মুমিনুল, আপনার এমন ঘুমহীন রাত বারবার আসুক

বাংলাদেশ টেস্ট আঙিনায় পা রাখার পর এরই মধ্যে ২১ বছর অতিবাহিত হয়ে গেছে। দীর্ঘ এই সময়ে ক্রিকেটের অভিজাত ফরম্যাটটিতে ছোট দল হিসেবেই রয়ে গেছে লাল-সবুজ পতাকাধারীরা। জয়ের সুখ স্মৃতি যে খুব কম। একের পর এক পরাজয়ে সবসময় হারের বৃত্তেই থেকেছে বাংলাদেশ। হোক সেটা দেশ কিংবা দেশের বাইরে, টেস্টে কখনোই ধারাবাহিক হতে পারেনি টাইগাররা।

২০০০ সালের নভেম্বরে ভারতের বিপক্ষে টেস্ট দিয়ে অভিজাত ফরম্যাটটিতে প্রবেশ করে বাংলাদেশ। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত ১২৭টি ম্যাচ খেলা হয়ে গেছে। জয় এসেছে মাত্র ১৬টি ম্যাচে। বাকিগুলোর মধ্যে ৯৪টিতে পরাজয় এবং ১৭টি ড্র। অর্থাৎ জয়ের হার মাত্র ১২.৫৯ শতাংশ। ১৬টি জয়ের মধ্যে ৮টি জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে। এর বাইরে ৪টি ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে এবং একটি করে জয় শ্রীলঙ্কা, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড ও নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে। যার সর্বশেষটি গতকাল (৫ জানুয়ারি) মাউন্ট মঙ্গানুইয়ে স্বাগতিক নিউজিল্যান্ডকে পরাজিত করা।

কিউই বধে বাংলাদেশের নায়ক পেসার এবাদত হোসেন, তিনি ম্যাচে ৭ উইকেট শিকার করেছেন। ছবি: গেট্টি ইমেজ

এই জয়কে অন্যগুলোর সঙ্গে মেলালে হবে না। এই জয় ঐতিহাসিক। বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা জয় এবং নিশ্চিতভাবেই টেস্টের সেরা অর্জন। কারণটা অবশ্যই কন্ডিশন এবং সাম্প্রতিককালে ক্রিকেটের অভিজাত এই ফরম্যাটে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স। নিউজিল্যান্ডের এই দলটি বর্তমানে আইসিসির টেস্ট চ্যাম্পিয়ন দল। তাদের দলে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম সেরা পেস বোলিং লাইনআপ। ট্রেন্ট বোল্ট, টিম সাউদি, নিল ওয়াগনার, কাইল জেমিসন, এই নামগুলো প্রতিপক্ষের জন্য আতঙ্কের অপর নাম। নিজ দেশের মাটিতে তারা তো আরও ভয়ঙ্কর।

নিউজিল্যান্ডের মাটিতে সবসময় প্রতিপক্ষ দলগুলো খাবি খায়। বিশেষ করে এশিয়ার দলগুলোর অবস্থা সবচেয়ে বেশি ভয়াবহ। বিগত ১১ বছর ধরে টেস্টে সেখানে ম্যাচ জিততে পারেনি এশিয়ার কোনো দেশ। উল্টো অধিকাংশ সময় ইনিংস ব্যবধানে পরাজয়ের লজ্জাবরণ করতে হয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ প্রতিবার দেশটিতে সফরে যায় যেন কেবল হারতে। নূন্যতম লড়াই পর্যন্ত করতে পারে না।

ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় টেস্ট খেলতে নেমেই নিজের জাত চিনিয়েছেন মাহমুদুল হাসান জয়

