আধুনিক মানুষ এক ভিন্নরকম সময় কাটাইতেছে। সর্বার্থেই। গত দুই বৎসর ধরিয়া মানুষের যাপিত জীবনে যে ছন্দপতন ঘটিয়াছে, তাহা আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়া আসিতে মানবসমাজকে হয়তো আরো বহু বছর অপেক্ষা করিতে হইবে। মানুষের জীবনের গতি মম্হর হইয়া পড়িয়াছে। আর এই ছন্দপতনের পেছনে রহিয়াছে এক অদৃশ্য ভাইরাস, যাহা সংক্রামক চরিত্র লইয়া, বিভিন্ন রূপ ধরিয়া দেশে দেশে, জনপদ হইতে জনপদে ঘুরিয়া বেড়াইতেছে। দুর্বল অর্থনীতির দেশ হইতে শুরু করিয়া শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ—সকলে ব্যবসায়-বাণিজ্য দোকান-পসরা বন্ধ রাখিয়া ভাইরাস মুক্তির অপেক্ষায় থাকিতে বাধ্য হইতেছে। আর এই বহুরূপী ভাইরাসও বিভিন্ন রকম চরিত্র বদলাইয়া বিশ্বব্যাপী মানবসমাজকে ধাওয়া করিয়া চলিয়াছে। মোদ্দা কথা, অনিচ্ছা সত্ত্বেও সমগ্র পৃথিবীর মানুষকে একটি নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডারে প্রবেশ করাইয়াছে এই পরিস্থিতি। গত দুই বত্সরে বন্ধ হইয়া গিয়াছে বন্ধু-স্বজনের সহিত সম্মুখ আড্ডা-আলোচনা। যে কোনো বয়সের মানুষকেই ‘ঘর হ’তে শুধু দুই পা ফেলিয়া’ বাহিরে যাইতে হইলে ভাসিয়া উঠিতেছে ভাইরাস-শঙ্কা। পরিবর্তন আসিয়াছে খাদ্যাভ্যাস, পোশাক এমনকি শখ-আহ্লাদেও; কিন্তু এই সকল বিষয় এখন প্রধান উদ্বেগের বিষয় নহে। মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা ক্রমেই দুর্বল হইয়া পড়িতেছে।
ক্ষেত্রবিশেষে তাহা প্রাণঘাতী হইয়া উঠিয়াছে। বিশ্বের অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী দেশগুলিতেও অসংখ্য কোম্পানি-ফ্যাক্টরি লে অফ ঘোষণা করিতে বাধ্য হইয়াছে। প্রথম দিকে ভাবা হইয়াছিল—ইহা হয়তো অতি সাময়িক সমস্যা, যাহার ধাক্কা বিশ্ব শিগ্গিরই কাটাইয়া উঠিতে পারিবে; কিন্তু এই করোনা সংক্রমণের একের পর এক ঢেউ এবং নূতন ভ্যারিয়েন্ট আক্ষরিক অর্থেই এখন বিচলিত করিয়া তুলিয়াছে বিশ্ব অর্থনীতিকে। আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাধাগ্রস্ত হইতেছে ব্যাপকভাবে, যাহা পুনরায় গড়িয়া তুলিবার তাগিদ অনুভব করিতেছেন বিশ্বের নেতৃবৃন্দ। কোভিডকে কেন্দ্র করিয়া বেশ কিছু দেশে ইতিমধ্যেই দেখা দিয়াছে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা। বহু দেশের শিক্ষাব্যবস্থা হইয়া পড়িয়াছে স্হবির। বিশেষ করিয়া উন্নয়নশীল বিশ্বের পরিস্থিতি যথেষ্ট সঙ্গিন। গ্লোবাল ফান্ড ফর ওমেন এবং গ্লোবাল ফান্ড ফর চিলড্রেন বলিতেছে, দারিদ্র্য চক্র উন্নয়নশীল বিশ্বে অস্বাভাবিক বিস্তার করিতেছে। ব্যাহত হইতেছে শিক্ষা, পুষ্টি ও খাদ্যনিরাপত্তা। উন্নয়নশীল বিশ্বে ব্যবসায়-বাণিজ্যের অনেক পণ্য গোডাউনেই পড়িয়া থাকিতেছে। হতাশার এই মুহূর্তে বড় দিকটি হইল ওমিক্রন নামক ভ্যারিয়েন্ট। এই নূতন ভ্যারিয়েন্ট একেকটি জনবহুল দেশে দিনে লক্ষাধিক মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হইতেছে। ফলে শুধু যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া নহে; ভারত বাংলাদেশের মতো দেশগুলিতেও মানুষের চলাচলে লাগাম টানিয়া ধরিতে বাধ্য হইতেছে সরকারগুলি। ভ্যাকসিন প্রদানের কাজ চলিতেছে বটে; কিন্তু তাহাও এখন পর্যন্ত কোনো দেশকেই কোভিড হইতে সম্পূর্ণ চিন্তামুক্ত করিতে পারে নাই। বলা হইতেছে—টিকা গ্রহণ করিলে অসুখ হইবে না তাহা নহে, তবে হয়তো মৃত্যু ঠেকানো যাইবে। ইহাও বিশ্ববাসীকে এক দ্বিধার মধ্যে রাখিয়াছে। বলিবার অপেক্ষা রাখে না যে, উন্নয়শীল দেশগুলির সার্বিক অবস্থা করুণতর। একদিকে আমদানি-রপ্তানি বিঘ্নিত হইতেছে, দ্বিতীয়ত কাঁচামালের মূল্য সকল ক্ষেত্রে বৃদ্ধি পাইতেছে। ফলে এই সকল দেশের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় অর্থনৈতিক সংকট নিকট হইতে আরো নিকটতর হইতেছে। সীমিত সম্পদের দেশগুলিতে এমনিতেই অসন্তোষের মাত্রা অধিক।
অধিকন্তু সমালোচনাও সহ্য করিতে হয় অধিক; কিন্তু এই সকল দেশের অর্থনীতির দিকে তাকাইয়া দেখিতে হইবে। শত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও অর্থনীতি ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে আনা যাইতেছে না। বাংলাদেশও ইহার ব্যতিক্রম নহে। তাই কবির ভাষায় বলিতে হয়, ‘সম্মুখে উদাস বর্ণহীন/ ক্ষীণছন্দ মন্দগতি তব রাত্রিদিন।’ তাই বলিয়া বসিয়া থাকিলেও চলিবে না। একদিকে যেমন স্বাস্থ্যগত দিকে সর্বোচ্চ সতর্কতা গ্রহণ করিতে হইবে, অন্যদিকে সীমিত হইলেও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাইয়া যাইতে হইবে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কোনো খাত যেন উপেক্ষিত থাকিয়া না যায়, তাহা চক্ষু খুলিয়া নজর রাখিতে হইবে।