালের বাজারচিত্র :বিদায়ী বছরে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হলো।

আইপিও: শিল্প উদ্যোক্তারা ২০২১ সালে প্রথমবারের একটি সুকুক বন্ড ও ১৪টি কোম্পানিসহ মোট ১৫টি কোম্পানি বাজার থেকে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওর মাধ্যমে ১৬৫৮ কোটি ৪৪ লাখ টাকা মূলধন সংগ্রহ করে। এর মধ্যে তিনটি কোম্পানি প্রিমিয়াম বাবদ ২৯৭ কোটি ৭৩ টাকা মূলধন উত্তোলন করে। এছাড়াও চারটি প্রতিষ্ঠান বন্ড ইসু্যর মাধ্যমে ২০০ কোটি টাকা মূলধন সংগ্রহ করে। অপরদিকে ২০২০ সালে আটটি কোম্পানি প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওর মাধ্যমে মোট ৯৮৫ কোটি ৮৭ লাখ টাকা মূলধন সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্যে তিনটি কোম্পানি প্রিমিয়াম বাবদ ৩১১ কোটি টাকা মূলধন উত্তোলন করে।

লেনদেন পরিস্থিতি: ২০২১ সালে ডিএসইতে ২৪০ কার্যদিবস লেনদেন হয়। এতে মোট লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩ লাখ ৫৪ হাজার ৫২ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। যা ডিএসইর ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ লেনদেন এবং আগের বছরের চেয়ে ২ লাখ ১৯ হাজার ৭১ কোটি ৬৪ লাখ টাকা বা ১৬২ দশমিক ৩০ শতাংশ বেশি। যার গড় লেনদেন ১৪৭৫ কোটি ২২ লাখ টাকা। অপরদিকে ২০২০ সালে ২০৮ কার্যদিবসে মোট লেনদেনের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৩৪ হাজার ৯৮১ কোটি ২২ লাখ টাকা এবং গড়ে লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৬৪৮ কোটি ৯৫ লাখ টাকা।

ডিএসইর মূল্যসূচক সমূহ: ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল্যসূচক ডিএসই ব্রড ইনডেক্স (ডিএসইএক্স) আগের বছরের চেয়ে ১ হাজার ৩৫৪ দশমিক ৫৯ পয়েন্ট বা ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৬ হাজার ৭৫৬ দশমিক ৬৬ পয়েন্টে উন্নীত হয়। ২০২১ সালে ডিএসইএক্স মূল্য সূচক সর্বোচ্চ ৭ হাজার ৩৬৮ পয়েন্টে উন্নীত হয় এবং সর্বনিম্ন ছিল ৫০৪৪ দশমিক ৯৯ পয়েন্ট। ২০১৩ সালের ২৮ জানুয়ারি ৪,০৯০.৪৭ পয়েন্ট নিয়ে এ সূচকের যাত্রা শুরু হয়।

অন্যদিকে ডিএসই ৩০ সূচক (ডিএস৩০) ৫৬৮ পয়েন্ট বা ২৮ দশমিক ৯৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২৫৩২ দশমিক ৫৮ পয়েন্টে দাঁড়ায়। ২০২১ সালে ডিএস৩০ মূল্যসূচক সর্বোচ্চ ২৭৮৭ দশমিক ৮২ পয়েন্টে উন্নীত হয় এবং সর্বনিম্ন ছিল ১৯০১ দশমিক ১৩ পয়েন্ট। ২০১৩ সালের ২৮ জানুয়ারি ১ হাজর ৪৭৩ পয়েন্ট নিয়ে এ সূচকের যাত্রা শুরু হয়। এছাড়া ২০২১ সালে ডিএসইএক্স শরিয়াহ্ সূচক (ডিএসইএস) ১৮৯ পয়েন্ট বা ১৫ দশমিক ২২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১ হাজার ৪৩১ দশমিক ১২ পয়েন্টে উন্নীত হয়। ২০২১ সালে ডিএসইএস মূল্যসূচক সর্বোচ্চ ১৬০০ দশমিক ২৬ পয়েন্টে উন্নীত হয় এবং সর্বনিম্ন ছিল ১১৬৬ দশমিক ১৭ পয়েন্ট। ২০১৪ সালের ২০ জানুয়ারি ৯৪১ দশমিক ২৮ পয়েন্ট নিয়ে এ সূচকের যাত্রা শুরু হয়।

বাজার মূলধন: ২০২১ সালে বাজার মূলধন ডিএসইর ইতিহাসে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। ডিএসই বাজার মূলধন আগের বছরের তুলনায় ৯৩ হাজার ৯৬৬ কোটি টাকা বা ২০ দশমিক ৯৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৫ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হয়। ২০২১ সালে বাজার মূলধন সর্বোচ্চ ৫ লাখ ৮৬ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হয় এবং সর্বনিম্ন ছিল ৪ লাখ ৪৩ হাজার কোটি।

মার্কেট পিই: ২০২১ সালের শেষে ডিএসইর তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজ সমূহের মূল্য আয় অনুপাত বা মার্কেট পিই দাঁড়ায় ১৭ দশমিক ৫৮। খাতওয়ারী সর্বনিম্ন অবস্থানের দিক থেকে মূল্য আয় অনুপাত বা মার্কেট পিই ছিল মিউচুয়াল ফান্ডের, যার মার্কেট পিই ৩ দশমিক ৯১, ব্যাংকিং খাতের মার্কেট পিই ৯ দশমিক ৭২, জ্বালানি ও বিদু্যত্ খাতের ১৩ দশমিক ১৯, টেলিকমিউনিকেশন খাতের মার্কেট পিই ১৬ দশমিক ৯২, ফার্মাসিউটিক্যালস অ্যান্ড কেমিক্যালস খাতের মার্কেট পিই ২০ দশমিক ৭৭, টেক্সটাইল খাতের মার্কেট পিই ২১ দশমিক ৬৫, প্রকৌশল খাতের মার্কেট পিই ২৩ দশমিক ৭০, আর্থিক খাতের পিই ২৪ দশমিক ৯৭, সিমেন্ট খাতের মার্কেট পিই ২৬ দশমিক ৪৭, সার্ভিসেস অ্যান্ড রিয়েল এস্টেট খাতের মার্কেট পিই ২৬ দশমিক ৯২, ইনসিওরেন্স খাতের মার্কেট পিই ২৮ দশমিক ১৩, ফুড অ্যান্ড অ্যালাইড প্রোডাক্ট খাতের মার্কেট পিই ৩১ দশমিক ২১, আইটি-খাতের মার্কেট পিই ৩৩ দশমিক শূন্য ৫, বিবিধ খাতের মার্কেট পিই ৫৫ দশমিক ৯৩, ট্রাভেল অ্যান্ড লেইজার ৬০ দশমিক ৫৮, সিরামিক খাতের মার্কেট পিই ৬৭ দশমিক ৩৪, জুট খাতের মার্কেট পিই ৭১ দশমিক ২২, পেপার অ্যান্ড প্রিন্টিং খাতের মার্কেট পিই ৮০ দশমিক ৭২ এবং ট্যানারি খাতের মার্কেট পিই ৮৮ দশমিক ১৯। অপরদিকে ২০২০ সালের শেষে সামগ্রিক বাজার মূল্য আয় অনুপাত বা মার্কেট পিই ছিল ১৬ দশমিক ৫১।

মার্কেট ক্যাপিটালাইজেশন টু জিডিপির অনুপাত: ডিএসই ২০২১ সালে তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজ সমূহের মার্কেট ক্যাপিটালাইজেশন টু জিডিপির অনুপাত দাঁড়ায় ১৮ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ।