প্রতিবছর ২৩ ফেব্রুয়ারি যখন ফিরে আসে স্মৃতির পাতায় অনেক কথা ভেসে ওঠে। আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ এই দিনটিকে গভীরভাবে স্মরণ করি। ১৯৬৯-এর ২৩ ফেব্রুয়ারির পর থেকে বঙ্গবন্ধুর একান্ত সান্নিধ্য পেয়েছি। এবারে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি প্রদানের ৫০ বছর। দেখতে দেখতে অর্ধশত বছর পেরিয়ে গেল। প্রিয় নেতা তাঁর যৌবনের তেরোটি মূল্যবান বছর পাকিস্তানের কারাগারে কাটিয়েছেন। কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বসে যে-নেতা প্রিয় মাতৃভূমি বাংলার ছবি হূদয় দিয়ে এঁকেছেন, ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন, সেই নেতাকে সেদিন জাতির পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞচিত্তে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। তিনি শুধু বাঙালি জাতিরই মহান নেতা ছিলেন না, সারাবিশ্বের নিপীড়িত মানুষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নেতা ছিলেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপরই তিনি উপলব্ধি করেছিলেন এই পাকিস্তান বাঙালিদের জন্য হয়নি। একদিন বাংলার ভাগ্যনিয়ন্তা বাঙালিদের হতে হবে। সেই লক্ষ্যকে সামনে নিয়ে ’৪৮-এর ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগ এবং ’৪৯-এর ২৩ জুন আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা করেন। তারপর সংগ্রামের সুদীর্ঘ পথে নেতৃত্ব দিয়ে মহান বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন সংগঠিত করার মধ্যদিয়ে স্বাধীন ও সার্বভৌম ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠা করেন।
আমরা ’৬৯-এর ৪ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ডাকসু’ কার্যালয়ে ডাকসু’র ভিপি হিসেবে আমার সভাপতিত্বে এবং সতীর্থ ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে এক সংবাদ সম্মেলনের মধ্যদিয়ে ছাত্রদের ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফর্ম ‘কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন এবং ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচি ১১ দফা ঘোষণা করি। এরপর ১৭ জানুয়ারি যে আন্দোলন আমরা শুরু করি, ২০ জানুয়ারি শহীদ আসাদের রক্তাক্ত জামা হাতে নিয়ে যে শপথ গ্রহণ করি, ২৪ জানুয়ারি মতিউর-মকবুল-রুস্তম-আলমগীরের রক্তের মধ্যদিয়ে সেই আন্দোলন সর্বব্যাপী গণঅভ্যুত্থান সৃষ্টি করে। ৯ ফেব্রুয়ারি ‘শপথ দিবসে’ পল্টন ময়দানে সভাপতির ভাষণ শেষে স্লোগান তুলি: ‘শপথ নিলাম শপথ নিলাম মুজিব তোমায় মুক্ত করবো; শপথ নিলাম শপথ নিলাম মা-গো তোমায় মুক্ত করবো।’ ১৫ ফেব্রুয়ারি সার্জেন্ট জহুরুল হক এবং ১৮ ফেব্রুয়ারি ড. শামসুজ্জোহা নিরাপত্তা বাহিনীর বুলেটে নির্মমভাবে নিহত হলে বাংলার মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। বিক্ষুব্ধ মানুষকে দমাতে সরকার সান্ধ্য আইন জারি করে। আমরা সান্ধ্য আইন ভঙ্গ করে রাজপথে মিছিল করি এবং ২০ ফেব্রুয়ারি সমগ্র ঢাকা নগরীকে মশাল আর মিছিলের নগরীতে পরিণত করি। ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবসে পল্টনের মহসমুদ্রে আমরা ১০ ছাত্রনেতা প্রিয় নেতা শেখ মুজিবসহ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় আটক সকলের নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে স্বৈরশাসকের উদ্দেশে ২৪ ঘন্টার আল্টিমেটাম প্রদান করি। সমগ্র দেশ গণবিস্ফোরণে প্রকম্পিত হয়। জনরোষের ভয়ে ২২ ফেব্রুয়ারি আইয়ুব খান আগরতলা মামলা সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে বঙ্গবন্ধুসহ সকল রাজবন্দিকে নিঃশর্ত মুক্তি দিলে দেশজুড়ে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। প্রিয় নেতাকে কারামুক্ত করার মধ্যদিয়ে শপথ দিবসে প্রদত্ত স্লোগানের প্রথমাংশ ‘মুজিব তোমায় মুক্ত করবো’, এবং ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে হাতিয়ার তুলে নিয়ে যুদ্ধ করে প্রিয় মাতৃভূমিকে হানাদারমুক্ত করে স্লোগানের দ্বিতীয়াংশ ‘মা-গো তোমায় মুক্ত করবো’ বাস্তবায়ন করেছিলাম।