মুমিনুল হক বাংলাদেশের টেস্ট অধিনায়কের দায়িত্ব পেয়েছিলেন অনেকটা ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে। হঠাৎ করেই সব ধরনের ক্রিকেট খেকে এক বছরের জন্য নিষেধাজ্ঞা পান নিয়মিত অধিনায়ক সাকিব আল হাসান। তখন বিসিবিকে এমন একজনকে খুঁজতে হয়েছে, যিনি টেস্ট ক্রিকেটটা ভালো বুঝেন এবং দীর্ঘ সময় দলকে নেতৃত্বে দিতে পারবেন। এক্ষেত্রে অপশন ছিল কেবল তিনজন। তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহিম ও মুমিনুল হক। মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ টেস্টে অনিয়মিত হওয়ায় তিনি এই বিবেচনায় আসেননি। এর কয়েকদিন পরই ছিল ভারত সফর। ওই সময় ইনজুরিতে ছিলেন তামিম ইকবাল। ফলে তাকে পাওয়া যাচ্ছিল না। এমতাবস্থায় মুশফিক কিংবা মুমিনুলে হাতে দায়িত্ব দিতে হতো। বিসিবির প্রথম পছন্দ ছিল সাবেক অধিনায়ক মুশফিক। তবে অভিজ্ঞ এই ব্যাটার দায়িত্ব নিতে অনিচ্ছার কথা জানান। অনেকটা বাধ্য হয়ে মুমিনুল হকের শরণাপন্ন হতে হয়েছে বোর্ডকে। তখন অনেকেই শঙ্কা প্রকাশ করেছিল, ছোট কাঁধে এত বড় দায়িত্ব ঠিকভাবে সামাল দিতে পারবেন তো মুমিনুল!

প্রথম এসাইন্টমেন্টে ব্যর্থ হন এই ব্যাটার। তার নেতৃত্বে ভারতের কাছে হোয়াইটওয়াশের লজ্জাবরণ করতে হয়েছে। এরপর পাকিস্তান সফরে গিয়ে একমাত্র টেস্টে পরাজয়। পরে তো করোনার কারণে সব ধরনের খেলাই বন্ধ হয়ে যায়। করোনা পরবর্তী সময়ে ঘরের মাঠে ওয়েস্ট ইন্ডিজের দ্বিতীয় সারির দলের বিপক্ষে হোয়াইটওয়াশ, শ্রীলঙ্কা সফরে সিরিজ হার। ওই সিরিজে একটি টেস্ট ড্র হয়েছিল। আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের গত মৌসুমে ওটাই ছিল বাংলাদেশের একমাত্র অর্জন। গত বছরের জুলাইয়ে জিম্বাবুয়ে সফরে একমাত্র টেস্টে বিশাল ব্যবধানে জয় পায় বাংলাদেশ। যা এতদিন পর্যন্ত অধিনায়ক হিসেবে মুমিনুল হকের একমাত্র জয় ছিল। কিন্তু ওই ম্যাচটি আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অন্তর্ভুক্ত ছিল না। এর চারমাস পর আবারও টেস্ট খেলতে নামে বাংলাদেশ। ঘরের মাঠে প্রতিপক্ষ পাকিস্তান। এতেও হোয়াইটওয়াশের লজ্জাবরণ করতে হয়েছে মুমিনুল বাহিনীকে।

পেস আক্রমণে বাংলাদেশের ভবিষ্যত হতে চলেছেন শরিফুল ইসলাম

এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন ওঠে অধিনায়ক হিসেবে মুমিনুল হকের কার্যকারীতা নিয়ে। যদিও সার্বিকভাবে বিবেচনা করলে তাকে দুর্ভাগ্যই বলতে হবে। তার নেতৃত্বে খেলা ১১টি ম্যাচে (নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম টেস্ট সহ) মুমিনুল কখনোই দলের সেরা ক্রিকেটারদের একসঙ্গে পাননি। বিশেষ করে তিন সিনিয়র তামিম ইকবাল, সাকিব আল হাসান ও মাহমুদউল্লাহ রিয়াদকে। কেবল মুশফিকুর রহিম নিয়মিত খেলে যাচ্ছেন। এর বাইরে দলে একের পর এক তরুণ ক্রিকেটারের অভিষেক হচ্ছে। তারা আন্তর্জাতিক আঙিনায় এসে ব্যর্থ হচ্ছেন। সবমিলিয়ে টেস্টে দল হিসেবে বাংলাদেশকে গড়ে তোলার কাজটা মুমিনুলের জন্য কঠিন হয়ে যাচ্ছিল। তবে কখনোই ধৈর্য হারা হননি অধিনায়ক। গত মাসে নিউজিল্যান্ডের বিমান ধরার আগে বলে গিয়েছিলেন, আর কয়েকদিন ধৈর্য ধরতে। শিগগিরই হয়তো টেস্টে ভালো ফল মিলবে।

