নূতন সংকটে চোখ-কান খোলা রাখিতে হইবে 

প্রায় দুই বৎসর ধরিয়া আমরা করোনা মহামারির ক্ষতি বহন করিয়া চলিয়াছি। অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক হিসাব অনুযায়ী কেবল ২০২০ সালে করোনার কারণে আমাদের প্রায় ৮৫ হাজার কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হইয়াছে। অনুমেয়, গত বৎসর এই ক্ষতি আরো অধিক হইয়াছে। আমরা যখন কিছুটা উন্নতির দিকে যাইতেছিলাম, তখন করোনার নূতন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রন আঘাত হানিয়াছে সমগ্র বিশ্বে। ইহাতে তৈরি হইয়াছে নূতন উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা। পরিস্থিতির অবনতি হইলে দেশে আবার লকডাউন দেওয়ার চিন্তাভাবনা আছে বলিয়া গতকাল জানাইয়াছেন স্বাস্হ্যমন্ত্রী। এমনিতেই ইহার আগে যে ক্ষতি হইয়াছে তাহা আমরা এখনো কাটাইয়া উঠিতে পারি নাই। তাহার উপর নূতন করিয়া লকডাউন আসিলে পরিস্থিতি কোথায় গিয়া দাঁড়াইবে তাহা সহজেই অনুমেয়। যাহারা নীতিনির্ধারক রহিয়াছেন, তাহাদের চোখ-কান খোলা রাখিতে হইবে। পত্রপত্রিকা ও টেলিভিশনের খবরাখবরের প্রতি সার্বক্ষণিক নজর রাখিতে হইবে। সেই অনুযায়ী জনকল্যাণে লইতে হইবে কার্যকর পদক্ষেপ।

বিশেষজ্ঞরা বলিতেছেন, দেশে দেশে টিকা গ্রহণের হার ৭০ শতাংশে উন্নীত হইলে এই বৎসরের মধ্যে করোনার অবসান হইতে পারে। তাহার পর হয়তো এই ভাইরাসটি নিউমোনিয়ার মতো বিরাজ করিবে সমগ্র বিশ্বে। ইহার মধ্যে হয়তো আরো কার্যকর টিকা ও ঔষধ আবিষ্কার হইয়া যাইবে। যদিও আমরা ধরিয়া লই, ২০২২ সালের মধ্যে করোনার অবসান হইতে যাইতেছে, তবে ইহার অর্থ ইহা নহে যে ইহার পাশাপাশি আমরা করোনার নেতিবাচক প্রভাব হইতে সম্পূর্ণ মুক্ত হইতে পারিব। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকগণ বলিতেছেন, প্রাক-মহামারি পর্যায়ে প্রবৃদ্ধি অর্জন করিতে আমাদের তিন বৎসরেরও অধিক সময় লাগিতে পারে। ইতিমধ্যে করোনার নূতন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রন দেখা দেওয়ার পর কাঁচামালের মূল্য ও জাহাজভাড়া বাড়িয়া গিয়াছে। হাজার হাজার উড়োজাহাজ গ্রাউন্ডেড করা হইয়াছে। দেশে দেশে বাড়িয়া গিয়াছে মূল্যস্ফীতি। তাই সম্মুখে ভয়ানক পরিস্থিতি অপেক্ষা করিতেছে বলিয়াই প্রতীয়মান হয়। এই ক্ষেত্রে উন্নয়নশীল বিশ্বে শ্রমিক অসন্েতাষ দেখা দেওয়াটা অস্বাভাবিক নহে। ইহাতে তৈরি হইতে পারে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাও। বিভিন্ন দেশে দেখা দিতে পারে সরকারের পালাবদল।

আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজন অর্থের। সেই জন্য পৃথিবীর দিকে তাকাইয়া থাকিলে চলিবে না। দুইটি ভ্যাকসিন কিংবা বুস্টার ডোজ নেওয়া থাকিলে এবং আল্লাহ চাহিলে তাহাতে আমাদের শারীরিকভাবে কিছু হইবে না; কিন্তু জীবিকা বা অর্থনীতির কী হইবে? বিভিন্ন দেশের সরকার পূর্ব-অভিজ্ঞতা হইতে লকডাউন দিতেও নানা চিন্তাভাবনা করিতেছে। ইহা ব্যবহার করা হইতেছে শেষ অস্ত্র হিসাবে। জীবন ও জীবিকা রক্ষা করিবার জন্য তাহারা সমন্বয়তার নীতি গ্রহণ করিতেছে। অতএব, যে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে কলকারখানার মালিক ও ব্যবসায়ী সমাজের স্বার্থের কথাও চিন্তা করিয়া দেখিতে হইবে। কেননা দেশে ব্যবসায়-বাণিজ্য না থাকিলে জাতীয় অর্থনীতি মুখ থুবড়াইয়া পড়িবে। আয়-রোজগার ও মানুষের কর্মসংস্থানে টান পড়িবে। এই জন্য ব্যবসায়ী সমাজ আগামী জুন পর্যন্ত ব্যাংক ঋণের কিস্তি পরিশোধের যে অবকাশ চাহিয়াছেন, তাহা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। সার্বিক অর্থনীতির স্বার্থে প্রয়োজনে আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত এই নীতিসহায়তা দেওয়া আবশ্যক। মনে রাখিতে হইবে, তাহারা কেহ ঋণ বা সুদ মওকুফের কথা বলিতেছেন না। শুধু যতদিন করোনার অভিঘাত থাকে, ততদিন কিস্তি পরিশোধের সময়সীমা বৃদ্ধির কথা বলিতেছেন। তাহাদের এই দাবি যৌক্তিক বলিয়া আমরা মনে করি। যাহারা ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণখেলাপি হইতে চাহেন, তাহাদের কথা আলাদা; কিন্তু অধিকাংশ উদ্যোক্তাই এখন কষ্টে রহিয়াছেন। তাই ব্যবস্থাপনায় যাহারা আছেন, তাহাদের এই সকল বিষয় অবশ্যই বিবেচনায় লইতে হইবে।