বস্তুত, ’৬৬-র ৮ মে’র গভীর রাতে ৬ দফা কর্মসূচি প্রদানের অভিযোগে দেশরক্ষা আইনে যে মুজিব গ্রেফতার হয়েছিলেন, ৩৩ মাস পর ’৬৯-এর ২২ ফেব্রুয়ারি যে মুজিব মুক্তিলাভ করেন—নাম বিচারে এক হলেও, বাস্তবে ঐ দুই মুজিবের মধ্যে ছিল গুণগত ফারাক। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাটি ছিল সমগ্র বাঙালি জাতির জন্য অগ্নিপরীক্ষার মতো। সেই অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তিনি বন্দিদশা থেকে মুক্ত মানব হয়ে বেরিয়ে আসেন। বঙ্গবন্ধু মুক্তি পাওয়ার পর ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাসভবনে পৌঁছে দেওয়া হয়। খবর পেয়ে আমি ছুটে যাই। বঙ্গবন্ধু অপেক্ষা করছিলেন। ইতোমধ্যে পল্টন ময়দানে লাখ লাখ লোক জমায়েত হয়। তারা ভেবেছিল বঙ্গবন্ধু পল্টনে যাবেন। বঙ্গবন্ধুকে ৩২ নম্বর থেকে পল্টনে নেওয়ার পথে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, না, পল্টনে না, মহান নেতাকে আমরা আগামীকাল ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে (আজকের সোহরাওয়ার্দী উদ্যান), সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে গণসংবর্ধনা জ্ঞাপন করবো। লাখ লাখ মানুষ প্রিয় নেতাকে একনজর দেখার অপেক্ষায় অধীর আগ্রহে আছে। আকস্মিকভাবে তিনি যদি এখানে আসেন তবে মানুষ প্রিয় নেতাকে দেখা থেকে বঞ্চিত হবেন। তখন বঙ্গবন্ধুকে পল্টনে না নিয়ে বর্তমান যে শিক্ষা ভবন সেখান থেকে গাড়ি ঘুরিয়ে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ হয়ে তাঁকে ৩২ নম্বর বাসভবনে পৌঁছে দিয়ে পল্টনে ছুটে গিয়ে সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত সকল রাজবন্দির উপস্থিতিতে এই সংবাদটি ঘোষণা করি যে, আগামীকাল প্রিয় নেতাকে ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে গণসংবর্ধনা প্রদান করা হবে। প্রিয় নেতাকে একনজর দেখবে বলে ৩২ নম্বর শুধু না, সারা ঢাকা শহরের রাজপথে তখন লাখ লাখ মানুষের ঢল।
পরদিন ঐতিহাসিক ২৩ ফেব্রুয়ারি। শুধুমাত্র আমার জীবনে না, সমগ্র বাঙালি জাতির জীবনে এক ঐতিহাসিক দিন। কারণ এই দিনটিতে যে নেতা কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বছরের পর বছর কাটিয়েছেন, বারবার ফাঁসির মঞ্চে গিয়েছেন, সেই প্রিয় নেতাকে আমরা কৃতজ্ঞ বাঙালি জাতির পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞচিত্তে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দিয়েছিলাম। সেই সংবর্ধনা সভায় সভাপতিত্ব করার দুর্লভ সৌভাগ্যের অধিকারী আমি। ডাকসু’র ভিপি থাকার কারণে সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক, মুখপাত্র এবং সমন্বয়ক ছিলাম। প্রতিটি সভায় সভাপতিত্ব করতাম।
আজকের সোহরাওয়ার্দী উদ্যান সেদিন ১০ লক্ষাধিক মানুষের উপস্থিতিতে কানায় কানায় পূর্ণ। সেই জনসমুদ্রের মানুষকে যখন জিজ্ঞাসা করেছিলাম, যে নেতা জীবনের যৌবন কাটিয়েছেন পাকিস্তানের কারাগারে, ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন, সেই প্রিয় নেতাকে কৃতজ্ঞ বাঙালি জাতির পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞচিত্তে একটি উপাধি দিতে চাই। ১০ লাখ মানুষ যখন ২০ লাখ হাত উত্তোলন করেছিল সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। তখনই প্রিয় নেতাকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। পরবর্তীকালে এই উপাধিটি জনপ্রিয় হয়েছে, জাতির জনকের নামের অংশ হয়েছে এবং আজকে তো শুধু ‘বঙ্গবন্ধু’ বললেই সারাবিশ্বের মানুষ এক ডাকে চিনে। নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু, মহাত্মা গান্ধী, রবীন্দ্রনাথ যাঁকে মহাত্মা উপাধি দিয়েছিলেন, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, শেরে বাংলা একে ফজলুল হকসহ পৃথিবীতে অনেকেই উপাধি পেয়েছেন। কিন্তু ফাঁসির মঞ্চ থেকে মুক্ত হয়ে, গণমানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে, এমন আনুষ্ঠানিকতার মধ্যদিয়ে কেউ উপাধি পাননি।
