নিমতলীর পর চকবাজার। ঘটনা ঘটলেই আলোচনা, এরপর সব শেষ। ঘনবসতিপূর্ণ পুরান ঢাকা যেন পরিণত হয়েছে কেমিক্যাল নগরীতে। ওই এলাকায় একটি বাড়িও খুঁজে পাওয় যাবে না, যেখানে কেমিক্যাল নেই। প্রতিটি বাড়ির নিচে কেমিক্যালে ঠাসা। সর্বশেষ চকবাজারের ওয়াহিদ ম্যানশন নামে যে বাড়িটিতে আগুন লেগেছিল, সেই বাড়িটির নিচে বেজমেন্টে বস্তার পর বস্তা, কন্টেইনারের স্তূপ- সবকিছুই শুধুই কেমিক্যাল। কোনটা অতি দাহ্য পদার্থ, কোনটা কম দাহ্য পদার্থ। ভাগ্য ভালো আগুন নিচ পর্যন্ত পৌঁছেনি। তাহলে ভবনটি বিকটতম বিস্ফোরণে উড়েও যেতে পারত! গতকাল শুক্রবার সরেজমিনে ভবনটির নিচে কেমিক্যালের স্তূপ দেখা গেছে।
ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন) মেজর শাকিল নেওয়াজ গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, ‘ওয়াহিদ ম্যানশনের নিচে যে পরিমাণ কেমিক্যালের মজুদ পাওয়া গেছে, সেখান পর্যন্ত আগুন পৌঁছলে ভয়াবহ ঘটনা ঘটতে পারত। এমনকি ভবনটি উড়ে যেতে পারত। ফায়ার সার্ভিসের তল্লাশিতে সেখানে অতি দাহ্য ও কম দাহ্য পদার্থ পাওয়া গেছে। ফায়ার সার্ভিস দ্রুত পানি দেওয়ার কারণে আগুন নিচের দিকে যেতে পারেনি। পুরো ভবনে দেওয়া পানি নিচে চলে যাওয়ায় এই দাহ্য পদার্থে আগুন ছড়িয়ে পড়তে পারেনি।’ গতকাল সরেজমিন পুরনো ঢাকা ঘুরে দেখা গেছে, ছোট-বড় অজস্র দোকান, সেখানে বিক্রি হচ্ছে দাহ্য পদার্থ। যদিও কেমিক্যালের গোডাউনগুলো বন্ধ করে রাখা হয়েছে। যুগ যুগ ধরে পুরনো ঢাকায় রয়েছে কেমিক্যাল গোডাউনগুলো। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) ২০১৭ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, পুরান ঢাকায় রয়েছে ২৫ হাজার কেমিক্যাল গোডাউন বা রাসায়নিক দাহ্য বস্তুর গুদাম। এসবের মধ্যে ১৫ হাজার আছে খোদ বাসা-বাড়িতেই। মাত্র আড়াই হাজার গুদামকে ট্রেড লাইসেন্স দিয়েছে সিটি করপোরেশন। বাকি ২২ হাজারের বেশি গুদামই অবৈধ। ২০০ ধরনের ক্ষতিকর ও ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিকের ব্যবসা চলে এখানে।
পুরান ঢাকার এসব গুদামে রয়েছে গ্লিসারিন, সোডিয়াম অ্যানহাইড্রোস, সোডিয়াম থায়োসালফেট, হাইড্রোজেন পার অক্সাইড, মিথাইল ইথাইল কাইটন, থিনার, আইসোপ্রোইলসহ ভয়ঙ্কর রাসায়নিক দাহ্য পদার্থ। এসব রাসায়নিক সামান্য আগুনের স্পর্শ পেলেই ঘটতে পারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা। ফলে পুরনো ঢাকার মানুষ মৃত্যু ঝুঁকি নিয়েই বসবাস করছেন। গত কয়েক বছরে রাসায়নিক সংশ্লিষ্ট কারণে রাজধানীতে যতগুলো অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে, তার সব ক’টিই ঘটেছে পুরনো ঢাকায়। এসব আগুনে মারাও যাচ্ছে মানুষ।
বিস্ফোরক অধিদফতরের প্রধান পরিদর্শক শামসুল আলম গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমরা পেট্রোলিয়াম জাতীয় দ্রব্যের অনুমোন দেই। পুরনো ঢাকায় আমাদের অনুমোদিত কোনো গুদাম নেই। যেগুলো আছে সেগুলো সবই অবৈধ।’ দিনের পর দিন এগুলো কীভাবে চলছে? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘মাঝে মধ্যেই সিটি কর্পোরেশন-জেলা প্রশাসন সেখানে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে অভিযান চালাচ্ছে। অবৈধ গুদামগুলো সিলগালা করা হচ্ছে, জরিমানা করা হচ্ছে। অনেককে জেলেও পাঠানো হচ্ছে। আমরা সহযোগিতা করি।’
