ক্রাইম জোন আশুলিয়া

রাজধানীর উপকণ্ঠ আশুলিয়ায় হঠাৎ করেই বেড়ে গেছে অপরাধ। বর্তমানে এই এলাকাটিকে বলা হচ্ছে ক্রাইম জোন। বাসের মধ্যে সর্বস্ব কেড়ে নিয়ে মেয়েকে হত্যা, বাবাকে রাস্তায় নিক্ষেপ; এক তরুণকে সাত টুকরো করে ফেলে রাখা হয় এই আশুলিয়াতেই। আর চুরি, ডাকাতি, চাঁদাবাজি তো আছেই। ফলে ওই এলাকায় এক আতঙ্কজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। 

 

জানা গেছে, ছোট বড় মিলিয়ে আটশ’র বেশি গার্মেন্টস রয়েছে আশুলিয়ায়। রয়েছে বেশ কিছু কলকারখানাও। ৫০ লাখেরও বেশি মানুষের বসবাস এই শিল্পাঞ্চল এলাকায়। ফলে পুরো এলাকাটি অরক্ষিত হয়ে পড়েছে। রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রছায়ায় এখানে চাঁদাবাজি নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা। 

 

ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন ইত্তেফাককে বলেন, সামপ্রতিক সময়ে কিছু অপরাধ হয়তো বেড়েছে। কিন্তু কোন অপরাধীই পার পাচ্ছে না। বাবাকে বাস থেকে নিক্ষেপ করে মেয়েকে হত্যার ঘটনায় অপরাধীরা শনাক্ত হয়েছে, গ্রেফতারও হয়েছে। এমনকি সাত টুকরো লাশের পরিচয় নিশ্চিত এবং অপরাধীদের শনাক্ত করা হয়েছে। কয়েকটি ডাকাত দলের সদস্য গ্রেফতার হয়েছে। চাঁদাবাজিও নিয়ন্ত্রণে আছে। 

 

তবে আশুলিয়ায় বসবাস করা সাধারণ মানুষ প্রশ্ন তুলেছেন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে। চুরি, ডাকাতি, খুন, ছিনতাই, অজ্ঞাত লাশ উদ্ধার, ধর্ষণ, হত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধের জনপদে পরিণত হয়েছে এ শিল্পাঞ্চলটি। এতে এলাকার মানুষের মধ্যে চাপা আতঙ্ক রয়েছে। গত কয়েক মাসে ক্রমাগত চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, গোলাগুলি, হত্যা, অজ্ঞাত ও ঝুলন্ত লাশ উদ্ধারের ঘটনায় যেন ক্রাইম জোনে পরিণত হয়েছে এলাকাটি। গত সোমবার আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুর পূর্বপাড়া থেকে পলিথিনের ব্যাগে মোড়ানো অবস্থায় মস্তকবিহীন সাত টুকরো লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। অজ্ঞাত লাশটির পরিচয় নিশ্চিত করার পর অপরাধীদের শনাক্ত করে পুলিশ। তবে অপরাধীদের পরিচয় প্রকাশ করেনি পুলিশ। নিহত ব্যক্তি একটি গার্মেন্টসে কাজ করতেন।

 

একইদিন দুপুরে বাড়ইপাড়া থেকে শ্যামলী খাতুন (২৫) নামের এক গৃহবধূ ও গোমাইল বাংলাবাজার এলাকা থেকে ফুলমতি আক্তার (১০) নামের এক শিশুর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়।

 

৫ নভেম্বর পলাশবাড়ি নামাবাজার এলাকা থেকে স্থানীয় শাহিন পাবলিক স্কুলের ৬ষ্ঠ শ্রেণির এক ছাত্রীকে কৌশলে অপহরণ করা হয়। গত শনিবার পুলিশ তাকে পাবনা থেকে উদ্ধার করেছে। 

 

গত রবিবার ভোররাতে আশুলিয়ার দুর্গাপুর সরকার বাড়িতে ১০/১৫ জন সশস্ত্র ডাকাত গ্রিল কেটে বাড়িতে প্রবেশ করে গৃহকর্তা আবুল হোসেন সরকারকে (৫৫) গুলি করে। ডাকাতরা স্বর্ণালঙ্কার, নগদ টাকা এবং ব্যবসায়ীর লাইসেন্সকৃত বন্দুক লুট করে নিয়ে যায়। পরে গুলিবিদ্ধ আবুল হোসেনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। 

 

একদিন পর সোমবার ভোর রাতে আশুলিয়ার ইস্টার্ন হাউজিং সংলগ্ন চালা এলাকায় বেশ কয়েকটি চলন্ত গাড়ি থামিয়ে ডাকাতরা চালক ও যাত্রীদের মোবাইল ফোন, টাকাসহ মূল্যবান মালামাল লুট করে। 