মাউন্ট মঙ্গানুইয়ে সেটারই যেন প্রতিফলন ঘটলো। বিশ্ব দেখলো টেস্ট ক্রিকেটে নতুন এক বাংলাদেশকে। পুরো পাঁচদিন শক্তিশালী নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে তাদেরই মাটিতে দাপট দেখিয়েছে বাংলাদেশ এবং শেষ পর্যন্ত জয় তুলে নিয়েছে। যেখানে পারফরম্যান্সের দিক দিয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন তরুণ ক্রিকেটাররাই। বল হাতে শরিফুল ইসলাম, তাসকিন আহমেদ, এবাদত হোসেন, মেহেদী হাসান মিরাজ এবং ব্যাট হাতে মাহমুদুল হাসান জয়, নাজমুল হোসেন শান্ত, সাদমান ইসলাস, লিটন দাস ও ইয়াসির আলি রাব্বি। ব্যাট হাতে দারুণ একটি ইনিংস খেলেছেন মেহেদী মিরাজও। আর সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন অধিনায়ক মুমিনুল হক। তাইতো ম্যাচ শেষে তার মুখে ছিল চাপমুক্ত হওয়ার তৃপ্তির হাসি। এ যেন তরুণ ক্রিকেটারদের নিয়ে টেস্ট দল হিসেবে গড়ে ওঠার ফল।

তাসকিন আহমেদের কথা যে বিশেষভাবে বলতে হয়। গতি ও সুইং দিয়ে কিউই শিবিরে কাঁপুনি ধরিয়েছেন তিনি।

ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে মুমিনুল হক জানিয়েছিলেন, ম্যাচের চতুর্থ দিন শেষে রাতে তার ঘুম হয়নি। সারারাত উত্তেজনায় ছটপট করেছেন। হয়তো বারবার বিছানার এপাশ-ওপাশ করেছেন আর ভেবেছেন জয় নিয়ে। একটা ভয়ও ছিল। কারণ, অতীতে দেখা গেছে, জয়ের দ্বারপ্রান্তে গিয়েও অনেক ম্যাচ হাতছাড়া করেছে বাংলাদেশ। সেই অঘটন যেন এবার না ঘটে, তা নিয়েও পরিকল্পনা করেছেন।

টেস্ট ক্রিকেটের প্রতি মুমিনুলের ভালোবাসা অবশ্য নতুন নয়। এই ফরম্যাটটি নিয়ে তিনি স্বপ্ন দেখেন। একাগ্রতাও অনেক। তাইতো তাকে টুপি খোলা অভিনন্দন দিতে ভুলেননি ওয়ানডে অধিনায়ক তামিম ইকবাল। সোশ্যাল মিডিয়ায় এক পোস্টে বলেছেন, ‘আমি আলাদা করে বলবো একজনের কথা। যখন চরম দুঃসময় এসেছে, কেউ যখন দলের ওপর বিশ্বাস রাখেনি, দলের ভেতরেও অনেকের যখন সংশয় জেগেছে নিজেদের নিয়ে, তখনও বিশ্বাস হারাননি একজন। সে সবসময় বিশ্বাস করে গেছে এবং প্রবল বিশ্বাস নিয়েই দলকে বিশ্বাস জোগানোর চেষ্টা করেছে। আমরা পারি, আমরা অবশ্যই পারি। বাজে দিন এসেছে, খারাপ পারফরম্যান্স হয়েছে। তার পরও সে কখনো দলের ওপর বিশ্বাস হারায়নি। টেস্ট ক্রিকেটের প্রতি তার আবেগ তীব্র, টেস্ট ক্রিকেটকে সে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেয় সবসময়।  মুমিনুল হক, আমাদের অধিনায়ককে টুপি খোলা অভিনন্দন!’

মুমিনুল হক, আপনার সৌরভ ছড়িয়ে পড়ুক পুরো বিশ্বে

তাই অধিনায়ক মুমিনুল হক সৌরভের কাছে সমর্থক হিসেবে আমাদের চাওয়া, আপনার এমন ঘুমহীন রাত বারবার ফিরে আসুক। দেশ ও বিদেশের মাটিতে টেস্ট ক্রিকেটে দাপট দেখাক বাংলাদেশ। আমরা আপনার হাত ধরেই অভিজাত এই ফরম্যাটে সেরাদের কাতারে যেতে চাই। বিশ্বের বড় দলগুলোর চোখে চোখ রেখে লড়াই করতে চাই। এতে যে আনন্দে ভাসে পুরো বাংলাদেশ। ক্রিকেট বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে টাইগারদের জয়ের বার্তা।