সিম ক্লোনিংয়ের প্রতারণা

এই ডিজিটাল যুগে যে কোনো নাগরিকের নিকট তাহার মোবাইল ফোন নম্বরটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, উহা তাহার জীবনকে একদিকে যেমন সহজ করিয়া দিয়াছে, অন্যদিকে উহার মাধ্যমে যে কেহ প্রতারণা করিয়া তাহার জীবনটি দুর্বিষহ করিয়া দিতে পারে। এমনকি যাহারা টেকনোলজি মোটামুটি জানেন বুঝেন, তাহারাই বিপদে পড়িতে পারেন। আর এই বিপদের নাম হইল মোবাইল ফোন সিম ক্লোনিং।

ইতিমধ্যে অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তি হইতে শুরু করিয়া সাধারণ মানুষের সিম নম্বর ক্লোন করিয়া অনেক ধরনের প্রতারণার ঘটনা ঘটিয়াছে। অনেক প্রতারক গ্রেফতার হইলেও বেশির ভাগ ধরাছোঁয়ার বাহিরেই থাকিয়া যায়। সম্প্রতি মোবাইল সিম ক্লোন করিয়া প্রতারণার ঘটনায় একটি প্রতারক চক্রকে গ্রেফতার করিয়াছে  র‌্যাব। র‌্যাব-৪-এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি প্রতারণার কৌশল সম্পর্কে বলেন, চক্রের সদস্যরা কিছু অসাধু মোবাইল সিমকার্ড বিক্রেতার মাধ্যমে রিকশাচালক, ভ্যানচালক, খেটে খাওয়া সহজ-সরল মানুষের এনআইডি দিয়া সিমকার্ড রেজিস্ট্রেশন করে। ইহার পর তাহারা সহজ-সরল মানুষকে টার্গেট করিত। অ্যাপস ব্যবহার করিয়া মোবাইল ফোন নম্বর ক্লোনিং করিয়া নিজেকে মোবাইল ব্যাংকিং হেড অফিসের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়া টার্গেট ব্যক্তিকে ফোন করিত তাহারা। ইহার পর কৌশলে তাহার (বিশেষ করিয়া এজেন্টদের) পিন কোড জানিয়া লইয়া অ্যাকাউন্টটি নিজের দখলে লইত। পরে নম্বর ক্লোন করিয়া সেই এলাকার এসআরের নিকট ঐ দোকানের পরিচয় দিয়া চাওয়া হইত মোটা অঙ্কের টাকা। টাকা অ্যাকাউন্টে জমা হওয়া মাত্রই নিজের দখলে থাকা অ্যাকাউন্ট হইতে কৌশল হিসাবে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তাহাদের চক্রের অন্য সদস্যদের নম্বরে স্থানান্তর করিয়া দিত।

আমরা আরো বিস্তারিত অনুসন্ধান করিয়া দেখিয়াছি যে, এই ধরনের প্রতারণা আরো চার-পাঁচ বৎসর ধরিয়াই ঘটিয়া আসিতেছে। সিম ক্লোনের প্রতারণা দুই ধরনের হইয়া থাকে। ধরা যাক, আপনি পথেঘাটে সাধারণ দোকানে কোথাও গিয়া নূতন সিম কিংবা হারাইয়া যাওয়া সিম তুলিতে গেলেন জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়া। যখন আপনি আঙুলের ছাপ দিয়া সিম তুলিতেছেন, তখন ছাপ ঠিকমতো পড়িতেছে না বলিয়া একাধিক বার ছাপ দিয়া আরো একটি নূতন সিম আপনার নামে নিবন্ধিত করিয়া রাখিল। তাহার পর সেই সিম দিয়া প্রতারকরা বিভিন্ন ধরনের অপরাধ করিল। তাহাদের অপরাধের জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি সিমের সূত্র ধরিয়া তদন্ত করেন তখন দেখা যায় যে সিমটি এমন একটি সাধারণ ব্যক্তির নামে নিবন্ধিত, যিনি জানেনই না তাহার নামে উহা নিবন্ধিত হইয়া আছে! ইহা ছাড়াও আমরা দেখিয়াছি যে, আরেক ধরনের প্রতারণা করা হয় বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সিম ক্লোন করিবার মাধ্যমে। সম্প্রতি বিভিন্ন জেলার ডিসি ও ইউএনওসহ সরকারি অফিসের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের মোবাইল ফোন নম্বর ক্লোন করিয়া বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও সাধারণ মানুষের সহিত প্রতারণা করিয়া হাতাইয়া নেওয়া হইয়াছে লক্ষ লক্ষ টাকা।

প্রযুক্তিবিদরা বলিয়া থাকেন, আপনি যখন দেখিবেন যে আপনার সিমটি বন্ধ হইয়া গিয়াছে তখন আপনি যদি অন্য কোনো নাম্বার হইতে আপনার নাম্বারে ফোন করিয়া যদি দেখেন যে আপনার নম্বরটিতে রিং হইতেছে, তাহা হইলে বুঝিবেন যে আপনার নাম্বারটি ক্লোনিংয়ের শিকার হইয়াছে। হ্যাকার প্রতারক চক্র প্রতারণা ছাড়াও টার্গেট ব্যক্তির সিম ক্লোন করা নম্বর দিয়া হুমকি, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালাইয়া থাকে। ইহা ছাড়া ক্লোন করা মোবাইল ফোনের সিম দিয়া ওটিপির মাধ্যমে টার্গেট ব্যক্তির ইমেইল, ফেসবুক আইডি, মেসেঞ্জার, ভাইবার, হোয়াটসঅ্যাপের মতো সেবা দখলে লইতে পারে। এইভাবে প্রতারকরা টার্গেট ব্যক্তিকে ভার্চুয়াল দুনিয়ায় তাহার ইমেজ ও সামাজিক অবস্থানও হুমকির মুখে ফেলিতে পারে। এমনকি রাষ্ট্রের জন্যও বিপদ ডাকিয়া আনিতে পারে সিম ক্লোনকারীরা।

নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি সিম কাহারো না কাহারো নামে নিবন্ধিত হইয়া থাকে। একজন ব্যক্তির এনআইডি দিয়া সর্বোচ্চ ২০টি মোবাইল ফোন সিম নিবন্ধন করা যায়। আবার একজন ব্যক্তি কতগুলি সিম নিবন্ধন করিয়াছে, তাহা বিশেষ নম্বরে এসএমএস করিয়া জানাও যায়। কিন্তু এতকিছু সিংহভাগ মানুষই জানেন না, বুঝা তো দূরের কথা। দুঃখের সহিত বলিতে হয়, এখনো অ্যাকটিভ বা পূর্বনিবন্ধিত সিম প্রকাশ্যে পথেঘাটে বিক্রয় হইতে দেখা যায়। সুতরাং স্বল্পশিক্ষিতের এই দেশে সাধারণ মানুষের সচেতন হওয়া ছাড়াও রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব রহিয়াছে এই ধরনের প্রতারণা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।