দায় এড়ানোর চেষ্টা সবার, তদন্ত কমিটিগুলোর পরস্পরবিরোধী বক্তব্য

চকবাজারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত উত্স কি? এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। এই প্রশ্নের জবাবে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর গঠিত তদন্ত কমিটিসমূহ পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিয়েছে। এসব বক্তব্যের মধ্য দিয়ে কার্যত সকলের মধ্যেই দায় এড়ানোর চেষ্টা পরিলক্ষিত হচ্ছে।

শিল্প মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রাথমিক প্রতিবেদনে ‘নিশ্চিত’ করে বলা হয়েছে, এই দুর্ঘটনা কেমিক্যাল  থেকে নয়, গ্যাস থেকে ঘটেছে। ২১ ফেব্রুয়ারি উদ্ধার অভিযান শেষ হওয়ার মাত্র ৬ ঘণ্টার মধ্যেই শিল্প মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটি একথা বলে দেয়। এই তদন্ত প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন নিজেও বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘কেমিক্যাল নয়, গ্যাসের কারণে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।’

গতকাল শুক্রবার ক্ষতিগ্রস্ত ভবন পরিদর্শনে এসে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক (প্রশিক্ষণ, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) লে. কর্নেল এস এম জুলফিকার রহমান বলেছেন, চকবাজারের ওয়াহিদ ম্যানশনে অবশ্যই কেমিক্যাল ছিল। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করে পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে সুপারিশ করার জন্য ১১ সদস্যর কমিটি করেছে। জুলফিকার রহমান এই কমিটির একজন সদস্য। গতকাল সকাল ৯টার দিকে দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসে জুলফিকার রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ভবনের ভেতরে গ্যাস লাইটার রিফিলের পদার্থ ছিল। এটা নিজেই একটা দাহ্য পদার্থ। এছাড়া অন্যান্য কেমিক্যালও ছিল। প্রত্যেকটা জিনিসই আগুন দ্রুত ছড়িয়ে দিতে সহায়তা করেছে। পারফিউমের বোতলে রিফিল করা হতো এখানে। সেই বোতলগুলো ব্লাস্ট হয়ে বোমের মতো কাজ করেছে। এগুলো আগুনকে টিগার করেছে, যে কারণে আগুন ছড়িয়ে পড়েছে। কেমিক্যালের কারণে এভাবে ছড়িয়েছে। না হলে কখনোই আগুন এভাবে ছড়ায় না। আমরা দেখেছি এখানে যে জিনিসগুলো আছে সেগুলো অবশ্যই কেমিক্যাল। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ওয়াহিদ ম্যানশনে কেমিক্যাল ছিল না-শিল্পমন্ত্রী কথাটা কোন আঙ্গিকে বলেছেন এটা আমার জানা নেই।’

জুলফিকার রহমান আরও বলেন, চুড়িহাট্টায় অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলোতে রাসায়নিকের মজুত ছিল বলেই আগুন দ্রুত ছড়িয়েছিল এবং দীর্ঘস্থায়ী হয়েছিল। এখানে ভবনগুলোর মধ্যে সুগন্ধির ক্যান ছাড়াও লাইটার রিফিল করার ক্যান ছিল। এগুলো সবগুলো   অবশ্যই কেমিক্যাল। ডিএসসিসি গঠিত তদন্ত কমিটির আরেক সদস্য বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুর কৌশল বিভাগের প্রফেসর ড. মেহেদী আহমেদ আনসারী গতকাল দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শনকালে বলেছেন, ‘ভবনের দ্বিতীয় তলাটা পুরোটাই গুদাম ছিল। ওই ভবনে আগুন নির্বাপণের ব্যবস্থা ছিল না বললেই চলে।’ রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) অথরাইজড অফিসার নুরুজ্জামান জাহিদ বলেন, ‘এই ভবনটি রাজউক অনুমোদিত কিনা আমরা ওভাবে এখনও তথ্য নিতে পারিনি।’ ডিএসসিসি’র প্রধান প্রকৌশলী রেজাউল করিম বলেন, ‘এখানে কিন্তু কোনো কেমিক্যালের লাইসেন্স দেওয়া হয়নি, কোনো লাইসেন্স রিনিউ করা হয়নি। এগুলোর জন্য আলাদা কমিটি গঠন করা হয়েছে। কেন আগুন লেগেছে এবং কারা এই ঘটনার জন্য দায়ী কমিটি ডিএসসিসি গঠিত তদন্ত কমিটি সে বিষয়ে তদন্ত করবে।’

শিল্প মন্ত্রণালয়, রাজউক ও ডিএসসিসি থেকে এরকম বক্তব্য আসার পাশাপাশি কেউ কেউ চকবাজারে আগুন লাগার কারণ হিসেবে ট্রান্সফরমার বিস্ফোরণের কথা বলছেন। তবে ঢাকা বিদ্যুত্ বিতরণ কোম্পানির (ডিপিডিসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিকাশ দেওয়ান দাবি করেছেন, বুধবার রাতে সেখানে কোনো ট্রান্সফরমার বিস্ফোরিত হয়নি। আগুনের কারণেই তিনটি বিদ্যুতের খুঁটি ও বৈদ্যুতিক তার পুড়ে গেছে। চকবাজারের ঘটনায় ডিপিডিসি’র পক্ষ থেকে দুই সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সদস্যরা হলেন লালবাগ জোনের দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলী সারোয়ার কায়নাত ও প্রধান প্রকৌশলী আমিনুল ইসলাম মুকুল। তারা আজ শনিবারের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেবেন।

