নদী বাঁচিলে বাংলাদেশ বাঁচিবে

বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ, নদীই তাহার অফুরন্ত প্রাণশক্তির উত্স। কিন্তু নদীমাতৃক দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য আজ ক্রমশ ম্লান হইয়া যাইতেছে। একশ্রেণির লোভী ও বিবেক-বুদ্ধিহীন মানুষের দখলবাজি, সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নির্লিপ্ততা ও নাগরিক সচেতনতার অভাবে আমাদের অনেক নদ-নদীর অস্তিত্ব কেবল দলিলে আছে, বাস্তবে নাই। গবেষকরা বলিতেছেন, প্রতি বত্সর গড়ে দশটি নদী তাহার অস্তিত্ব হারাইতেছে। ইতোমধ্যে দখল ও দূষণের কারণে হারাইয়া গিয়াছে ২৫টি নদী। বর্তমানে বিপন্ন নদীর সংখ্যা ১৭৪টি। তন্মধ্যে ১১৭টি নদীর মরণদশা ঘনাইয়া আসিয়াছে। বিশেষ করিয়া এই মুহূর্তে ৩৭টি নদী অধিক দখল-দূষণের শিকার যাহার তালিকা সমপ্রতি প্রকাশিত হইয়াছে ইত্তেফাকের এক প্রতিবেদনে। নদনদীর এই বিপন্নদশার কারণে বাংলাদেশ নামক বদ্বীপটির কৃষি, যোগাযোগ, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, মানুষের জীবনযাত্রা সর্বোপরি ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি সবকিছুই ভয়াবহভাবে হুমকির সম্মুখীন হইয়াছে। এই অবস্থায় মহামান্য হাইকোর্ট কর্তৃক নির্দেশ দেওয়ার পর প্রশাসন নদ-নদীগুলিকে অবৈধ দখলমুক্ত করিতে সারাদেশে বড় ধরনের উচ্ছেদ অভিযান শুরু করিয়াছে। একইসঙ্গে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি ৬৪ জেলায় একযোগে অবৈধ নদী দখলদারদের তালিকা প্রকাশের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিয়াছে। এই তালিকায় নদী দূষণকারীদের নামও থাকিবে এবং জনসচেতনতা ও প্রতিবাদের অংশ হিসাবে তাহা উন্মুক্ত স্থানে টাঙ্গাইয়া দেওয়া হইবে। আমরা এইসব উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। একইসঙ্গে আমরা মনে করি, যাহারা দখল-দূষণের মাধ্যমে নদী হত্যা করিতেছে, তাহাদের বিরুদ্ধে তদন্তসাপেক্ষে কঠোর ব্যবস্থাও গ্রহণ করা উচিত।

নদী রক্ষায় সরকারের গৃহীত এই পদক্ষেপগুলির মধ্যে জনগণের অভিপ্রায়ের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়াছে। পত্র-পত্রিকার খবরে বলা হইয়াছে যে, বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ নদীর তীর হইতে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের জন্য যেসব কর্মকর্তা কাজ করিতেছিলেন, তাহারা প্রভাবশালীদের তদবিরের কারণে চাপে পড়িয়াছেন। আমরা মনে করি, সরকার ও রাষ্ট্রের চাইতে কোনো ব্যক্তি বা মহল শক্তিশালী নহেন। অতএব, সরকার যেন কোনো অবস্থাতেই পিছু হটিয়া না আসে তাহাই আমাদের প্রত্যাশা। আমাদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় নদ-নদীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই বিবেচনায় বর্তমানে অনেক নদীর ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের কাজ চলিতেছে। তবে ইহার পাশাপাশি দখল ও দূষণের হাত হইতেও নদীগুলিকে রক্ষা করা দরকার। আমাদের নদ-নদীগুলি রক্ষায় জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সীমাবদ্ধতাগুলি অবিলম্বে দূর করিতে হইবে। ইহার প্রশাসনিক মন্ত্রণালয় দ্রুত ঠিক করা প্রয়োজন। প্রয়োজন নাগরিক ও শিল্পবর্জ্যের দূষণ বন্ধ করা। অপরিকল্পিত বাঁধ ও স্লুইস গেট নির্মাণও বন্ধ করিতে হইবে। বিভিন্ন বিপন্ন নদীর ভূমি পুনরুদ্ধার, তীর নির্ধারণ, সংরক্ষণ ও সার্বিক উন্নয়নে মনোনিবেশ করিতে হইবে। সংরক্ষণ করিতে হইবে নৌপথগুলি। নদী বাঁচিলে বাংলাদেশ বাঁচিবে এবং এই নদী বাঁচাইতে আদালতের ১২ দফা নির্দেশনা মানিয়া চলা বাঞ্ছনীয়। বিশেষত নদী বেদখলমুক্ত করিবার পর নদীর পাড়ে দ্রুত ওয়াকওয়ে নির্মাণ, বনায়ন, পাড় বাঁধানো, পিলার স্থাপনের মাধ্যমে সীমানা নির্ধারণ ইত্যাদি কাজ না করিলে উচ্ছেদ অভিযান টেকসই হইবে না। এইজন্য বিআইডব্লিউটিএ, পরিবেশ অধিদপ্তর, ভূমি মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলিকে সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করিতে হইবে।