ঝালকাঠির সুগন্ধা লঞ্চে আগুন দুর্ঘটনার একমাস পূর্ণ হয়েছে। এ ঘটনায় নিখোঁজ ব্যক্তিদের কি পরিণতি হয়েছে তা এখনো জানেন না স্বজনরা। তবে নিখোঁজ কেউ যে ফিরবে না, মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে এখন শুধু অপেক্ষা কি পরিণতি হয়েছে তা জানতে। জেলা প্রশাসনের কাছে মোট ৩০ জনের বিপরীতে ৪৮ জন স্বজন নমুনা দেন। ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফলের জন্য এখন অপেক্ষা করছেন, যাতে অন্তত তারা কবরটি শনাক্ত করতে পারেন।
বরগুনা জেলা প্রশাসনের তথ্য মতে, সুগন্ধা ট্রাজেডিতে এখনো পর্যন্ত নিহত হয়েছেন ৪৮ জন। এর মধ্যে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ৪১ জনের মরদেহ উদ্ধার ও চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরো ছয় জন মারা যান। এছাড়া ২ ও ৩ জানুয়ারি ঢাকায় চিকিৎসাধীন দগ্ধ দুই জন ও সর্বশেষ ২১ জানুয়ারি আরো একজন নারী ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী, ঘটনার পর বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে দগ্ধ ও আহত হয়ে ভর্তি হয়েছিলেন ১০১ জন। এদের মধ্যে ১৯ জনকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে উন্নত চিকিৎসার জন্য স্থানান্তর করা হয়। যার মধ্যে চার জনের মৃত্যু হয়েছে। বাকিরা নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র (আইসিইউতে) চিকিৎসাধীন আছেন। নিহত ৪৮ জনের মধ্যে শনাক্ত না হওয়ায় ২৩ জনকে বরগুনা ও একজনকে ঝালকাঠিতেসহ মোট ২৪ জনকে দাফন করে জেলা প্রশাসন। আর বাকি ২৪ জনের মরদেহ শনাক্ত করে নিয়ে যান স্বজনরা। ঘটনার পর বরগুনা জেলা প্রশাসন নিখোঁজ ব্যক্তিদের তালিকা তৈরি করে। ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত জেলা প্রশাসনের কাছে ৩০ জন নিখোঁজ থাকার তথ্য দিয়েছেন স্বজনরা। ২৭ ডিসেম্বর সিআইডির ফরেনসিক বিভাগ ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ শুরু করেন এবং নিখোঁজ ৩০ জনের বিপরীতে ৪৮ জন স্বজনের নমুনা সংগ্রহ করেন। ঐ সময় সিআইডির নমুনা পরীক্ষক রবিউল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান, পরীক্ষার ফলাফল পেতে একমাসের বেশি সময় লাগতে পারে। ঘটনার একমাস পূর্ণ হলেও নিখোঁজ ব্যক্তিদের কোনো তথ্য জানতে পারেননি স্বজনরা। এদিকে পরিবারের কর্মক্ষম ব্যক্তিদের হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন অনেকে। এদের মধ্যে কয়েক জন নারী ও শিশু রয়েছে যারা অভিভাবকহীন অবস্থায় আত্মীয়স্বজনদের আশ্রিত হয়ে আছেন। বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার চরদুয়ানী ইউনিয়নে ছোট টেংরা গ্রামের আফজাল হোসেনের মেয়ে স্বামী পরিত্যক্তা ফজিলা আক্তার পপির এখনো খোঁজ মেলেনি। পপির মেয়ে লামিয়া তার নানু আফজাল হোসেনের আশ্রয়ে মা ফেরার অপেক্ষা করছেন।
বরগুনা সদর উপজেলা বুড়িরচর ইউনিয়নের হাকিম শরীফ, তার স্ত্রী পাখী বেগম ও শিশুসন্তান নাসরুল্লাহ নিখোঁজ রয়েছেন। হাকিম শরীফের তিন সন্তান হাফসা বেগম (১৮), সুমাইয়া আক্তার (১৪) ও ফজলুল হক (১০) এখন অভিভাবকহীন। তাদের দেখভাল ও ভরণ-পোষণের কেউ নেই। হাফসা বলেন, ‘আত্মীয়স্বজনদের সহায়তায় এহন মোগো তিন ভাইবুইনের খাওন পড়ন চলে। এইরহম কতদিন কেডা মোগো দ্যাকপে।’
বরগুনা সদর উপজেলার মোল্লাহোরা গ্রামের বাসিন্দা সুমন সরদার ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে লঞ্চে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় তার স্ত্রী তাসলিমা, দুই মেয়ে সুমাইয়া আক্তার (১৫) ও সুমনা আক্তার (১২) এখনো নিখোঁজ। জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে নিহতদের মধ্যে শনাক্ত হওয়া ২৪টি পরিবারকে ২৫ হাজার করে টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। তবে নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনদের কোনো সহায়তা এখনো দেওয়া হয়নি।
বরগুনা জেলা নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ কমিটির সভাপতি মনির হোসেন কামাল বলেন, এ ঘটনায় অনেক নারী ও শিশু এখন অভিভাবকহীন, কেউ কেউ আর্থিক টানাপোড়েনে মানবেতর জীবনযাপন করছেন, আমি মনে করি এই পরিবারগুলোর সুরক্ষায় রাষ্ট্রের পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
জেলা প্রশাসক হাবিবুর রহমান বলেন, নিহতের স্বজনদের আমরা প্রাথমিকভাবে ২৫ হাজার করে টাকা আর্থিক সহায়তা দিয়েছি। ডিএনএ পরীক্ষার নমুনা পেলেই ঠিক কতজন নিখোঁজ আছেন, এটা শনাক্ত ও নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারগুলোকে চিহ্নিত করতে পারব। এরপর ‘সোশ্যাল সেফটি নেটের আওতায়’ বিশেষভাবে তাদের সহায়তার আওতায় আনা হবে।