চিত্কার করে কাঁদছেন কিন্তু শব্দ হচ্ছে না। চোখেও পানি নেই। দুই ছেলে ও তিন বছরের আদরের নাতিকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন বৃদ্ধা তারামন। ‘ছেলে দুইটা মইরা গেলো। আপনারা দয়া কইরা সরকাররে কইয়া একটু আর্থিক সাহায্যের ব্যবস্থা কইরেন।’ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গের সামনে দুই ছেলের মৃত্যুর শোকে চিত্কার করে কাঁদছেন তারামন। তবে চোখ দিয়ে পানি ঝরছে না। চোখের পানি শুকিয়ে গেছে তারামনের। একটি ভবনের দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন সদ্যবিধবা হওয়া দুই ছেলের স্ত্রীরা। পাশেই চিত্কার করে কাঁদছেন তারামনের দুই মেয়ে। চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ আগুনে দুই ছেলে মোহাম্মদ আলী ও অপু রায়হান এবং তিন বছরের নাতি পুড়ে মারা গেছে। সংসারের উপার্জনক্ষম দুই ছেলের মৃত্যুর পর এখন ভরসা সরকার। বড় দুই বোন বার বার বলছিলেন, ‘আপনাদের কাছে অনুরোধ, এই বিধবা দুই স্ত্রীর কি হবে? আপনারা সরকারের কাছে একটু আর্থিক সহায়তা দেওয়ার অনুরোধ কইরা লেখালেখি করেন।’
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাস্থল চুড়িহাট্টায় গতকাল পাসপোর্ট সাইজের দুটো ছবি নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন বোরকা পরা এক তরুণী। তার পাশেই মূর্তির মতো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে এক বৃদ্ধ। ওই তরুণীর নাম রোজিনা। তার ভাই এনামুল হক নিখোঁজ আছেন। কেউ পাশ দিয়ে গেলেই ছবিটা দেখিয়ে সেদিন তাকে কেউ দেখেছে কিনা জানতে চাচ্ছেন। যখন সবাই মাথা নাড়িয়ে না সূচক জবাব দিচ্ছেন তখনই চোখে মুখে চরম হতাশা ফুটে উঠছে তার। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলছিলেন, ‘ভাইটা কি বাঁইচ্যা আছে? আগুনে পুইড়া না জানি কত কষ্ট পাইছে।’ এনামুলের বৃদ্ধ বাবা জানান, বুধবার রাতে চকবাজারের সাকুরা মার্কেটে নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে বেরিয়ে রিকশায় কেরানীগঞ্জের বাসায় ফেরার পথে নিখোঁজ হন। গত তিনদিন ধরে প্রতিদিনই চুড়িহাট্টায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাস্থলে ছুটে আসছেন, যদি ছেলের খোঁজ মেলে সে আশায়। কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘ছেলের লাশটাও কি পামু না?’
৫ মাসের শিশু আবুল হোসেনের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে ফরেনসিক বিভাগ। অগ্নিকাণ্ডের পর তার বাবা নুরুজ্জামান নিখোঁজ রয়েছে। নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় থাকতেন নুরুজ্জামান। পেশায় রিকশাচালক। সন্তানকে কোলে নিয়ে নুরুজ্জামানের স্ত্রী শিরিন আক্তার বলেন, ‘আগুনের ঘটনার আধঘণ্টা আগে স্বামীর সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা হইছিল। তখন কইছিল সে চকবাজারে আছে। এরপর থেইকা হ্যার আর খোঁজ নাই।’
আহসান উল্লাহ (৩২)। চকবাজারের সাত রওজা এলাকায় তার ভ্যানিটি ব্যাগ তৈরির কারখানা রয়েছে। অগ্নিকান্ডের দিন ভ্যানিটি ব্যাগ সরবরাহের অর্ডার দিতে গিয়েছিলেন চুড়িহাট্টা এলাকায়। এরপর আর তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। গতকাল তার স্ত্রী কুলসুম বেগম ও তাদের সন্তান মাকসুদ (৪) ডিএনএ নমুনা দেন সিআইডির ফরেনসিক বিভাগের কাছে। কুলসুম বলেন, ‘ছুক্কু মিয়ার গলিতে তাদের বাসা। সংসারের রোজগার বলতে একমাত্র ব্যক্তি ছিল হেই। এখন এই পোলা লইয়া পথে বসছি। স্বামীর লাশটা হইলেও আমাদের দেয়া হোক।’
মর্গের সামনে আহাজারি করছিলেন চুড়ি কারখানার কর্মচারী রফিক মিয়ার স্ত্রী হাসিনা বেগম। তিনিও তার স্বামীর লাশ দাবি করেন।
ব্যাটারি চালিত আটোরিকশা চালক ইব্রাহিম (২৮) নিখোঁজ রয়েছেন। তার স্ত্রী রোকসানা ও মেয়ে বৃস্টির (৮) ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে সিআইডি’র ফরেনসিক বিভাগ। রোকসানা বলেন, ‘তার স্বামীর পরনে ছিল গাঢ় নীল রঙের শার্ট। মিটফোর্ড মরচুয়ারিতে এক লাশের চামড়ার সঙ্গে এরকম একটি শার্টের কিছু অংশ পাওয়া গেছে। কিন্তু প্রশাসন বলেছে যে এভাবে লাশ দেয়া যাবে না। ডিএনএ নমুনা যাচাই বাছাই করে নিশ্চিত হওয়ার পর লাশ হস্তান্তর করা হবে।’