পুরানো ঢাকার বিভিন্ন বাসা-বাড়িতে ঘুরে দেখা গেছে, অনেক আবাসিক ভবনের নিচতলার পার্কিং স্পেস ব্যবহূত হচ্ছে রাসায়নিক গুদাম হিসেবে। কিছু বাড়িতে রাসায়নিক পণ্যের কারখানাও আছে। প্রকাশ্যে এসব গুদাম থেকে কেমিক্যাল আনা নেওয়া করছে ব্যবসায়ীরা। সবার চোখের সামনে এই ঘটনাগুলো ঘটলেও দেখার কেউ নেই। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যে আড়াই হাজারকে ট্রেড লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে, সেটাও ঠিক হয়নি। কাকে ট্রেড লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে সে বিষয়েও খোঁজ নেওয়া হচ্ছে না। ফলে কর্তৃপক্ষ- গুদাম মালিক কেউই আইন মানছেন না।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা ইউসুফ আলী সরদার জানান, এসব কারখানা সরাতে আমরা বারবার প্রতিষ্ঠানের মালিকদের কাছে চিঠি থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত উদ্যোগে জনসচেতনতা তৈরির চেষ্টা করেছি। কিন্তু ব্যবসায়ীরা এখান থেকে সরছেন না। গত বছর কিছু কারখানার বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে অভিযানও পরিচালনা করা হয়েছে। এই এলাকায় যাতে কোন প্রকার ব্যবসা না করতে পারে তা বন্ধ করতে এলাকার ছোট-বড় সব কেমিক্যাল কারখানা ও গোডাউনের আগে দেওয়া সব ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন পর্যন্ত বন্ধ করে দিয়েছি। এরপরও তারা আইন অমান্য করে অবৈধভাবেই ব্যবসা চালাচ্ছেন।
ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে আরমানিটোলা, বাবুবাজার, মিটফোর্ড, চকবাজার, কামরাঙ্গীরচর, লালবাগ, ইসলামপুরসহ আশপাশের এলাকা পরিদর্শন করে আবাসিক ভবনে গড়ে ওঠা ঝুঁকিপূর্ণ চার শতাধিক প্রতিষ্ঠানের তালিকা প্রস্তুত করেছে। এসব গুদাম ও কারখানার অধিকাংশেরই বৈধ কাগজপত্র ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের অনুমোদন নেই। ফায়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালক (ডিডি-অপারেশন) দেবাশীষ বর্ধন বলেন, কেমিক্যাল গোডাউনের ৯৮ ভাগই অবৈধ। মাত্র দুই ভাগ গোডাউনের অনুমোদন রয়েছে। সেসব গোডাউন রয়েছে বুড়িগঙ্গার ওপারে। তিনি বলেন, ফায়ার সার্ভিস চাইলেও এসব গোডাউন উচ্ছেদ করতে পারে না। উচ্ছেদ করতে হলে পুলিশ, সিটি করপোরেশন ও বিস্ফোরক পরিদফতরসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সহায়তা প্রয়োজন।
জানা গেছে, ২০১১ সালের ২০ এপ্রিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকে ঢাকা মহানগরের আবাসিক এলাকা থেকে অবৈধ রাসায়নিক কারখানা ও গুদামগুলো কামরাঙ্গীরচর ও কেরানীগঞ্জে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এজন্য বিসিকের চেয়ারম্যানকে প্রধান করে একটি এবং শিল্প মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিবকে প্রধান করে আরেকটি টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ২০১৪ সালের ৩ জুন শিল্প সচিব বলেছিলেন, ‘কেমিক্যাল পল্লীতে সাততলা ১৭টি ভবন তৈরি করে গুদাম সরানো হবে।’ পরের বছর ২ ফেব্রুয়ারি কেরানীগঞ্জে ২০ একর জায়গায় পল্লী স্থাপন করার কথা বলেন তিনি।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করেন শিক্ষক ও গবেষক আফসান চৌধুরী। তার মতে, ‘এই দুর্ঘটনার দায় গোটা ব্যবস্থার। নিমতলীর ঘটনার পর ৩৮টি সুপারিশ দেওয়া হয়েছিল। সেগুলোর কয়টা বাস্তবায়ন হয়েছে? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, এসব দাহ্য পদার্থ সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। আবার ফিরে এসেছে। প্রশ্ন হলো, ফিরে যেন না আসতে পারে সেটা দেখবে কে?’
কেমিক্যাল পল্লীতে সরিয়ে নেওয়ার কাজ কতদূর? এমন প্রশ্নের জবাবে শিল্প সচিব আব্দুল হালিম সাংবাদিকদের বলেন, ‘কেমিক্যাল পল্লী প্রকল্পটি ২০২১ সাল পর্যন্ত। ৫০ একরের প্রকল্প। প্রায় ৯৫০ গুদাম সরানো যাবে।’