রিয়া ও রিফাতের বিয়ের দুই বছর পূর্ণ হয়েছিল। আর কয়দিন পর প্রথম সন্তানের মুখ দেখতেন তারা। সন্তানকে ঘিরে নিশ্চয়ই তাদের বুকে বাসা বেঁধেছিল নানা রঙিন স্বপ্ন। কিন্তু মুহূর্তেই সব স্বপ্ন ও নিজেদের জীবন অগ্নিকাণ্ডের ভয়াবহ লেলিহান শিখায় পুড়ে ছারখার হয়ে গেল। বলছি ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে পুরান ঢাকার চকবাজারে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের কথা। পুরো জাতি তখন ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে, একুশের প্রথম প্রহর শেষ হতে না হতেই সবকিছু শোকের সাগরে ভাসিয়ে নিয়ে রাতটি অভিশপ্ত হয়ে দাঁড়ায়। এ ঘটনায় শুধু রিয়া ও রিফাত নয় জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করে দিয়েছে চকবাজারের চুড়িহাট্টা মহল্লার পাঁচটি বিশাল অট্টালিকা। কেড়ে নিয়েছে ৭০ জনেরও বেশি মানুষের প্রাণ ও তাদের ভবিষ্যত্ স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা। ২০১০ সালের ৩ জুন রাতে নিমতলীতে ঘটে যাওয়া অগ্নিকাণ্ডে ১১৭ জন তাজা প্রাণ নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার পর আবারো সেই একই এলাকায় একই ধরনের দুর্ঘটনায় সত্যিই জাতি স্তব্ধ, হতবাক। অগ্নিকাণ্ডের ভয়াবহ শিখায় সেদিনের চকবাজার পরিণত হয়েছিল অভিশপ্ত শ্মশানে, যেখানে শিশু, নারী, পুরুষ ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে যেন চিতার আগুনে পুড়ে নিঃশেষ হয়েছে। যদিও একে দুর্ঘটনা না বলে হত্যাকাণ্ড বলাটাই বোধ করি বেশি সমীচীন। কেননা একই ঘটনা বার বার ঘটতে থাকলে এবং তা প্রতিরোধে যদি কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয় তখন তা আর দুর্ঘটনার পর্যায়ে থাকে না।
আমাদের ঢাকা শহরে অপরিকল্পিত নগরায়নের সকল বৈশিষ্ট্য আস্তে আস্তে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। অনেক এলাকা বিশেষ করে পুরান ঢাকা এতটাই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে যে তা বাসযোগ্য কোনো এলাকা কিনা-সন্দেহ। সাধারণত আবাসিক এলাকা ও বাণিজ্যিক এলাকা ভিন্ন ভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠার কথা। বিশেষ করে দাহ্য পদার্থের ব্যবসা কোনো ভাবেই আবাসিক এলাকায় হওয়ার কথা নয়। কেননা অগ্নিকাণ্ডের মতো দুর্ঘটনা মুহূর্তেই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধন করতে পারে। চকবাজারে অগ্নিকাণ্ড যে কারণেই ঘটুক না কেন এখানে কেমিক্যাল বা দাহ্য পদার্থের গোডাউন না থাকলে ক্ষয়ক্ষতি নিশ্চয়ই এত ভয়াবহ হতো না। ঘিঞ্জি গলির মধ্যে বসতি ও নানা ধরনের বাণিজ্য বিশেষ করে কেমিক্যাল বা দাহ্য পদার্থের বাণিজ্য একসঙ্গে হবার ফলে এলাকাটি মৃত্যুকূপে পরিণত হয়েছে। তা ছাড়া ভবন ও রাস্তাগুলো এতটাই অপরিকল্পিত যে, দুর্ঘটনা ঘটার পর উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা কোনো সুদক্ষ বাহিনীর পক্ষেও কঠিন হয়ে দাঁড়ায় ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বহুগুণে বেড়ে যায়। নিমতলী ও চকবাজারের অগ্নিকাণ্ডের ভয়াবহতার এটিও অন্যতম কারণ।
নিমতলীর ঘটনারই যেন পুনরাবৃত্তি চকবাজারের এই ভয়াবহ ঘটনা। অনেক দিক দিয়েই দুটি ঘটনার মিল খুঁছে পাওয়া যায়। একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে নিমতলীর সেদিনের ভয়াবহ ঘটনার কোনো শিক্ষাই প্রশাসন এমনকি এখানে বসবাসরত কেউই নেয়নি। যে কেমিক্যাল গোডাউন নিয়ে এত আলোচনা, এত সমালোচনা সেই কেমিক্যাল বাণিজ্য অনেক বাসাবাড়ির নিচতলার দোকান এমনকি বেডরুম পর্যন্ত ঢুকে পড়েছে। আর এসবের রমরমা বাণিজ্য প্রশাসনের অগোচরে জমে উঠেছিল-তাও বলা যাবে না। মানুষের বেঁচে থাকার জন্যই ব্যবসা-বাণিজ্য, কিন্তু সেই বাণিজ্যই যদি মৃত্যুর কারণ হয় তবে তা সরিয়ে নিরাপদ স্থানে নেওয়াই কাম্য। কিন্তু শুধু তাই নয় যারা এসব ব্যবসার সঙ্গে কোনভাবে সম্পৃক্ত নয় তারা কেন এর ভয়াবহতার শিকার হবে।
প্রতিটি অগ্নিকাণ্ডের পর উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠিত হয়, প্রশাসনের নানা হুঙ্কার ও পদক্ষেপের কথা শোনা যায়। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই সবকিছু ঢাকা পড়ে, আমরাও ভুলে যাই। নিমতলীর ঘটনার পরও তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছিল। কিন্তু তার পুরো বাস্তবায়ন জাতি দেখতে পায়নি।
তদন্ত কমিটি গঠন কি তাহলে লোক দেখানো, আর যদি তাই না হয়ে থাকে তবে তদন্তের ফলাফল কেন আলোর মুখ দেখে না বা দেখলেও কেন বাস্তবায়ন হয় না-বিষয়টি নিয়ে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি তদন্ত প্রতিবেদন যদি প্রকাশিত হয়েও থাকে তবে তা কেন বাস্তবায়িত হয় না। বাস্তবায়িত না হওয়ার পিছনে যারা দায়ী তাদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সকলকে উদ্যোগী হতে হবে। তা ছাড়া যারা এখানে বসবাস করেন তাদেরও সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা কি বাঁচতে চান নাকি ব্যবসা করতে চান।
যাদের জীবন আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়ে ছাই হয়েছে কেবল তাদের স্বজনরাই বুঝতে পারছে-এ যন্ত্রণার ভার বহন করা কতটা কঠিন। তাদের এ আর্তনাদ রাষ্ট্রযন্ত্রকে কতটা নাড়া দিতে পারবে তা কেবল ভবিষ্যতই বলে দিবে।
n লেখক:সহকারী অধ্যাপক, সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়