উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলিতে দুর্নীতি ও অনিয়ম একটি সাধারণ রোগ। এই রোগের চিকিৎসা করা দুরূহ। দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাই এখন ডাক দেওয়া হইতেছে সামাজিক আন্দোলনের। এই ব্যাধি দূর করিতে এখন সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির উপর গুরুত্বারোপ করা হইতেছে।
ইহা একটি যথার্থ চিন্তাভাবনা। বর্তমানে কোনো কোনো দেশে এমন পরিস্থিতি দাঁড়াইয়া গিয়াছে যে, জনগণের প্রতিরোধ করা ছাড়া আর কোনো উপায় নাই। তবে এখানে প্রশ্ন উঠিতে পারে, তাহা হইলে দেশে দেশে এত গুরুত্বপূর্ণ ও জাতীয় প্রতিষ্ঠান রহিয়াছে কেন? উপজেলা-জেলা পর্যায়েও দুর্নীতি-অনিয়ম দেখিবার সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান বা কর্তৃপক্ষ রহিয়াছেন।
এই সকল প্রতিষ্ঠানে যাহারা কর্মরত রহিয়াছেন, তাহারা তাহা হইলে কী করিতেছেন? সরিষার মধ্যে ভূত থাকিলে সেই ভূত কি তাড়ানো সম্ভব? সুতরাং এখন যখন সামাজিক সচেতনতার কথা বলা হইতেছে, তখন প্রচ্ছন্নভাবে তাহাতে একপ্রকার হতাশার কথাও ব্যক্ত করা হইতেছে। এই সকল দেশের ক্যাবিনেট, সেক্রেটারিয়েটসহ যাহারা সরকারের বিভিন্ন পদে থাকেন, তাহারা অনেক সময় সরকার প্রধানের কথা শুনিয়া হাসিতেও পারেন।
কেননা, তাহারা জানেন কোথায় এবং কেমন করিয়া দুর্নীতি হইতেছে। দুর্নীতির খবর হররোজ পত্র-পত্রিকায় ছাপা হয়। একটা-দুইটা দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে ব্যবস্থা নেওয়া হয় না তাহা নহে; কিন্তু এই ক্ষেত্রেও জনগণ প্রশ্ন তুলিয়া থাকেন যে, রুইকাতলার বদলে শুধু চুনোপুঁটিদের ধরা হইতেছে কেন? ১-২ লক্ষ বা কোটি টাকার দুর্নীতিবাজদের ধরিতে ঘটা করিয়া অভিযান পরিচালনা করা হইতেছে। অথচ যাহারা শত শত এমনকি হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যাংক হইতে মারিয়া দিতেছে বা বিদেশে পাচার করিতেছে, তাহাদের ধরা হইতেছে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মামলা হইলেও সেই মামলার শিগ্গির নিষ্পত্তি হইতেছে না।
ওয়াশিংটনভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) এক প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, ২০০৯ হইতে ২০১৮ সাল পর্যন্ত এক দশকে বিশ্বের উন্নয়নশীল ১৩৪ দেশ হইতে বাণিজ্যের আড়ালে ১ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন বা ১ লক্ষ ৬০ হাজার কোটি ডলার পাচার হইয়াছে। আমাদের দেশ হইতে পাচার হইয়াছে ৪ হাজার ৯৬৫ কোটি ডলার যাহা বিনিময় হার ৮৬ টাকার হিসাবে হয় ৪ লক্ষ কোটি টাকার কাছাকাছি। ইহা আমাদের বর্তমান বাজেটের দুই-তৃতীয়াংশ।
ইহা ছাড়া আরও কত রকমের অনিয়ম যে হয়, তাহার ইয়ত্তা নাই। আর কত ঘাটে যে ঘুষ দিতে হয়, তাহা ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী বা উদ্যোক্তাদের চাইতে আর কেহ অধিক জানেন না। এই সকল উন্নয়নশীল দেশে প্রধান নির্বাহীর নিকট যাইতেও টাকা লাগে। নতুবা তাহার অধস্তন লোকেরা বসাইয়া রাখেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ে যাহারা আছেন, তাহারা এই পরিস্থিতি সম্পর্কে যে অবগত নন, তাহা হইতে পারে না।
দুর্নীতি ও অনিয়মের সহিত যাহারা জড়িত, সমাজের লোক তাহাদের ভালোমতোই চিনেন। তাহার পরও যখন মাঝেমধ্যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়, তখন যিনি বা যাহারা এইভাবে হুঁশিয়ারি দেন, তাহারা কি হাসির পাত্রে পরিণত হন না? সুতরাং সরকার পরিচালনার বহু অভিজ্ঞতার পর কেহ যদি উপলব্ধি করিতে পারেন যে, এখন কী করিতে হইবে, তাহা হইলে তাহাকে কি মন্দ বলা যাইবে? আমরা ইহারও বহু পূর্ব হইতে বলিয়া আসিতেছি যে, অন্যায়-অনিয়মের বিরুদ্ধে জনগণকেও রুখিয়া দাঁড়াইতে হইবে।
অন্যায় দেখিয়া চুপ করিয়া বসিয়া থাকিলে চলিবে না। অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে তাহারা সমান অপরাধী। মাইকেল মধুসূদন দত্ত তাহার ‘মেঘনাধ বধ’ কাব্যের ষষ্ঠ সর্গের অংশবিশেষের শুরুতে লিখিয়াছেন—‘এতক্ষণে’-অরিন্দম কহিলা বিষাদে/ ‘জানিনা কেমনে আসি লক্ষণ পশিল/ রক্ষঃপুরে!...’ উন্নয়নশীল দেশগুলিতে ঘরের শত্রু বিভীষণেরাই অনেক সময় সরকারের অধিক মাথাব্যথার কারণ হইয়া দাঁড়ায়। তখন অরিন্দমের মতো হাহাকারই করিতে হয়।