ব্যাংক ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময়সীমা বাড়ানো হউক

দৈনন্দিন জীবনযাপন যেন ক্রমেই কঠিনতর হইয়া উঠিতেছে। বিশ্বব্যাপী পরিস্থিতি একই রকম। করোনার কারণে এমন এক জায়গায় গিয়া ঠেকিয়াছে, কবে যে উদ্ধার হইবে মানুষের তাহা অজানা। 

বরং করোনার নূতন ধরন নূতন শঙ্কার সৃষ্টি করিয়াছে। ব্যবসায়-বাণিজ্যে অতলান্তিক দুঃসময়ে দাঁড়াইয়া আগামীর পথচলা যে বন্ধুর হইবে—তাহা অস্বীকার করিবার জো নাই। সামাজিক ও বাণিজ্যিক খাতে যে আবহ দেখা দিয়াছে, তাহাতে পরিস্থিতি কোন দিকে গড়াইবে বলা মুশকিল। কাহারো কাহারো আশঙ্কা, নৈরাজ্যের পথেই যেন হাঁটিতেছে বিশ্ব। 

সেই নৈরাজ্যের ফল কোনো কোনো দেশে এমন বিরূপ প্রভাব ফেলিতে পারে যে, সরকার পরিবর্তনের মতন ঘটনাও ঘটিয়া যাইতে পারে। কারণ, দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়া গেলে কিংবা সর্বহারাদের আর হারাইবার কীই-বা থাকে-এমন পরিস্থিতি নৈরাজ্য বিস্তারে সহায়ক।

নূতন বত্সরের শুরুতেই এমন আশঙ্কা আদৌ অমূলক নহে, যখন ব্যবসায়-বাণিজ্যে স্থবিরতা বিরাজ করিতেছে। করোনা আসিয়া বাংলাদেশসহ সমগ্র বিশ্ব বাণিজ্যকেই ওলটপালট করিয়া দিয়াছে। কঠোর লকডাউন খুলিবার পর পণ্য মূল্য, কাঁচামালের মূল্য কিংবা জাহাজ ভাড়া যেই হারে বাড়িয়াছে, তাহাতে ব্যবসায় টিকিয়া থাকা কষ্টকরই বটে। 

করোনার নূতন ধরন ওমিক্রন শনাক্ত হইবার পর ইতিমধ্যেই সকল বন্ধের উপক্রম হইয়াছে। হাজার হাজার উড়োজাহাজ গ্রাউন্ডেড করা হইয়াছে। কাঁচামালের সংকটে পণ্য উত্পাদন ব্যবস্থায় বিপর্যয় নামিয়া আসিয়াছে। ভয়াবহতা আঁচ করিয়া অনেকেই আগাম সতর্ক হইতেছে। অপরদিকে বাড়িতেছে মূল্যস্ফীতি। দরদাম বাড়াইয়া বাজারকে সাধারণের নাগালের বাইরে লইয়া গেলে সেই পরিস্থিতি কতটা ভয়ানক হইতে পারে—তাহা সহজেই অনুমেয়। 

কারণ, ব্যবসায় বন্ধ হইয়া ইতিমধ্যে অনেকেই চাকুরিহীন হইয়াছে। এখন আবার যদি আরও অধিক হারে কলের চাকা বন্ধ হইয়া যায়, তাহা হইলে সেই সকল কর্মহীনের চাপ সামলাইবার প্রস্তুতি কি সমাজগুলির রহিয়াছে? অধিকাংশ দেশই এই চাপ সামলাইতে পারিবে না। সম্ভাব্য নৈরাজ্য তো হইবে বিদ্যমান পরিস্থিতিরই পরম্পরা। তাহা হইলে আমরাও কি সেই দিকেই যাইব, নাকি উত্তরণে কর্মকৌশল ঠিক করিয়া নেতিবাচক পরিস্থিতিকে সামলাইয়া অর্থনীতির বাড়ন্ত গতির পথে হাঁটিব?

উত্তর যদি ইতিবাচক হয়, তাহা হইলে কর্মমুখী পদক্ষেপ জরুরি। কর্মসংস্থান বাড়াইতে হইবে। বিদ্যমান কলকারখানা চালু রাখিতে হইবে। সেই অনুযায়ী নীতি গ্রহণ করিতে হইবে। সেই কারণে ব্যবসায়ীরা দাবি তুলিয়াছেন ব্যাংকের ঋণের কিস্তি শোধের সময় আগামী জুন পর্যন্ত বাড়াইয়া দিতে। আমরা বলি, ছয় মাস নয়, আরো এক বত্সর বাড়ানো উচিত। 

এর যুক্তিও আছে। গত দুই বত্সর ধরিয়া চলিয়া আসা ব্যবসায়-বাণিজ্যের স্থবিরতা এখনো কাটাইয়া উঠা সম্ভব হয় নাই। যতক্ষণ স্বাভাবিক গতি না আসিবে, ততক্ষণ নীতি-সহায়তা দিয়া যাইতে হইবে। কারণ, এই সহায়তা শুধু ব্যক্তিবিশেষের জন্য নহে। ব্যবসায়-বাণিজ্যের স্বার্থে তথা সার্বিক অর্থনীতির স্বার্থে। কিস্তি পরিশোধের সময় বাড়াইতে ব্যবসায়ীরা প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করিয়াছেন। 

ঋণ বা সুদ মাফ তাহারা চাহেন না, শুধু পরিস্থিতি বিবেচনায় সময় বাড়াইবার এই যৌক্তিক দাবি গ্রহণযোগ্য বলিয়াই আমরা মনে করি। তাহা না হইলে শুধু ব্যবসায় বন্ধ হইবে না, বরং ব্যাংকগুলিও আটকা পড়িবে। ব্যবসায়-বাণিজ্যকে আটকাইয়া দেশের অগ্রগতি হইবে না। তাই আমরা আশাবাদী, ব্যাংক ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময়সীমা বাড়াইবার নির্দেশনাটি অবিলম্বেই জারি হইবে।