মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকেও অচলাবস্থা কাটেনি

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবি) ভিসি অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদের পদত্যাগের দাবিতে চলমান অনশন কর্মসূচির একশ ঘণ্টা পার হয়েছে রবিবার সন্ধ্যায়। কিন্তু শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকেও সংকটের সমাধান না হওয়ায় আন্দোলনকারীরা এবার নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। চলমান আমরণ অনশন কর্মসূচির পাশাপাশি ভিসির বাসভবনে পুলিশ ও সংবাদকর্মী ছাড়া আর কাউকে ঢুকতে দেবেন না তারা। ঐ বাসভবনে সামনে গতকাল বিকালে মানব শিকল গড়ে তুলেন তারা।

সন্ধ্যায় মশাল মিছিলেরও কর্মসূচি দেওয়া হয়। এর আগে শনিবার তারা প্রতীকী কফিন বহন করে কাফনের কাপড় পরে ক্যাম্পাসে মৌন মিছিল বের করে। এছাড়া শিক্ষার্থীরা গতকাল রাত পৌনে আটটার দিকে ভিসির বাসভবনের বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী সাদিয়া আফরিন এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। এর আগে বিকেলে সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষার্থীদের পক্ষে মোহাইমিনুল বাশার রাজ বলেন, শিক্ষার্থীরা প্রায় ১০০ ঘণ্টা ধরে অনশন করছেন। অথচ এখন পর্যন্ত উপাচার্যের পদত্যাগের কোনো লক্ষণ নেই। এ অবস্থা চলতে থাকলে আমরা উপাচার্যকে পূর্ণ অবরুদ্ধ করতে বাধ্য হব।

এদিকে শিক্ষার্থীদের চলমান অনশনে অংশ নেওয়া ২৩ জনের সাথে নতুন করে ৫ জন যোগ দিয়েছেন। অনশনে অংশ নেওয়া মোট ২৮ জনের মধ্যে ১৭ জন হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। তারা হাসপাতালের বেড থেকেই অনশন পালন করছেন। অনশনে অংশগ্রহণকারীদের শারীরিক অবস্থা দিনে দিনে খারাপের দিকে চলে যাওয়ায় সর্বত্র উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। গতকাল বিএনপির পক্ষ থেকে অসুস্থ শিক্ষার্থীদের শারীরিক খোঁজ নিতে দলের স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক ডা. রফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি চিকিৎসক টিম সিলেট পৌঁছায়।

শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনা: শাবির সংকট নিরসনে শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনা করছেন আন্দোলনকারীরা। কিন্তু গতকাল পর্যন্ত কোন সমাধানে পৌঁছাতে পারেনি উভয়পক্ষ। জানা গেছে, শনিবার দিবাগত রাত ২টার দিকে শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা শুরু করে আন্দোলনকারীরা। শাবির আইআইসিটি ভবনে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেলের মধ্যস্থতায় এ ভার্চুয়াল আলোচনায় শিক্ষামন্ত্রী অনশনকারীদের অনশন ভাঙার আহ্বান জানান। তবে তারা ভিসির পদত্যাগ করার আগ পর্যন্ত অনশন ভাঙতে সম্মত হয়নি। এসময় শিক্ষামন্ত্রী শাবির ভিসির বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনে অভিযোগগুলো লিখিত আকারে তাকে (শিক্ষামন্ত্রী) দেওয়ার জন্য বলেন। এর আগে শুক্রবার দুপুর হতে সন্ধ্যা পর্যন্ত আরো দু’দফা আলোচনা হয় শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে। এই আলোচনায় শিক্ষামন্ত্রী আন্দোলনকারীদের একটি প্রতিনিধি দলকে ঢাকায় যাওয়ার জন্য বলেন। প্রথমে আন্দোলনকারীরা ঢাকায় যেতে রাজি হলেও পরে তারা মত পাল্টিয়ে শিক্ষামন্ত্রীকে আলোচনার জন্য সিলেট আসার আহ্বান জানান। আর তা যদি সম্ভব না হয় তাহলে ভার্চুয়ালি আলোচনা করার আহ্বান জানান।

