‘আমার পোলা, বউমা আর নাতির লাশ চাই’

স্ত্রী একটি প্রতিষ্ঠানের হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা। প্রতিদিন রাত ৮টার মধ্যে বাসায় ফেরেন। বুধবার রাতে কর্মস্থল থেকে ফিরতে দেরি হবে দেখে স্বামী সালেহ মোহাম্মদ লিপুকে ফোন দেন যেন আদরের সন্তানকে নিয়ে অফিসে আসেন। অফিস থেকে বাড়ি ফেরার পথে চকবাজারের রাজমহল হোটেলে রাতের খাবার সেরে নেবেন। রিকশায় চুড়িহাট্টার রাজমহল হোটেলের সামনে দাঁড়াতেই আগুনের বিস্ফোরণ। মুহূর্তের মধ্যে সব শেষ।

গতকাল শুক্রবার ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গের সামনে এসব জানালেন নিহত সালেহ মোহাম্মদ লিপুর ভাই ইসমাইল হোসেন। তিনি বলেন, লিপু চকবাজারে ইগলু আইসক্রিমের বিপণন কর্মকর্তা। স্ত্রী নাসরিন জাহান মদিনা গ্রুপের হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা। ছেলের নাম আফতাহী। এই তিন সদস্যের পরিবারের স্বপ্ন এখন পুড়ে অঙ্গার। ছেলে, ছেলের বউ আর নাতির লাশ শনাক্তের জন্য বৃদ্ধ লাল মিয়া সিআইডির ফরেনসিক বিভাগে ডিএনএ নমুনা দেন। তিনি বলেন, ‘পোলা, পোলার বউ আর নাতির লাশটা চাই। ক্যামনে কমু যে হ্যারা আগুনে পুইড়া গেছে। বিশ্বাস করি ক্যামনে।’

ছোট্ট সানিন। বয়স সবে মাত্র ৫ বছর। মামার কোলে চড়ে এসেছে ঢাকা মেডিক্যাল মর্গে। শিশুটি তার মামাকে বার বার বলছিলো, মামা আম্মু কোথায়? আম্মুকে দেখবো। ভাগনির এমন আবদারে মামা   ইসরাফিল শুধুই অঝোরে কেঁদেছেন, কোনো উত্তর দিতে পারেননি। ছোট্ট মেয়েটি জানেনা তার মুখ থেকে নেয়া বাক্কাল কোষের ডিএনএ নুমনায় মাকে হয়তো পাওয়া যাবে তবে জীবিত নয়, পুড়ে অঙ্গার হওয়া মাকে। গত বুধবার দুই বোনকে বাসায় রেখে ওষুধ কিনতে বাসা থেকে বের হয়ে আর ফেরেনি সানিনের মা হালিমা। সানিনের পাঁচ মাস বয়সী ছোট্ট বোনটাও সারাক্ষণ কাঁদছে, মায়ের অপেক্ষায়!

বড় ভাই সাজ্জাদ হোসেন দুলু খুঁজছেন ছোট ভাই আনোয়ার হোসেন মঞ্জুকে। তিনি বলেন, মা বলেছে - মঞ্জুরে ছাড়া তুই ঢাকা থেকে আসিস না। কোথায় পাবো ভাইকে। মর্গে অঙ্গার হয়ে যাওয়া লাশগুলোর মধ্যে খুঁজেছি। খুঁজেছি চুড়িহাট্টার ধ্বংসস্তুপের মাঝেও। কি নিয়ে বাড়ি যাবো, বলতে পারেন? এমন প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে ঢাকা মেডিক্যাল মর্গের সামনে কান্না করছিলেন তিনি। নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী থেকে মা রাহেলা বেগম ফোন করে বার বার বিলাপ করছিলেন। বলছিলেন, ‘আমার পোলার পোড়া লাশটা হলেও আইনো।’ সাজ্জাদ হোসেন দুলু বলেন, ভাইকে তো খুঁজে পেলাম না। পোড়া লাশ উল্টে পাল্টে দেখেছি। কিন্তু ভাইকে মেলাতে পারিনি। মাকে গিয়ে কি জবাব দিবো। বড় ভাই সাজ্জাদের ‘হায়দার মেডিকো’ নামে একটা ফার্মেসি ছিলো চুড়িহাট্টায়। তিনি ২০০২ সালে ভাই মঞ্জুকে ছেড়ে দিয়ে অন্য ব্যবসা শুরু করেন। এরপর থেকেই ওই ফার্মেসির ব্যবসা করতো মঞ্জু।

এদিকে পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাওয়া লাশের মধ্যে থেকে গতকালও সোলায়মান হোসেন (২০) নামে একজনের লাশ শনাক্ত করে নিয়ে গেছেন স্বজনরা।

লাশ দাফন

নোয়াখালী প্রতিনিধি জানান, ঢাকার চকবাজারের অগ্নিকান্ডে নিহতের ঘটনায় নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীসহ বিভিন্ন উপজেলার বাড়িতে বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকা থেকে নিহতদের লাশ এলাকায় পৌঁছলে এক হূদয়বিদারক দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। লাশ পৌঁছার পর বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত থেকে শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত ১৩ জন দাফন সম্পন্ন হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ব্যবসায়ী ও দোকান কর্মচারী রয়েছেন। অগ্নিকান্ডে নিহত ১৩ জনের মধ্যে ১০ জন সোনাইমুড়ির, ২ জন বেগমগঞ্জের ও ১ জন কোম্পানীগঞ্জের। সোনাইমুড়ী থানার ওসি আবদুস সামাদ এ তথ্য দিয়েছেন।

নোয়াখালী জেলা প্রশাসক তন্ময় দাস ও পুলিশ সুপার ইলিয়াস শরীফ জানান, সোনাইমুড়ির নাটেশ্বর ইউনিয়নের ঘোষকামতা গ্রামের সাহেব উল্লার দুই ছেলে মাসুদ রানা ও মাহাবুবুর রহমান রাজু, পশ্চিম নাটেশ্বর গ্রামের মৃত ভুলু মিয়ার ছেলে মোহাম্মদ আলী হোসেন, নাটেশ্বর গ্রামের সৈয়দ আহমদের ছেলে হেলাল হোসেন, মৃত সুরুজ মিয়ার ছেলে সিদ্দিক উল্লা, মির্জানগর গ্রামের মমিন উল্যার ছেলে সাহাদাত হোসেন হিরা, মৃত গাউছ আলমের ছেলে নাছির উদ্দিন, চানগাঁ গ্রামের রফিকুল মিয়ার স্ত্রী নয়না, ওয়াসিকপুরের আলী আযমের ছেলে আব্দুর রহিম দুলাল, বারোগা ইউনিয়নে দৌলতপুর গ্রামের আবুল কাশেমের ছেলে আনোয়ার হোসেনের লাশ দাফন করা হয়েছে।

অপরদিকে, বেগমগঞ্জ উপজেলার মুজাহিদপুর গ্রামের নূর মোহাম্মদের ছেলে কামাল হোসেন, হরিদবল্লভপুরের মাহফুজুর রহমানের ছেলে মোশারফ হোসেন ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চরএলাহী গ্রামের শহিদুল হকের ছেলে জসিম উদ্দিন লাশ তাদের পারিবারিক কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন করা হয়েছে।