এরকম নেতা পৃথিবীতে জন্মাননি। কোনোদিন জন্মাবেনও না। সেই নেতার সান্নিধ্য লাভ করেছি। কাছে থেকে দেখেছি মানুষের প্রতি তাঁর সুগভীর ভালোবাসা ও মমত্ববোধ। এই মহামানবের কোনো মৃত্যু নেই। তাঁর সৃষ্ট মহত্তর কর্মই তাঁকে অমরত্ব দান করেছে। ভাষণ দিয়েছিলেন: ’৭১-এর সাতই মার্চ। যে ভাষণ আজ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ভাষণ হিসেবে ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পেয়েছে। অলিখিত একটি ভাষণ। আব্রাহাম লিংকন ৩ মিনিটের লিখিত ভাষণ দিয়েছেন। মার্টিন লুথার কিং ১৭ মিনিটের লিখিত ভাষণ দিয়েছেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ভাষণ অলিখিত এবং লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতিতে প্রদত্ত। চোখের চশমাটা পোডিয়ামে রেখে চতুর্দিকে তাকিয়ে যা তিনি বিশ্বাস করতেন হূদয়ের গভীরতা থেকে তা উচ্চারণ করে নিরস্ত্র বাঙালিকে সশস্ত্র জাতিতে রূপান্তরিত করে পৃথিবীর ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ ভাষণের মর্যাদায় আমাদের অভিষিক্ত করেছেন। মানুষ জন্মগ্রহণ করলে মৃত্যুবরণ করতে হয়। আমারও সময় এসেছে। একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেছি, যে গ্রাম ছিল অন্ধকার, যে গ্রামে অন্ধকারে লেখাপড়া করতে হতো হারিকেন জালিয়ে, যে গ্রামে খালি পায়ে স্কুলে যেতে হতো, সেই প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে একটি ছেলে এসে বঙ্গবন্ধুর মতো বিশ্বখ্যাত মহান নেতার সান্নিধ্য লাভ করেছে। আমি সৌভাগ্যবান মানুষ। এর থেকে অধিক চাওয়া-পাওয়ার আমার আর কিছুই নেই।
আজকের বাংলাদেশ অনেক উন্নতি করেছে, এগিয়েছে। একদা যে বাংলাদেশকে কতিপয় অর্থনীতিবিদ তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে বলতেন: ‘বাংলাদেশ হবে দরিদ্র দেশের মডেল। বাংলাদেশ হবে তলাবিহীন ঝুড়ি।’ আজকে তারাই বলেন: ‘বিস্ময়কর উত্থান এই বাংলাদেশের।’ গ্রামাঞ্চলের মানুষের জীবনে স্বাচ্ছন্দ্য এসেছে, দেশের গ্রামগুলো এখন শহরে রূপান্তরিত হয়েছে। এই যে উত্থান বাংলাদেশের এর প্রত্যেকটির ভিত্তি বঙ্গবন্ধু স্থাপন করেছেন। আজ যে স্যাটেলাইট মহাকাশে সফলভাবে উেক্ষপিত হয়েছে, বেতবুনিয়ায় ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র উদ্বোধনের মাধ্যমে সেই কাজটি তিনি করেছেন। সমুদ্রসীমা নির্ধারণের কাজ বঙ্গবন্ধু শুরু করেন। ভারতের সাথে সীমান্ত চুক্তি বঙ্গবন্ধু করেন। যমুনা সেতু নির্মাণে জাপানের অর্থায়নের জন্য জাপান সরকারের সাথে কথা বলেন। ধ্বংসপ্রাপ্ত ভৈরব ব্রিজ, হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পুনঃনির্মাণ করেন। বিশ্বের অধিকাংশ দেশের স্বীকৃতি আদায় করেন। যখন তিনি ধ্বংসপ্রাপ্ত-যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটাকে স্বাভাবিক করলেন, ঠিক তখনই ঘাতকের দল জাতির জনককে নির্মমভাবে হত্যা করলো। আজ তিনি নেই, আর কোনোদিন ফিরে আসবেন না। কিন্তু এই পৃথিবী যতদিন থাকবে, এই দেশের মাটি ও মানুষ যতদিন থাকবে দেশের মানুষের হূদয়ের মণিকোঠায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অক্ষয় এবং অমর হয়ে থাকবেন।
n লেখক : আওয়ামী লীগ নেতা, সংসদ সদস্য, সভাপতি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি
tofailahmed69¦gmail.com