পা হারানোর ক্ষতি পোষাবেন কীভাবে?

র্যাব সদস্যদের গুলিতে পা হারিয়েছি। মামলার আসামি হয়ে আদালতে হাজিরা দিয়েছি। আর তিন বছর সাত মাস পর সব মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়েছি। প্রমাণিত হয়েছি আমি নির্দোষ। র্যাব যে সাজানো মামলা করেছিল, তাও আজ প্রমাণিত হয়েছে। আদালতের দেয়া এ রায়ে আমি খুশি হয়েছি। তবে পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারিনি। আমাকে গুলি করে হত্যার প্রচেষ্টাকারী ছয় র্যাবের সদস্যের যেদিন বিচার হবে সেদিনই পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারবো। -পঙ্গু লিমন হোসেন গতকাল মোবাইল ফোনে এভাবেই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।

লিমন হোসেন বলেন, আমি নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছি। কিন্তু পা হারানোর ক্ষতি পুষিয়ে নেব কিভাবে? কথাটা বলতে গিয়ে লিমন কিছুটা আবেগাচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। খানিকক্ষণ বাদে তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রের কাছে আমার অনুরোধ, হারানো পা তো আর ফিরে পাব না। তবে আমার লেখাপড়ার খরচ যেন রাষ্ট্র বহন করে। এ ব্যাপারে আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।’
ঘটনার সময় লিমন ছিলেন ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী। বর্তমানে তিনি গণবিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র।
র্যাবের দায়ের করা সরকারি কাজে বাধাদানের মামলা থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার অব্যাহতি পেয়েছেন লিমন হোসেন। ঝালকাঠি জেলা ও দায়রা জজ আদালতের মুখ্য বিচারিক হাকিম মো. আবু শামিম আজাদ এ অব্যাহতির আদেশ দেন। লিমনের আইনজীবী আক্কাস সিকদার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। শুনানির সময় আদালতের এজলাস কক্ষে উপস্থিত ছিলেন লিমন ও তার মা হেনোয়ারা বেগম।
মামলা থেকে অব্যাহতি পাওয়া প্রসঙ্গে র্যাব মহাপরিচালক মোখলেছুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ ব্যাপারে কোন মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।
২০১১ সালের ২৩ মার্চ রাজাপুর উপজেলার সাতুরিয়া গ্রামে র্যাবের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে আহন হন লিমন। হাসপাতালে ভর্তির পর লিমনের জীবন বাঁচাতে চিকিত্সকরা এক পা কেটে বাদ দেন। আর ঘটনার দিন রাতেই রাজাপুর থানায় বরিশাল র্যাব-৮-এর তত্কালীন উপ-সহকারী পরিচালক (ডিএডি) লুত্ফর রহমান বাদী হয়ে অস্ত্র আইন এবং সরকারি কাজে বাধাদানের অভিযোগে লিমনসহ আটজনের বিরুদ্ধে দুটি মামলা করেন।
গত ৯ জুলাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক আদেশে লিমনের বিরুদ্ধে দায়ের করা দুটি মামলা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে ২৯ জুলাই ঝালকাঠির বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারক কিরণ শংকর হালদার অস্ত্র মামলার দায় থেকে তাকে অব্যাহতির আদেশ দেন। আড়াই বছর পর অস্ত্র মামলার দায় থেকে অব্যাহতি পেলেও দীর্ঘদিন ঝালকাঠি জেলা ও দায়রা জজ আদালতের মুখ্য বিচারিক পদ শূন্য থাকায় সরকারি কাজে বাধাদানের অভিযোগের মামলার দায় থেকে অব্যাহতিতে বিলম্ব হয়।
অপরদিকে লিমনকে গুলি করে হত্যা চেষ্টার অভিযোগে ২০১১ সালের ১০ এপ্রিল মা বাদী হয়ে র্যাবের ছয় সদস্যকে আসামি করে জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম আদালতে নালিশি মামলা করেন। ঝালকাঠির জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম নুসরাত জাহান অভিযোগটি এজাহার হিসেবে নেয়ার জন্য ওসিকে নির্দেশ দেন। আদালতের নির্দেশের পরও থানা মামলা লিপিবদ্ধে গড়িমসি শুরু করে।
লিমনের মায়ের আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত ২৪ এপ্রিল রাজাপুর থানাকে ৪৮ ঘন্টার মধ্যে মামলা লিপিবদ্ধ করে জানানোর নির্দেশ দেয়। এ নির্দেশের পর ২৬ এপ্রিল রাজাপুর থানা পুলিশ র্যাবের ছয় সদস্যের নামে মামলা লিপিবদ্ধ করে। পরবর্তীতে পুলিশ লিমনের ঘটনায় র্যাবের জড়িত না থাকার কথা উল্লেখ করে আদালতে চূড়ান্ত রিপোর্ট দাখিল করে। এরপর লিমনের আইনজীবী ঐ রিপোর্টের বিরুদ্ধে আদালতে নারাজি দাখিল করেন। বর্তমানে সেই মামলা আদালতে চলমান রয়েছে।
অস্ত্র আইন এবং সরকারি কাজে বাধাদানের মামলায় প্রধান আসামি করা হয় লিমনকে। তার সঙ্গে সন্ত্রাসী মোরশেদ জমাদ্দারসহ আরো ছয়জনকে আসামি করা হয়। র্যাবের ছয় সদস্যের নামে রাজাপুর থানায় মামলা লিপিবদ্ধ করার দুই দিন আগে লিমনের বিরুদ্ধে আদালতে অস্ত্র মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করে রাজাপুর থানা পুলিশ।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট সুলতানা কামালের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৩ সালের ৫ মে অস্ত্র মামলায় লিমনের ছয় মাসের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন মঞ্জুর করে আদালত। আদালতের নির্দেশের পর ৯ মে বরিশাল শেরে বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের প্রিজন সেল থেকে জামিনে মুক্তি পান লিমন। হাইকোর্ট সরকারকে লিমনের উন্নত চিকিত্সার ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিলেও সরকার লিমনের চিকিত্সার ব্যয়ভার বহন করেনি। লিমনের চিকিত্সা সহায়তায় এগিয়ে আসে সাধারণ মানুষ।

লিমনের পা হারানোর ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র প্রতিবাদের মুখে প্রকৃত ঘটনা জানতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। ২০১৩ সালের ২০ এপ্রিল কমিটি গঠিত হলেও অস্ত্র মামলায় লিমনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয়ার পর ১২ মে কমিটি ঘটনার তদন্তে রাজাপুরের সাতুরিয়া গ্রামে যায়। ৬ জুন কমিটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দেয়। এ ছাড়া লিমনের ঘটনা তদন্তে র্যাব আরো চারটি কমিটি গঠন করেছিল। সাভারের একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সিডিডি (সেন্টার ফর ডিজঅ্যাবিলিটি ডেভেলপমেন্ট) গত বছরের ১৮ আগস্ট বিনা মূল্যে লিমনের পা সংযোজন করে।