অগ্নিকাণ্ডে সরকারি সংস্থার কোনো অবহেলা আছে কি-না, তা খতিয়ে দেখা হবে গতকাল জানিয়েছে ঘটনার উত্স ও কারণ অনুসন্ধানে গঠিত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি। অগ্নিকাণ্ডের উত্স খুঁজে বের করা ও ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনা না ঘটে সেজন্য কর্মপন্থা নির্ধারণ করে সরকারকে সুপারিশ দেওয়ার জন্য এই পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব প্রদীপ রঞ্জন চক্রবর্তী গতকাল ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের বলেন, ‘অতীতে এরকম অনেক ঘটনা ঘটেছে, তদন্ত কমিটিও হয়েছে, তবে তদন্ত প্রতিবেদন এবার অবশ্যই আলোর মুখ দেখবে, এজন্যই আমরা এখানে এসেছি।’ প্রদীপ রঞ্জন চক্রবর্তী আরও বলেন, ‘আমরা উত্স এবং এর জন্য কে কে দায়ী, সেটা নির্ণয়ের চেষ্টা করব।

দুর্ঘটনাস্থলের বাসিন্দাদের ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চ দহনশীল রাসায়নিক পদার্থ বা কেমিক্যালের কারণেই চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। তাদের দাবি, এর মধ্য দিয়ে আগুনে পুড়ে যাওয়া ওয়াহেদ ম্যানসনের বেজমেন্টে কেমিক্যালের মজুদ পাওয়ার পর শিল্প মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির প্রাথমিক প্রতিবেদন সঠিক নয় বলে প্রমাণ হয়েছে। ঘটনাস্থলের আলামত দেখে সংশ্লিষ্টরা প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত যে, কেমিক্যালের কারণে এই অগ্নিকাণ্ড ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।

ডিএসসিসি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বিস্ফোরক পরিদফতরসহ সরকারের বিভিন্ন দফতরের তদন্ত দলের সদস্যরা গতকাল ওয়াহেদ ম্যানসনের বেজমেন্টে ড্রাম ভর্তি কেমিক্যাল থাকার প্রমাণ পেয়েছেন। বিস্ফোরক পরিদফতরের প্রধান পরিদর্শক শামসুল আলম গতকাল ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা পুড়ে যাওয়া কয়েকটি গাড়ি চেক করেছি। অনেকেই দুর্ঘটনাস্থলে থাকা যে পিকআপটির সিলিন্ডার বিস্ফোরণে আগুনের সূত্রপাতের কথা বলেছিল। কিন্তু সেই পিকআপের সিলিন্ডারটি অক্ষত অবস্থায় আছে। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে আমরা দেখেছি, এই এলাকায় বেশকিছু কেমিক্যালের দোকান রয়েছে। এছাড়া, ওয়াহেদ ম্যানশনের নিচে বেশকিছু প্লাস্টিকের দানার  দোকান ছিল। এ কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে।’

শিল্প মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি বৃহস্পতিবার দেওয়া প্রাথমিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, কেমিক্যালের কারণে নয়, গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে চকবাজারে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। গ্যাসের সিলিন্ডারটি ওয়াহেদ ম্যানসনের হোটেল বা ভবনটির সামনে একটি গাড়ি থেকে বিস্ফোরিত হয়। এমনকি অগ্নিদগ্ধ কারও দেহে কেমিক্যালের চিহ্ন বা গন্ধ পাওয়া যায়নি। প্রতিবেদন প্রকাশের আগে একইদিন দুপুর ১২টায় ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন বলেন, ‘চুড়িহাট্টায় কোনো কেমিক্যালের অস্তিত্ব ছিল না, গোডাউনও ছিল না। নিমতলী আর চকবাজারের ঘটনা একদম ভিন্ন। এটা কেমিক্যাল সম্পর্কিত কিছুই নয়। সিলিন্ডার থেকে এটা হয়েছে। আজকের ঘটনা ভিন্ন। আমি সরেজমিনে দেখে এসেছি। দিস ইজ ডিফারেন্ট স্টোরি।’

অথচ ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা গতকাল ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের বলেন, আমরা গোডাউনে মজুদ করা বস্তা ও ড্রামগুলো থেকে নমুনা নিয়েছি। তাতে দেখা গেছে- আয়রন অক্সাইড, আয়রোনিক ইয়োলো, ইঞ্জিনিয়ার কার্বন, অক্সাইড রেডবার ও এসিড গ্রিন রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদি তাই হয়ে থাকে, তাহলে মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটতে পারতো। কোনোভাবে আগুন নিচে গেলে এমনভাবে বিস্ফোরণ ঘটতো যা বিল্ডিংটাকে উড়িয়ে নিয়ে যেত। তখন এই আগুন পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়ত।