আন্দোলনে একাত্মতা দুই ঢাবি শিক্ষার্থীর: এদিকে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে একাত্মতা জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থী। মাহফুজুর রহমান ও নাঈম হাসান নামের এ দুই শিক্ষার্থী ঢাকা থেকে এসে শাবির ভিসির বাসভবনের সামনে অবস্থান নিয়ে সংহতি প্রকাশ করেন। এসময় তারা বলেন, অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ পদত্যাগ না করলে তারা ঢাবি থেকেও আন্দোলন শুরু করবেন। গতকাল এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ছাত্রলীগ নেতারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে শিক্ষার্থীদের এ ন্যায্য দাবি মেনে নিয়ে সমস্যা সমাধানে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ জানিয়েছেন।

সহিংসতার দায় নিবে না আন্দোলনকারীরা: আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা দেশের বাইরে থেকে যারা আন্দোলনে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন তাদের ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে বলেন, এই আন্দোলনকে কেউ যদি তাদের নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য ব্যবহার করতে চায় এবং সহিংসতায় জড়ায় তবে তার দায় ভার কোন ভাবেই আন্দোলনরত সাধারণ শিক্ষার্থীরা নিবে না। গণমাধ্যমে পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে তারা এ তথ্য জানান।

সরকারকে পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ শাবি শিক্ষক সমিতির: ভিসির পদত্যাগের ব্যাপারে সরকারকে পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে শাবি শিক্ষক সমিতি। গতকাল রাতে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়, ভিসির পদত্যাগের বিষয়টি সরকারের এখতিয়ারভুক্ত, এক্ষেত্রে অতি দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য অনুরোধ করা যাচ্ছে। এছাড়া শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের ওপর বর্বরোচিত পুলিশি হামলার তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করা হয়। অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে দায়ীদের চিহ্নিত করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণেরও দাবি জানান তারা।

এছাড়া শাবির উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য দায়িত্বরত প্রশাসন দায় এড়াতে পারে না বলে জানিয়েছেন শাবির মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ শিক্ষকরা। শনিবার রাতে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে পরিষদের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মস্তাবুর রহমান বলেন, দুঃখজনকভাবে লক্ষ করছি যে দায়িত্বশীল ব্যক্তিগণ শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের আক্রমণের ব্যাপারে কোনো অফিশিয়াল ব্যাখ্যা প্রকাশ্যে না দিয়ে কালক্ষেপণ করে অনশনরত শিক্ষার্থীদের জীবন চরম সংকটের মুখে ঠেলে দিচ্ছেন। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যাবতীয় বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক ব্যক্তিদের প্রত্যেকের অফিশিয়াল ব্যাখ্যা জনসমক্ষে উপস্থাপন করার দাবি জানান তিনি।

সিলেট শহীদ মিনারে প্রতীকী অনশন: আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে সিলেটে প্রতীকী অনশন করেছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। শনিবার বিকেল চারটায় সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে এই প্রতীকী অনশন করেন তারা। অনশনে বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করেন। তারা বলেন, সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে যে ভিসি পুলিশকে হামলার নির্দেশ দেন তার এ পদে থাকার কোনো অধিকার নেই। তাকে অবিলম্বে পদত্যাগ করতে হবে।

গত ১৩ জানুয়ারি শাবির একটি ছাত্রী হলের ছোট সমস্যাকে কেন্দ্র করে ঐ হলের প্রোভোস্টের পদত্যাগ দাবি করেন ছাত্রীরা। কিন্তু ঐ সমস্যার সমাধান না করে শাবি ক্যাম্পাসে পুলিশের হামলা, গুলি চালানো ও শিক্ষার্থী আহত হলে ক্যাম্পাস উত্তাল হয়ে উঠে। এক পর্যায়ে পুলিশী তৎপরতার জন্য শিক্ষার্থীরা ভিসি অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিনকে দায়ী করে আন্দোলন শুরু করে।

ঢাবিতে মানববন্ধন: বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার জানান, শাবি শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে গতকাল বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে ‘সাস্টের পাশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’ ব্যানারে মানববন্ধন করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।