নয় বছর আগে নিমতলীতে অগ্নিকাণ্ডের পর পুরান ঢাকা থেকে কেমিক্যালের গুদামগুলো সরানোর দাবি উঠেছিল জোরেশোরে। স্থানান্তরের জন্য কেরানীগঞ্জে জায়গাও দেয়া হয়েছিল। কিন্তু অনেকে সরেনি। নিমতলীর পর এবার চকবাজারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটল, যাতে নিহত হল ৭৮ জন। এলাকাবাসী অভিযোগ করেন, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়, তদন্ত হয়। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না। যে লাউ সেই কদু। জানা গেছে, নিমতলীর অগ্নিকাণ্ডের পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গঠিত কমিটি অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে যেসব সুপারিশ করেছিল, তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল ঢাকার রাসায়নিকের কারখানা আর গুদামগুলো সরিয়ে নেওয়া। ২০১০ সালের ১৫ জুন ওই কমিটির প্রতিবেদনে যে ১৭টি সুপারিশ করা হয়েছিল কিছু কিছু বাস্তবায়ন হলেও আসল কাজটিই করা সম্ভব হয়নি গত নয় বছরে। পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিকের কারখানা ও গুদামগুলো সরানোর দায়িত্বে থাকা ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ২০১৭ সালের মার্চে একবার অভিযান শুরু করলেও কয়েকদিনের মাথায় তা থেমে যায়।
নিমতলীর এক কিলোমিটারের মধ্যে চকবাজার চুড়িহাট্টা শাহী মসজিদের পাশের কয়েকটি ভবনে বুধবার রাতে যে আগুন লাগে, তা ভয়াবহ রূপ নেয়ার জন্য দাহ্য পদার্থের অনিরাপদ গুদামকেই দায়ী করছেন স্থানীয়রাসহ ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। পুরান ঢাকাবাসীর এখন একটা প্রশ্ন, আর কত মানুষ মারা গেলে পুরান ঢাকা থেকে কেমিক্যালের গোডাউন সরবে? পুরান ঢাকার ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক কারখানা ও গুদামগুলোর প্রকৃত মালিকরা সেখানে থাকেন না। তারা বসবাস করেন গুলশান, বনানী ও ধানমন্ডিসহ অভিজাত এলাকায়। অধিকাংশ কেমিক্যাল গোডাউনের পাশে একটা করে বড় রুম রয়েছে, যেটা আবাসিক মেস হিসেবে ব্যবহূত হয়। জনপ্রতি রাতে ভাড়া ৩০ টাকা। এদিকে এবারও কেমিক্যাল গোডাউন দ্রুত সরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পুলিশের আইজিপি ড. মোহাম্মদ জাভেদ পাটোয়ারি বলেন, পুলিশের একার পক্ষে কেমিক্যালের গোডাউন সরানো সম্ভব নয়। সম্মিলিত উদ্যোগের প্রয়োজন। কেমিক্যাল গোডাউন পুরান ঢাকা থেকে দ্রুত সরাতে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। বিস্ফোরক পরিদপ্তরের প্রধান পরিদর্শক মো. সামসুল আলম জানান, মাত্র ৩০টি কেমিক্যাল গোডাউন কেরানীগঞ্জে সরেছে। যেগুলো উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন দাহ্য পদার্থ সম্পন্ন কেমিক্যাল, সেগুলোর গোডাউনের জন্য বিস্ফোরক পরিদপ্তরের অনুমোদন লাগে। অন্য কোনো কেমিক্যাল গোডাউনের অনুমোদন এই পরিদপ্তর থেকে দেয়া হয় না বলে তিনি জানান।
সিটি কপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ১৬শ’ কেমিক্যালের গোডাউন আছে পুরান ঢাকায়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, আমরা জানি কেমিক্যাল গোডাউন সব সরে গেছে, কিন্তু সরেনি। তাদের সরে যাওয়ার সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ব্যাপারে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে সব ধরনের সহযোগিতা প্রদানের আশ্বাস দেন তিনি। