কুমিল্লা জাদুঘরের যাত্রা শুরু, ২ হাজারের বেশি দুর্লভ সংগ্রহ

গ্রামীণ জীবনের অনেক জিনিস হারিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে অধিকাংশ শিশু কৃষি যন্ত্রপাতি, খড়ম, ঢেঁকি, মাছ ধরার চাঁই, হারিকেন এসবের নামও জানে না। এ অবস্থায় নতুন প্রজন্মের কাছে গ্রামীণ সংস্কৃতির ইতিহাস-ঐতিহ্য তুলে ধরার জন্য কুমিল্লা নগরীর শিশু উদ্যানে স্থাপন করা হয়েছে ‘কুমিল্লা জাদুঘর’। ২ হাজারের বেশি দুর্লভ জিনিসপত্র রাখা আছে এখানে।

বৃহস্পতিবার (২৭ জানুয়ারি) কুমিল্লা জাদুঘরের উদ্বোধন করেন কুমিল্লা সিটি করপোরশনের (কুসিক) মেয়র মো. মনিরুল হক সাক্কু। শুক্রবার থেকে এ জাদুঘর শিশু ও দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেওয়া হয়।

শুক্রবার (২৮ জানুয়ারি) বিকালে নগর উদ্যানের কুমিল্লা জাদুঘরে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে রয়েছে রকমারি তৈজসপত্র, পুরোনো ২৫০টি রকমের তালা, টেপ রেকর্ডার, প্রাচীন রেডিও, হাতি, উট, হরিণ, বুনো মহিষের শিং ও মাথা, লাঙল, জোয়াল, মাছ ধরার চাঁই, তাঁতের চর্কি, পুরোনো দা, শত বছর আগের ইট, শিলা। এছাড়া আছে, ঢেঁকি, সুপারি কাটার ছড়তা, লাউয়ের ডুগডুগি, বিভিন্ন খনিজসম্পদ ও পাথর, পাললিক শিলা, হুঁকা, ঘোড়ার চামড়ার আসন, নান চাকু, খড়ম, হারিকেন, ৩২ কেজি ওজনের প্রাচীন ফ্যান, হ্যাজাগ লাইট, বিভিন্ন পশু-পাখির হাড়, প্রাচীন বাটখারা, লোহার পাল্লা, বাবুই পাখির বাসা, ১০০ দেশের প্রাচীন মুদ্রা, মিশরের কাঠের ভাস্কর্য, পিতলের  বদনা-চেরাগ, আছে বিন বাঁশিও। এখানে আছে প্রাচীন রুপার মুদ্রা, টেলিফোন, ঘোড়ার চামড়া, প্রাচীন ঘড়ি, প্রাচীন ছুরি, জায়গা মাপার লোহার শিকল, বেয়ারিংয়ের গাড়ি, বাংলা সিনেমার প্রাচীন রিল। আছে তালের নৌকা, পালকি, কলের গানের যন্ত্রপাতির মতো বিলুপ্ত সরঞ্জাম। এছাড়া প্রথম তৈরি টেলিভিশন, পুরাতন রেডিও সেট, টেলিফোন সেট, গরুর কাইর, পুরোনো দিনের ক্যামেরা, শ্রমিকদের কাজের লোহার সরঞ্জাম, কাসা-পিতলের ডেগসহ হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যবাহী ও দুর্লভ সরঞ্জাম রয়েছে এ জাদুঘরে।

কথা হয় কুমিল্লা জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা স্কুলশিক্ষক নাজমুল আবেদীনের সঙ্গে। তার বাবা শিক্ষাবিদ প্রয়াত ড. জয়নাল আবেদীন। নাজমুল আগে কুমিল্লা জিলা স্কুল ও নবাব ফয়জুন্নেছা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। তিনি শিক্ষকতা ও জাদুঘর তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন সৃজনশীল কাজ, ফটোগ্রাফি ও লেখালেখি করেন। তিনি জানান, ‘নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকে তিনি প্রাচীন জিনিসপত্র জমাতে থাকেন। বিলুপ্ত হওয়া বা অনেকটা বিলুপ্তির পথে এমন জিনিসপত্র সংগ্রহ করতে তিনি বিভিন্ন জেলায় ঘুরেছেন। এরপর গত চার বছর আগে নগরীর মগবাড়ি এলাকায় নিজের বাসার একটি কক্ষে প্রাচীন জিনিসপত্রের একটি সংগ্রহশালা (জাদুঘর) করেন।

গত ৩০ বছরের পরিশ্রমে তার জাদুঘরে এখন ৩০০ রকমের ২ হাজারের বেশি দুর্লভ সরঞ্জাম আছে। তিনি এ জাদুঘরের নাম দিয়েছেন—কুমিল্লা জাদুঘর। নগরীর শিশু উদ্যানে জাদুঘর করা এবং আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করে সহায়তার জন্য তিনি কুসিক মেয়রের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত জাদুঘর খোলা থাকবে, দর্শনার্থীদের কাছ থেকে ফি নেওয়া হয় তিন টাকা।’ কুমিল্লার ইতিহাসবিদ ও গবেষক আহসানুল কবীর বলেন, আধুনিকতার নামে আমরা যখন ইতিহাস-ঐতিহ্য বিনাশের পথে হেঁটে যাচ্ছি, সে সময় একজন সত্যিকারের ঐতিহ্য প্রেমিকের এই কাজটি সবার জন্য অনুকরণীয়। কুসিক মেয়র মো. মনিরুল হক সাক্কু বলেন, নতুন প্রজন্ম জাদুঘরে ঘুরে দুর্লভ জিনিসপত্র দেখার সুযোগ পাবে ও নাম জানতে পারবে।