ইউরোপ-আমেরিকা ও ভারত হইতে শিক্ষা লইতে হইবে 

সম্প্রতি নূতন বিপদ শুরু হইয়াছিল দক্ষিণ আফ্রিকা হইতে। তাহার পর আমেরিকা ও ইউরোপের উপর দিয়া করোনা ভাইরাসের নূতন ধরন কোভিডের সুনামি বহিয়া গিয়াছে। অতঃপর গত ১০ দিন ধরিয়া প্রতিবেশী ভারতে করোনা ভাইরাসের বিস্ফোরণ দেখা দিয়াছে। ইহা আক্ষরিক অর্থেই বিস্ফোরণ। ধারণা করা হইতেছে, ইহার নেপথ্যেও রহিয়াছে কোভিডের ওমিক্রন ধরন। এই ধরনটি মহাসংক্রামক। এই জন্য বেশ কিছুদিন পূর্বেই বিশ্ব স্বাস্হ্য সংস্হা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করিয়া ওমিক্রনকে নূতন ভ্যারিয়েন্ট অব কনসার্ন ঘোষণা করিয়াছিল। বিশ্বের বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন হইতে ইহা স্পষ্ট যে, ইউরোপে ওমিক্রন মূল সংক্রামক হইলেও আমেরিকায় ডেলটা ও ওমিক্রন, দুই স্ট্রেনেই সংক্রমণ বাড়িতেছে—ইহাকে বলা হইতেছে—ডেলমিক্রন। ইহার অর্থ, কোনো এলাকায় একই সঙ্গে ডেলটা ও ওমিক্রনের সংক্রমণ বৃদ্ধি। যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্হানীয় এপিডিমিয়োলজিস্ট অ্যান্টনি ফাউচি বলিয়াছেন, দুইটি স্ট্রেনেরই ক্ষমতা বৃদ্ধি ভয়ের কারণ। যদিও ওমিক্রন মারাত্মক ছোঁয়াচে হইলেও ইহার মারণক্ষমতা কম। কিন্তু ডেলটা সংক্রমণে গুরুতর অসুস্হতা ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটিয়াই চলিতেছে। এই জন্য যুক্তরাষ্ট্রে টেক্সাসসহ একাধিক প্রদেশে ‘ন্যাশন্যাল গার্ড’ নামানো হইয়াছে বিপর্যয় মোকাবিলায়। ওমিক্রনের কোভিড পজিটিভের সংখ্যা এত বাড়িয়াছে যে, লক্ষ লক্ষ মানুষের ঘরবন্দি দশায় যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি লইয়া চিন্তায় পড়িয়াছেন আমেরিকার অর্থনীতিবিদরা। এই জন্য গত সপ্তাহে আমেরিকার স্বাস্হ্য বিভাগ কোভিড পজিটিভদের আইসোলেশনে থাকিবার সময়সীমা ১৪ দিন হইতে কমাইয়া পাঁচ দিন করিয়াছে। 

আমেরিকা, ইউরোপ, ভারতে কোভিড বিস্ফোরণের ভিতর দিয়া ইহা স্পষ্ট হইয়াছে যে, নূতন ধরনের ওমিক্রন—যাহা বাংলাদেশে আঘাত হানিবার পথে—সেই কোভিড বোমার সলতেতে আগুন লাগিয়া গিয়াছে, বাংলাদেশে বিস্ফোরণ হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। কয়েক মাস আগে যখন বাংলাদেশে ডেলটা ভ্যারিয়েন্টের সংক্রমণ ব্যাপকভাবে ছড়াইয়া পড়িয়াছিল, তাহা প্রথমে সীমান্তসংলগ্ন জেলাগুলিতেই দেখা গিয়াছিল। লখিন্দরের বাসরঘরের মতো সাপ ঢুকিবার পথ আটকাইয়া ঘর যতই নিশ্ছিদ্র করা হউক না কেন—সাপ ঠিকই ঢুকিয়াছিল এবং দংশন করিয়াছিল লখিন্দরকে। তেমনই সীমান্তবর্তী জেলাসমূহে যতই কড়াকড়ি করা হউক না কেন—নূতন ধরনের কোভিডের ঢেউ আমাদের দেশে ছড়াইয়া পড়াটা সময়ের ব্যাপার মাত্র। তবে সেই ঢেউয়ের উচ্চতা যাহাতে কম হয়, সেই জন্য সকল ধরনের সতর্কতা জারি রাখাটাও জরুরি। এই মুহূর্তে ভারত হইতে যাত্রী যাওয়া-আসার জন্য আকাশপথ ছাড়াও বেনাপোল, বুড়িমারী এবং আখাউড়া—এই তিনটি স্হলবন্দর খোলা রহিয়াছে। স্বাভাবিক সময়ে বেনাপোল স্হলবন্দর দিয়া ১০ হাজারের মতো যাত্রী আসা-যাওয়া করিতে পারিলেও এখন সেই সংখ্যা ৩০০ জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হইয়াছে। পণ্যবাহী ট্রাকের চালকের সঙ্গে দুই জন সহকারী আসিতে পারিত, তাহা এখন একজন হইতেছে। 

এই মুহূর্তে সারা দেশে কোভিড রোগী শনাক্তের হার সাড়ে ৪ শতাংশের কাছাকাছি হইলেও সীমান্তবর্তী কয়েকটি জেলায় সংক্রমণের হার আরো বেশি। মনে রাখিতে হইবে, মাত্র সাত দিনে প্রতিবেশী পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতায় কোভিড সংক্রমণের হার ৪ হইতে পৌঁছাইয়া গিয়াছে ৪৪.৫ শতাংশে। গত সাত দিনে ৪৫ হাজারেরও বেশি মানুষ করোনা আক্রান্ত হইয়াছেন পশ্চিমবঙ্গে। সেইখানকার স্বাস্হ্য বিভাগ যুদ্ধকালীন তত্পরতায় রাজ্যের ১৯৪টি হাসপাতালকে কোভিড হাসপাতালে রূপান্তরিত করিয়াছে। ৩২ হাজারের অধিক সাধারণ শঘ্যার ব্যবস্হাও রাখিয়াছে। একইভাবে হাসপাতালের সিসিইউ এবং এইচডিইউ শঘ্যার সংখ্যাও বাড়াইয়াছে পর্যাপ্ত পরিমাণে। আমাদের সৌভাগ্য যে, ইউরোপ-আমেরিকা এবং প্রতিবেশী ভারতের ভয়াবহতা হইতে শিক্ষা লইবার সুযোগ পাইতেছি। সুতরাং এই শিক্ষাকে কাজে লাগাইতেই হইবে। বিশ্ব স্বাস্হ্য সংস্হা সতর্ক করিয়া বলিয়াছে, কাহার শরীরের প্রতিরোধশক্তি ঠিক কতটা—তাহা আগে হইতে পুরোপুরি জানা সম্ভব নহে। এই কারণে মহাসংক্রামণশীল ওমিক্রন যতই কম বিপজ্জনক হউক না কেন, উহাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা যাইবে না। সার্বিক প্রস্ত্ততি এখনই গ্রহণ করিতে হইবে।