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন বলেন, দক্ষিণ সিটির পক্ষ থেকে পুরান ঢাকার কেমিক্যাল গোডাউন উচ্ছেদের জন্য গত সোমবার থেকেই মোবাইল কোর্ট পরিচালনা শুরু করা হয়েছে। আগুন লাগার ঘটনার সাত-আট দিন আগে এফবিসিসিআই’র মাধ্যমে মেমিক্যাল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে একটি বৈঠকও করা হয়েছিল। তারপর থেকে উচ্ছেদ অভিযান শুরু করি। আমাদের আগে থেকেই উচ্ছেদ অভিযান চলছিল। কিন্তু অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে বুধবার এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলো। উল্লেখ্য, চকবাজারের এই কেমিক্যাল গোডাউনটির অনুমোদন নেই। কেরানীগঞ্জে একটি জায়গা শনাক্ত করা হয়েছে, সেখানে গোডাউনগুলো স্থানান্তর করা হবে। মেয়র সাঈদ খোকনের দাবি, তাদের সরাতে সিটি করপোরেশনের আন্তরিকতার কোনো অভাব ছিল না। কিন্তু শিল্প মন্ত্রণালয় এবং ব্যবসায়ীদের বড় সংগঠন এফবিসিসিআইর অনুরোধে তারা অভিযান এগিয়ে নিতে পারেননি। আমরা একটা ম্যাসিভ ড্রাইভ দিলাম। অনেক কারখানা বন্ধ করলাম, মামলা করলাম, সিলগালা করলাম। তখন এফবিসিসিআই এবং শিল্পমন্ত্রী আমাকে বলেন, বিসিক শিল্প নগরী হলে এগুলো উঠিয়ে দিতে। আমাকে অনুরোধ করে যে, কেমিক্যালের গোডাউন সরাতে তাদেরকে কিছুটা সময় দিতে। তখন এ প্রক্রিয়াটা থেমে গেল। নইলে ওই সময়েই একটা ধাক্কা দিয়ে এগুলো সরিয়ে দিতাম।
ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আলী আহমেদ বলেন, পুরান ঢাকার ঘনবসতি পূর্ণ এলাকায় কেমিক্যাল গোডাউন রাখা মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। এগুলো এ এলাকা থেকে সরানোর কোনো বিকল্প নেই। নইলে আগুন লাগার ঘটনা বারবার ঘটবে।
২০১০ সালে নিমতলীতে রাসায়নিক গুদামে অগ্নিকাণ্ডে ব্যাপক প্রাণহানির পর ঝুঁকিপূর্ণ এসব গুদাম সরাতে তোড়জোড় শুরু হয়। কিন্তু নানা জটিলতায় এ উদ্যোগ থেমে যায়। ২০১০ সালে নিমতলীতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১২৪ মানুষের প্রাণহানির জন্য কেমিক্যালের গুদামগুলোকে দায়ী করা হয়।
এদিকে চকবাজারে অগ্নিকাণ্ডের স্থানে ছড়িয়ে আছে নানা ধরনের রাসায়নকি ও দাহ্য পণ্যের চিহ্ন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসবের কারণেই ভয়াবহ মাত্রা পায় আগুন। তদন্ত কমিটির সুপারিশের পর ২০১০ সালে রাজধানীর রাসায়নিক কারখানা ও গুদাম কেরানীগঞ্জে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও ‘বিসিক কেমিক্যাল পল্লী, ঢাকা’ প্রকল্প একনেকের অনুমোদন পায় আট বছর পর গত বছরের ৩০ অক্টোবর। ২০১ কোটি ৮১ লাখ টাকায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)। বিসিকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত ৩ জানুয়ারি প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এই কাজে ধীরগতির জন্যও শিল্প মন্ত্রণালয়কে দূষছেন মেয়র সাঈদ খোকন। তিনি বলেন, ‘শিল্প মন্ত্রণালয় কেমিক্যাল পল্লী করার দায়িত্ব নিলেও তারা খুব ধীরে তা করছে। ২০১০ সালে যখন নিমতলী ট্র্যাজেডি হয় তখনই এই পল্লী হয়ে যাওয়ার কথা। ওদেরকে আমরা তাগিদ দিয়েছি তাড়াতাড়ি করার জন্য। তবে জমি অধিগ্রহণ নিয়ে জটিলতা থাকায় তারা এগোতে পারেনি। প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে বিসিকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘এটা আমাদের নম্বর ওয়ান প্রায়োরিটি। আমাদের প্রকল্প অনুমোদন হয়ে গেছে। এখন আমরা জমি অধিগ্রহণে যাব।’ তবে জমি অধিগ্রহণেই বেশি সমস্যা হয় জানিয়ে তিনি বলেন, অধিগ্রহণ হয়ে গেলে অন্য সব কাজ শেষ করতে দুই বছরের বেশি সময় লাগবে না।
পুরান ঢাকার ৪৫টি ব্যবসায়ী সংগঠনের একাধিক নেতৃবৃন্দ বলেন, পুরান ঢাকার কেমিক্যাল গোডাউন সরানো নিয়ে কেউ কেউ ভোটের রাজনীতি করেন। কোনো কোনো বিভাগের কর্মকর্তারা প্রতি মাসে নির্ধারিত হারে এই সকল অবৈধ গোডাউনের মালিক ও ব্যবসায়ীদের থেকে মোটা অঙ্কের ঘুষ গ্রহণ করে থাকেন। এসব কারণে কেমিক্যালের গোডাউন সরানোর উদ্যোগ শুধু কথার কথা।