 

এসব ঘটনায় আতঙ্কিত এলাকাবাসী রাত জেগে বাড়ি পাহারা দিচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, এলাকায় বিভিন্ন অপরাধের সাথে জড়িত ব্যক্তি, চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে পুলিশের সামনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। থানার ভিতরে-বাইরে এক শ্রেণির দালাল সারাক্ষণ ঘুরে বেড়ায়। অপরাধের শিকার ভুক্তভোগীরা থানায় গিয়ে প্রতিকারের বদলে বিড়ম্বনা এবং হয়রানির শিকার হচ্ছেন। অসহায় সাধারণ মানুষকে পুলিশ পাত্তাই দিতে চায় না। এমনকি একই রাতে একই এলাকার একাধিক বাড়িতে ডাকাতি হচ্ছে। 

 

গত ১০ নভেম্বর রাতে পলাশবাড়ি এলাকায় বড় ভাই আবু তাহেরকে কুপিয়ে হত্যা করে থানায় আত্মসমর্পণ করে ছোট ভাই জাহিদুর রহমান।

 

৯ নভেম্বর আশুলিয়ার চলন্ত বাসে এক বৃদ্ধকে মারধর শেষে ফেলে দিয়ে তার মেয়েকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে বাসের চালক, সুপারভাইজার এবং হেলপার। আশুলিয়ার সবচেয়ে অপরাধপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত মরাগাং থেকে জরিনা বেগমের (৪৫) লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

 

অভিযোগ রয়েছে, আশুলিয়া-আব্দুল্লাহপুর সড়কটির মরাগাং এলাকার তিন কিলোমিটার রাস্তার দু’পাশের ঝোপঝাড় ও জলাভূমি থাকায় অপরাধীরা ওত পেতে থেকে সড়কে ডাকাতি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করে নির্বিঘ্নে। এই সড়কে চলাচলকারী গাড়ি চালকদের অভিযোগ, রাত ১০টার পর এ সড়কে পুলিশি কোন টহল চোখে পড়ে না। এ সড়কে চেকপোস্ট বসানোর দাবিও দীর্ঘদিনের। ইতিপূর্বে একাধিক হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট থানায় মামলা হলেও অধিকাংশ মামলায়ই কোন আসামি গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। এমনকি হত্যাকাণ্ডের ক্লুও পাওয়া যায় না। একটি মামলার তদন্ত না করতেই আরেকটি লাশ পড়ে। ফলে পুলিশ একটি মামলা শেষ না করতেই আরেকটির তদন্তে নামে। এভাবেই মামলা জটে ধামাচাপা পড়ে যায় চাঞ্চল্যকর রহস্যময় হত্যাকাণ্ড। ফলে ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে পার পেয়ে আরো হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করতে উত্সাহিত হয় হত্যাকারীরা। এদের অনেকেই বাইরের অপরাধী বলে জানা যায়। 

 

আশুলিয়া শিল্প অঞ্চল হওয়ার কারণে শ্রমিকবেশে অনেক বহিরাগত সন্ত্রাসী এ অঞ্চলে আত্মগোপনে রয়েছে। ফলে বেশিরভাগ অপরাধী বহিরাগত হওয়ায় তারা বিভিন্ন অপরাধ সংঘটিত করলেও রয়েছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ধরাছোঁয়ার বাইরে। এসব সন্ত্রাসীরা বিভিন্ন পেশার আড়ালে তাদের অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে নির্বিঘ্নে। 

 

ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শাহ মিজান শাফিউর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, ‘কিছু ঘটনা এর মধ্যে ঘটে গেছে। কিন্তু একটি ঘটনাও এখন আর অনুদঘাটিত নেই। সবগুলো অপরাধের রহস্য উদঘাটন হয়েছে। অপরাধীরাও ধরা পড়েছে। আমরা পুরো এলাকাটি সিসিটিভির আওতায় আনার চেষ্টা করছি। আসলে আশুলিয়া এলাকায় প্রচুর শ্রমিক থাকার কারণে বাইরের অপরাধীরা খুব সহজেই তাদের সঙ্গে মিশে যেতে পারে। আবার অনেকে অপরাধ করে দ্রুত এলাকা ছেড়ে চলে যায়। তবে সমপ্রতি আমরা টাঙ্গাইল থেকে একটি ডাকাত গ্রুপকে গ্রেফতার করেছি। পাশাপাশি সবগুলো ঘটনার অপরাধী গ্রেফতার হচ্ছে। আমাদের নজরদারিও বেড়েছে। আশা করছি, এখন আর ওই এলাকায় তেমন কোন অপরাধ সংঘটনের সুযোগ পাবে না অপরাধীরা।’ 

 

 

ইত্তেফাক/ইউবি