মিতু ঘোষের মৃত্যুর দায় কে লইবে?

হবু বর ধনঞ্জয়কে লইয়া বাংলা একাডেমির বই মেলায় আসিয়াছিলেন ২২ বত্সরের তরুণী মিতু ঘোষ। মেলা শেষ হইবার পর রিকশায় করিয়া সূত্রাপুরের বাসায় ফিরিতেছিলেন তাহারা। ঠিক তখনই বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতোই একটি নারিকেল গাছ উপড়াইয়া পড়ে তাহাদের রিকশার উপর। চোখের পলকেই ঝরিয়া যায় তরতাজা একটি জীবন। সেইসঙ্গে মৃত্যু হয় একটি স্বপ্নেরও। মিতু ঘোষ একা নহে, আহত হইয়াছেন ধনঞ্জয়সহ মোট সাতজন। তন্মধ্যে আছেন সিএনজি-আরোহী এক পরিবারের শিশুসহ চার সদস্য। আহত খুরশিদ আলমও স্ত্রী ও দুই মেয়েকে লইয়া বই মেলায়  আসিয়াছিলেন। সিএনজিযোগে মগবাজারের বাসায় ফিরিবার পথে তাহারা দুর্ঘটনাকবলিত হন। তীব্র কোনো ঝড়-বৃষ্টির কারণে এমন ঘটনা ঘটিলে তবু হয়ত খানিকটা সান্ত্বনা পাওয়া যাইত। কিন্তু ঘটনাটি যখন ঘটে তখন আবহাওয়া ছিল সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। অতএব, যাহারা হতাহত হইয়াছেন তাহাদের সান্ত্বনা দিবার মতো কোনো যুক্তি কিংবা অধিকার কি আমাদের আছে? ক্ষতিগ্রস্তরা যদি বলেন, ইহা নিছক দুর্ঘটনা নহে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীনতাপ্রসূত এক প্রকার হত্যাকাণ্ডেরই নামান্তর—তবে কি তাহাদের খুব একটা দোষ দেওয়া যাইবে?

ঘটনাটিকে যে আকস্মিক বা অপ্রত্যাশিত বলিব সেই অবকাশই-বা কোথায়? রাজধানীতে গাছ চাপা পড়িয়া মৃত্যুর ঘটনা তো ইহাই প্রথম নহে। ধানমন্ডিতে গাছ চাপা পড়িয়া প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তার মৃত্যুর ঘটনাটি তো বেশিদিন আগের নহে। গত বত্সরের ১১ মে প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান (৫৪) প্রাতঃভ্রমণে বাহির হইয়াছিলেন সুস্বাস্থ্যের প্রত্যাশায়। ফিরিয়াছেন লাশ হইয়া। ধানমন্ডি লেকের পাশে যে-কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে তিনি দাঁড়াইয়াছিলেন, সেই গাছটিই তাহার উপর ভাঙিয়া পড়ে। ইহার আগে এই ধানমন্ডিতেই খ্যাতনামা চিত্রপরিচালক খালিদ মাহমুদ মিঠুকেও অনুরূপ মর্মান্তিক পরিণতির শিকার হইতে হয়। কর্মস্থলে যাইবার পথে একটি গাছ তাহার উপর ভাঙিয়া পড়ে। লক্ষণীয় যে, উল্লিখিত তিনটি ঘটনাই ঘটিয়াছে স্বাভাবিক সময়ে। নানা কারণে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে সড়কপার্শ্বস্থ মাঝারি ও বৃহদাকারের বহু গাছ যে ইতোমধ্যে মৃত্যুফাঁদে পরিণত হইয়াছে— ইহা নিঃসন্দেহে তাহারই সতর্কবার্তা মাত্র। কিন্তু যথারীতি তাহা উপেক্ষিত হইয়াছে উদ্বেগজনকভাবে।    

কী অগ্নিকাণ্ড, কী সড়ক দুর্ঘটনা, কী গাছ উপড়াইয়া পড়া—প্রতিটি ক্ষেত্রে একই চিত্র। বড় ধরনের বিপর্যয় না ঘটিলে এখানে কাহারও টনক নড়ে না। আবার জাগিয়া উঠিয়া ঘুমাইয়া পড়িতেও যে দেরি হয় না— তাহার উদাহরণও ভূরি ভূরি। স্বাভাবিক অবস্থায় যেভাবে গাছ উপড়াইয়া বা ভাঙিয়া পড়িতেছে, আসন্ন বৈশাখ কিংবা বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি কী হইবে তাহা ভাবিলেও আতঙ্কিত হইতে হয়। আর সেই আতঙ্ক ভিত্তিহীন নহে। প্রতি বত্সর সামান্য ঝড়বৃষ্টিতেই বহু গাছ উপড়াইয়া বা ভাঙিয়া পড়ে। হতাহত  হন অনেকেই। অথচ বিষয়টি দেখভাল করিবার জন্য সুনির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষ আছেন। পরিবেশের জন্য গাছ অপরিহার্য হইলেও প্রাণহানি এড়াইতে ঝুঁকিপূর্ণ গাছ অপসারণ অপরিহার্য। আর এই দায়িত্বটি সিটি করপোরেশনের। কিন্তু বরাবরের মতোই নানা অজুহাত আর আশ্বাসবাণীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ তাহাদের ভূমিকা। নগরপরিকল্পনাবিদরা বরাবরই বলিয়া আসিতেছেন যে, পুরনো গাছগুলি যদি ঝুঁকিপূর্ণ হয় তাহা হইলে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ লইয়া গাছগুলিকে শক্তভাবে খুঁটি দিয়া আটকাইয়া রাখিবার ব্যবস্থা করিতে হইবে; তাহা সম্ভব না হইলে কালবিলম্ব না করিয়া সেইগুলি অপসারণ করিতে হইবে। তদস্থলে নূতন গাছ লাগানো যাইতে পারে। তবে ফুটপাতে বা সড়কদ্বীপে গাছ লাগাইবার সময়ে সর্বাগ্রে জননিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় রাখিতে হইবে। কাজে লাগাইতে হইবে বহির্বিশ্বের অভিজ্ঞতা। সদিচ্ছা থাকিলে কাজটি মোটেও কঠিন নহে।