পোশাকের রঙ দেখে দুই লাশ শনাক্ত

পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত ৬৭ জনের মধ্যে শনিবার পর্যন্ত ৪৮ জনের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। অজ্ঞাত ১৯টি মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করার লক্ষ্যে ৩৬ জনের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডি। গত শুক্রবার পর্যন্ত  ৪৬ জনের মরদেহ হস্তান্তর করেছিল ঢাকা জেলা প্রশাসন। শনিবার হস্তান্তরিত হয় জাফর আহমেদ (৪৩) ও আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর (৪১) মরদেহ। পোশাকের রঙ দেখে তাদের মরদেহ শনাক্ত করেন নিহতদের স্বজনরা।

যেভাবে শনাক্ত  হলো দুই লাশ:ছোট ভাইয়ের লাশ শনাক্তের জন্য দুই দিন ধরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে অপেক্ষা করছিলেন বড় ভাই সাজ্জাদুর রহমান দুলু। এ জন্য শুক্রবার সাজ্জাদ সিআইডির কাছে ডিএনএ নমুনাও দেন। গতকাল সকালে তিনি সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মরচুয়ারিতে রাখা ৫টি লাশ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। একটি লাশের শরীরে চামড়ার সঙ্গে জামা ও ট্রাউজারের অংশবিশেষ মিশে থাকতে দেখেন। এই অংশটুকু দেখে তিনি এটাকে তার ভাই আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর লাশ বলে দাবি করেন। সাজ্জাদ বলেন, ঘটনার দিন বৃহস্পতিবার সারাদিন চকবাজারে তার ছোট ভাইয়ের সঙ্গে ছিলেন। ওই সময় তার শার্টের সঙ্গে পরনের ট্রাউজারটা তার বেশ মনে পড়ছে। বিশেষ করে ট্রাউজারের অংশবিশেষ দেখে তার ভাইয়ের লাশ শনাক্ত করেন। পরে সকালে লাশ হস্তান্তর করা হয়। সন্ধ্যায় নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী থানার মির্জানগর গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে আনোয়ার হোসেনের দাফন সম্পন্ন হয়।

একইদিন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গ থেকে জাফর আহমেদের (৪৩) লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এর আগে দুপুরে মিটফোর্ড হাসপাতালের মরচুয়ারিতে লাশটি শনাক্ত করেন তার ছেলে রাজু (১৯)। রাজু বলেন, বাবার পরনে ছিল লাল রঙের শার্ট। জামার একটি অংশ পুড়ে যাওয়ায় চামড়ার সঙ্গে লেগেছিল। সেটা দেখেই শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।

নিহত জাফর আহমেদ চকবাজারের ৩/ক, সাত রওজা এলাকার একটি বাসায় সপরিবারে ভাড়া থাকতেন। সেখানেই প্লাস্টিকের ব্যাগ তৈরির কারখানা রয়েছে তার। ঘটনার সময় ওয়াহেদ ম্যানসনে প্লাস্টিকের দানা কেনার জন্য গিয়েছিলেন। জাফর আহমেদের স্ত্রীর নাম রোকেয়া বেগম। তাদের সন্তান সংখ্যা পাঁচ।

এ বিষয়ে ঢাকা জেলা ডিসি অফিসের সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুল্লাহ আল মাহফুজ বলেন, শনিবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত  দুটি মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এ নিয়ে মোট ৪৮টি লাশ হস্তান্তর হয়েছে। মরচুয়ারিতে রাখা আছে আরো ১৯টি লাশ। এর মধ্যে সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ মর্গের মরচুয়ারিতে ৪টি, মিটফোর্ড হাসপাতাল মর্গের মরচুয়ারিতে ৪টি, হূদরোগ ইন্সটিটিউট মরচুয়ারিতে ৫টি, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল মরচুয়ারিতে ৩টি ও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মরচুয়ারিতে ৩টি লাশ রাখা আছে।

সিআইডির ফরেনসিক বিভাগের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ রিয়াজুল হক বলেন, শুক্রবার থেকে শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ১৯টি অজ্ঞাত পরিচয়ের মরদেহের বিপরীতে এখন পর্যন্ত দাবিদার ৩৬ জনের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। আমরা এখন অপেক্ষা করছি মরদেহের দাবিদার আর কোনো স্বজন আসেন কিনা। কেউ আসলে আমরা তাদেরও ডিএনএ টেস্টের জন্য নমুনা সংগ্রহ করব। তবে রবিবার থেকে ফরেনসিক টিম ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে থাকবে না। এরপর থেকে নমুনা দিতে হলে সিআইডি কার্যালয়ে আসতে হবে।

যাদের পরিচয় শনাক্ত হয়েছে : অগ্নিকাণ্ডের পর উদ্ধার করা লাশের মধ্য থেকে যাদের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে তারা হলেন: কামাল হোসেন (৪০), অসি উদ্দিন (২৩), মোশাররফ হোসেন (৩৪), হাফেজ মো. কাওছার আহামেদ (২৬), আলী হোসেন (৬৫), ইয়াছিন (৩৩), শাহাদাত্ হোসেন (৩০), আবু বক্কর সিদ্দিক (২৭), জুম্মন (৫২), মজিবুর হাওলাদার (৫০), হেলাল উদ্দিন (৩২), আশরাফুল হক (২৭), ইমতিয়াজ ইমরোজ রাসু (২২), মো. সিদ্দিক উল্লাহ (৪৫), মাসুদ রানা (৩৫), আবু রায়হান (৩১), আরাফাত আলী (৩), মো. আলী (২২), মাহবুবুর রহমান রাজু (২৯), এনামুল হক কাজী (২৮), সিয়াম আরাফাত (১৯), ওমর ফারুক (৩০), সৈয়দ খবির উদ্দিন (৩৮), আয়েশা খাতুন (৪৫), নয়ন খান (২৫), আব্দুর রহিম (৫১), জসিম উদ্দিন (২২), জহির (৩), মিঠু (৩৮), সোনিয়া আকতার (২৮), বিল্লাল হোসেন (৪৭), ইসহাক ব্যাপারী (৩০), ইব্রাহিম (৩০), সুজন হক (৫৩), শামসুল হক (৬৮), পারভেজ (১৮), খোরশেদ আলম (২২), রাজু (১৮), সজীব (৩০), জয়নাল আবেদীন (৫৫), আনোয়ার হোসেন (২৮), নাসির উদ্দিন (২২), মো. আনোয়ার হোসেন (৩৫), শাহাদাত উল্লাহ হীরা (৩৩), সাইফুল ইসলাম (৩৪), সোলাইমান (২২), আনোয়ার হোসেন মঞ্জু (৪১) এবং জাফর আহামেদ (৪৩)।