ছয় বত্সর পূর্বে সাভারে রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের গার্মেন্টস কারখানাগুলির নিরাপত্তামান লইয়া বিশ্বব্যাপী প্রশ্নের সম্মুখীন হইতে হইয়াছিল। ইহার পরিপ্রেক্ষিতে ইউরোপ ও আমেরিকাভিত্তিক ক্রেতাদের সমন্বয়ে অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্স নামে দুইটি জোট তাহাদের পণ্য সরবরাহকারী কারখানা পরীক্ষা, সংস্কার ও দেখভালের উদ্যোগ গ্রহণ করে। আশার কথা হইল, ওই দুইটি জোটের আওতাধীন প্রায় দুই হাজার দুই শত কারখানা গত সাড়ে পাঁচ বত্সরে ৯০ শতাংশের উপরে নিরাপত্তা ত্রুটির সংস্কারকাজ সম্পন্ন করিয়াছে। এই দুইটি জোটের বাহিরে থাকা আরও দেড় হাজার কারখানা সংস্কারের উদ্যোগ লইয়াছে সরকার। তবে এতসব উদ্যোগের পরও প্রায় এক-চতুর্থাংশ গার্মেন্টস কারখানা ভবনের কাঠামো এখনো ত্রুটিমুক্ত হয় নাই। শ্রম মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের (ডিআইএফই) হিসাব অনুযায়ী, এখনো অন্তত ২৩ শতাংশ কারখানা ভবনের কাঠামোয় ত্রুটি রহিয়াছে। ডিআইএফই ২০১৮ সালের জানুয়ারি হইতে ডিসেম্বর অবধি এক হাজার ৫৫০টি গার্মেন্টস কারখানার কর্মপরিবেশের ওপর জরিপ চালাইয়া এই তথ্য পাইয়াছে। ইহা ছাড়াও কারখানার অগ্নিপ্রতিরোধ ও বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় পূর্ণাঙ্গ অগ্রগতি হয় নাই। আলোচ্য সময়ে বৈদ্যুতিক নিরাপত্তায় ত্রুটি রহিয়াছে ২৮ শতাংশ কারখানার আর অগ্নিনিরাপত্তা সংক্রান্ত ত্রুটি রহিয়াছে ১৩ শতাংশ কারখানায়। ডিআইএফই-এর হিসাবে, বিজিএমইএভুক্ত কারখানা ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তায় ৭৯ শতাংশ কারখানা নিরাপদ। আর বিকেএমইএভুক্ত কারখানায় এই হার ৭৪ শতাংশ।
যদিও ইত্তেফাকে প্রকাশিত এই সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বিজিএমইএ-এর সভাপতি দাবি করিয়াছেন যে, বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ-এর সদস্যভুক্ত কোনো কারখানা ভবনের কাঠামো এখন আর অনিরাপদ নহে। বরং তাহারা ডিআইএফই-এর মূল্যায়নের ভিত্তি লইয়া প্রশ্ন তুলিয়াছেন। তবে শ্রম মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের তথা ডিআইএফই নিশ্চয়ই উপযুক্ত জরিপ ও তথ্যপ্রমাণাদি ছাড়া এই ধরনের গুরুতর তথ্য প্রকাশ করে নাই। এমনকী সংস্কারে পিছাইয়া থাকা কারখানাগুলিকে ইতোমধ্যে চিঠি দিয়াছে ডিআইএফই। ইহা ছাড়া বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ-এর সদস্যভুক্ত যেই সকল কারখানা সংস্কারে অনেক পিছাইয়া রহিয়াছে, তাহাদের ইউটিলিটি ডিক্লারেশন বা কাঁচামাল আমদানির প্রাপ্যতা (ইউডি সেবা) বন্ধ রাখিবার জন্যও সংগঠন দুইটিকে চিঠি পাঠাইয়াছে ডিআইএফই।
নিঃসন্দেহে অনেক কারখানারই পরিবেশগত উন্নতি হইয়াছে। তবে দেশের শতভাগ কারখানা সার্বিক বিবেচনায় যথাযথ মানের হইয়া উঠিয়াছে, সেই দাবি করিবার সময় এখনো আসে নাই। বিগত কয়েক বত্সরে টাকার বিপরীতে ডলারের অবমূল্যায়নের কারণে নানা সময়ে রফতানি প্রবৃদ্ধি শ্লথ হইয়াছে। শ্রমিক অসন্তোষও পোশাক খাতের বড় একটি সমস্যা। মাঝেমধ্যেই বিভিন্ন এলাকায় পোশাক কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনা ঘটে। আশার কথা হইল, এতসব সমস্যার পরও গত পাঁচ বত্সরে দেশে বিশ্বমানের অনেক কারখানা হইয়াছে।
দেশের পোশাক খাতকে আগাইয়া নেওয়া ছাড়া বিকল্প কিছু নাই। কিছু কিছু চ্যালেঞ্জ রহিয়াছে, যাহা নিরসনে সরকারের সহযোগিতা দরকার। আর, কিছু সংকট দূর করিতে দরকার সংশ্লিষ্টদের প্রকৃত সদিচ্ছা। সুতরাং এই খাতের বৃহত্তর ও সুদূরপ্রসারি স্বার্থে বিরাজমান সংকটসমূহ নিরসনে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা আবশ্যক।